3

হয়তো তোমারই জন্য -(শেষ পর্ব)

 

কয়েকবার পরপর কলিংবেল বাজলো, প্রায় দেড়টা বাজে, এই অসময় কে আসবে, ভাবতে ভাবতে বিভোর দরজা খুললো, এবং খুলেই অবাক হয়ে গেল, মাইশা, এতদিন পরে!!
মাইশা হাসতে হাসতে বললো, কি রে, খুব চমকে গেলি! কেমন আছিস?
একটু ভারী, ম্যানলি হয়ে গেছিস দেখছি!

এতগুলো প্রশ্ন একসাথে, কোনটা রেখে কোনটা উত্তর দেই, বিভোর পাল্টা প্রশ্ন করলো!

—–কোথাও বেরোচ্ছিস নাকি?

—–হ্যা একটু কাজ আছে, বিভোর বলল মাইশার প্রশ্নে।

বিভোর যাচ্ছিল আনিকার ক্যাম্পাসে, আনিকার পরীক্ষা সামনের সপ্তাহে, কয়েকটা বই কিনতে নীলক্ষেত যেতে হবে।
আনিকাকে একা কোথাও যেতে দিতে ইচ্ছে করে না বিভোরের।
তাই বলেছে ক্লাশ শেষে আজ নিয়ে যাবে।

—কে এসেছে ভাইয়া, তুলি এগিয়ে এলো!
–মাই গড, তুলি কত্ত বড় হয়ে গেছিস, আর কি প্রিটি লাগছে দেখতে, আমি ছেলে হলে এখনি ফিদা হয়ে যেতাম তো! মাইশা এক নিঃশ্বাসে বললো।

মাইশা মাহরিন খান, ইউনিভার্সিটির ডাকসাইটে সুন্দরী, বিভোরের ক্লাশমেট, একটু বেশিই ক্লোজ বান্ধবী ছিল।
কিন্তু গ্রাজুয়েশন এর পরে এক ধনী প্রবাসী পাত্রকে বিয়ে করে পাড়ি জমায় লন্ডনে। বছর দুয়েক পরে নাকি ডিভোর্সও হয়ে যায়, বিভোর এটুকুই জানে, তবে মাইশা দেশে এসেছে, সেটা জানতো না।

মাইশা বললো, দেশে ফিরেছি আরো তিন মাস আগে, একটু গুছিয়ে নিতে সময় লেগে গেল। গতকাল তোর ডকুমেন্টারি দেখলাম ফেসবুকে, এত ভালো লাগলো, মনে হলো দেখা করে আসি, তাই চলে এলাম।

ডকুমেন্টারি বলতে এটা আনিকার আইডিয়া ছিল, গ্রীনের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে বিভোরের সাক্ষাৎকার সহ একটা ভিডিও তৈরি করা হয়েছে, প্রফেশনাল সিনেমাটোগ্রাফার দিয়ে। এটা বুস্ট করা হয়েছে, গ্রীন রাতারাতি অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, ভিডিও ভাইরাল হয়ে, মাইশাও সেটাই দেখেছে।

আনিকার কথা মনে হতেই বিভোর ঘড়ি দেখলো, ওর ক্লাশ শেষ হয়ে গেছে, মেয়েটা অপেক্ষা করবে। তাই মাইশাকে বললো, আজকে আমার কাজ আছে, তুই থাক, গল্প কর মায়ের সাথে, পরে কথা হবে! মাইশা ভীষণ অবাক হলো, কি খুব জরুরি কাজ, এখন তো দেড়টা বাজে, এতদিন পরে এলাম, তুই চলে যাবি! অসময়ে এলাম যাতে তোর সাথে দেখা হয়!

তুলিও বললো, কোথায় যাবি ভাইয়া, বেশি আর্জেন্ট না হলে থাক!

বিভোর একটু ভেবে আনিকাকে ফোন করলো!
–হ্যালো, আনিকা, ক্লাশ শেষ?
–হু, কোথায় তুমি?জ্যাম নাকি অনেক?
– না, শোন, আমি একটু আটকে গিয়েছি, তুমি বাসায় চলে এসো, পরে নিয়ে যাবো আমি!
—কিন্তু আমার তো একটু আর্জেন্ট ছিল, আমি একা যাই, সমস্যা নাই তো!
–আচ্ছা তুমি লিস্টটা আমাকে পাঠিয়ে দাও, দিয়ে বাসায় চলে এসো, একা যাবে না।
বিভোর এমনি, আনিকা বিভোরের কথা ফেলতে পারে না!
বিভোর কথা শেষ করে রুম থেকে বের হলো!
তুলি বললো, আনিকাপু অপেক্ষা করছিলো নাকি!
বিভোর শুধু বললো, হু!

মাইশা আয়শা আন্টির সাথে কথা বলছিলো, ও জিজ্ঞেস করলো, আনিকা কে? তুলি হাসতে লাগলো, বললো, তোমার বন্ধুর বান্ধবী, তার থেকে একটু বেশি ছোট, খুব আহ্লাদী না ভাইয়া!

বিভোর বললো, তুলি চুপ কর তো! হ্যা আনিকা অপেক্ষা করছিল, নীলক্ষেত যাবার কথা ছিল, বলেছি পরে নিয়ে যাবো!

মাইশার ভালো লাগলো না বিষয়টা। বললো, তুই এখন এই পিচ্চি মেয়ের পাহারাদার হয়েছিস নাকি! একা একা নীলক্ষেতও যেতে পারে না!

বিভোর উত্তর দিলো না, এতদিন পরে এসেছে মাইশা, এখন কথা পাল্টা পাল্টি করতে ইচ্ছে করছে না একদম।

যাই হোক, মাইশা বললো, আজ বিকেলে কিন্তু সবাই টিএসসি আসবে, আমি বলেছি যাবো, তোকেও যেতে হবে!

ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা একসাথে হবে, বিভোর না করলো না।
একটু পরে বের হয়ে গেলো মাইশার সাথে।
মাইশা বলছিলো, আমার সাথে গাড়ি আছে, বিভোর বললো, ঠিক আছে, তুই গাড়ি করেই যা, আমি বাইক নিবো।

মাইশার কি মনে হলো, ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিয়ে বিভোরের সাথে চললো!
বিভোরের ভালো লাগছিল না, আনিকাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো।

টিএসসি তে সবাই এক হতে হতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেলো। গল্প আড্ডা গানে কখন যে সময়টা কেটে যাচ্ছিলো, কেউ টের পেলো না!

বিভোর একফাঁকে আনিকাকে টেক্সট করলো, আনিকা ফোন ব্যাক করতেই ও একটু দূরে গিয়ে কথা বলে এলো!
বন্ধুদের চোখ এড়ালো না, সবাই জিজ্ঞেস করলো, কি হলো, বিভোর, কার ফোন ছিলোরে? আমরা কি কিছু মিস করেছি!

মাইশা কথা টেনে নিয়ে বললো, হু, তোমাদের বিভোর হাঁটুর বয়েসী এক মেয়ের সাথে প্রেম করছে, তার পাহারা দিচ্ছে!

বিভোরের কানে লাগলো, কিন্তু ও কোন উত্তর দিলো না। অন্য সবাই হা হা করে উঠলো, আলাপ করাবি কবে বল তো বিভোর?

বিভোর বললো, দেখি, কবে সময় পাই!
গল্প আড্ডা শেষ হতে চায় না, তবে বিভোর দেখলো সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ।
ও উঠবে বললো!
মাইশা বললো, আমাকে তাহলে পৌছে দে তুই!
না, আজ পারবো না রে, আমার কাজ আছে, তোকে উবার ডেকে দিচ্ছি!
মাইশা আবারও অবাক হলো, তবে ছাড়ার পাত্রী নয় সে, বললো, আচ্ছা তোর কোথায় কাজ, আমিও যাই, আমি আজকে ফ্রি.আছি!

বিভোর বললো, আমি নীলক্ষেত যাবো, সেখানে তুই যাবি?

চল না, কতদিন ওখানে তেহারি খাই না!

বিভোর বললো, নীলক্ষেতের তেহারির বিষয়ে আমার ফ্যাসিনেশন নাই, আমার কাজ আছে!
তুই এমনি গেলে যেতে পারিস।

মাইশা গেলো সাথে, বিভোর আনিকার বইগুলো কিনলো, তারপর অনেক গুলো ডিজাইনের ইরেজার আর পেন্সিল সার্পনার কিনলো!
মাইশা জিজ্ঞেস করলো, এগুলো দিয়ে কি হবে?
বিভোর হাসলো, বললো আনিকার জন্য!

বিভোরের চোখে মাইশা আনিকার জন্য জমা অনুভূতি দেখতে পেলো! এই অনুভুতি গুলো তো তারই পাওয়ার কথা ছিলো, সে কখনো পাত্তাই দেয়নি, আজ এত জেলাস লাগছে কেন!

বিভোরের কাজ শেষ হলে বললো, মাইশা আমি এখন যাবো, তুই চলে যা!
মাইশার আর সহ্য হচ্ছিল না, ও বিভোরের ঘাড়ে হাত দিয়ে টেনে বললো, তুই ভুল করছিস, আজকালকার মেয়েদের তুই চিনিস না, প্রাইভেটে পড়ে, চোখে রঙ লাগা, ঠিক বড়লোক পাত্র পেয়ে বিয়ে করে ফেলবে, তখন তুই কষ্ট পাবি!

বিভোর ঘাড় থেকে হাতটা সরিয়ে দিতে দিতে বললো, চোখে যাদের রঙ থাকে, তাদের জন্য পাবলিক বা প্রাইভেট কোন বিষয় না!
পাবলিকে পড়ুয়া অনেকেও চোখে রঙিন চশমা পড়ে ঘুরে বেড়ায়!

তারপর একটু থেমে বললো, আনিকা খুব ভালো মেয়ে, লক্ষি মেয়ে, ও কখনো এমন কিছু করবে না।
আসিরে, বলে বিভোর চলে গেলো।
কথা গুলো গায়ে লাগলো মাইশার, কে জানে মাথায় কি চলছে এখন তার!

আনিকার মনটা খারাপ লাগছিলো, বিভোরের সাথে দেখা হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু হয়নি, এমনটা কখনো হয়নি। বুঝতে পারছে হয়তো ব্যস্ততা ছিলো। সাড়ে নটার দিকে বিভোর ফোন দিয়ে নিচে ডাকলো আনিকাকে। আনিকার মনটা ভালো হয়ে গেলো।
আনিকা দোকানে রিচার্য করতে যাচ্ছে বলে বের হলো বাসা থেকে, বিভোর একটু দূরে একটা ফাঁকা প্লটের সামনে দাঁড়ায়, এখানে তেমন কেউ থাকে না।

আনিকাকে বইগুলো বুঝিয়ে দিলো, ওর জন্য আনা ছোট ছোট গিফটগুলোও দিল। আনিকার এ কয়েকমাসে জানা হয়ে গেছে, বিভোর ওর জন্য সব কিউট গিফটগুলো খুঁজে আনে!

রাত বাড়ছিলো, আনিকা দাঁড়াবে না বেশিক্ষণ। আনিকা চলে যেতে পা বাড়াতেই বিভোর ডাকলো, আনিকা! বিভোরের এই ডাক আনিকা চেনে, এই ডাকে বিভোর কতটুকু চায় সেটাও সে জানে।

বিভোরকে না করা আনিকার ক্ষমতার বাইরে!
আনিকা লাজুক চোখে বিভোরের কাছে এগিয়ে গেলো, খুব কাছে!
যতোটা কাছে সেই পিকনিকের রাতে এগিয়েছিলো।

 

###

আনিকার সেমিস্টার ফাইনাল চলছে, বিভোর কয়েকদিন পরীক্ষার পরে দেখা করেছে। দুদিন ধরে বিভোরের ঘাড়ে খুব ব্যথা হচ্ছে, তাই বাইক নিয়ে আজ আর বের হলো না। আনিকাকে টেক্সট করে দিলো, পরীক্ষা শেষ করে যেন বাসায় চলে আসে।

বিভোর বিশ্রাম করছিলো, পেইনের কথা আনিকাকে বলে নি, তাহলে মেয়েটা টেনশন করবে, পরীক্ষার মাঝে বিভোর এই ঝামেলা করতে চায়না।

মাইশা এলো হঠাৎ, বিভোর শুয়ে আছে দেখে বললো, তুই আমাকে একটা ফোন করতি,একা একা বোর হচ্ছিস কেন!

বিভোর বললো, বোর হচ্ছি কে বললো, এই তো শুয়ে আছি, এমনিতে তো এত সময় রেস্ট নেওয়া হয়না।

–হু, তা ঠিক! তোর প্রেমিকা কোথায়?

–পরীক্ষা দিচ্ছে, আসবে একটু পরে, আসতে বলেছি!

–বাহ, তুই শুয়ে আছিস, আর সে নিশ্চিন্ত মনে পরীক্ষা দিচ্ছে!
–বা রে পরীক্ষা থাকলে দেবে না! তাছাড়া ও জানে না। আমিই বলি নি!

–কেন বলিস নি?
–বলে কি হবে, শুধুই চিন্তা করবে!

–চল তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই, ঠিক, ওই পিচ্চি কি করবে,তুইই তো ওর বইখাতা কিনা দিয়া আসো!!

–নাহ লাগবে না, ঠিক হয়ে যাবে, আর মাইশা আনিকার বিষয়ে তোর সমস্যা কি বলতো!
এমন করছিস কেন?

–আমার কি সমস্যা, এত বাচ্চা মেয়ের জন্য তুই এমন ফিদা হয়ে আছিস, দেখতে ভালো লাগছে না! এফ বি প্রোফাইল দেখলাম, মেয়েটা আহামরি সুন্দরীও না, তোর মতো গান গায়? তাও না!
তোর রুচির সাথে মিলবে?
রবীন্দ্রনাথ পড়ে ও?
দেখে তো মনে হয় না!
একসময় আমরা কি দারুণ সময় কাটিয়েছি সবাই, এখন তোরা এত সংকীর্ণ কেন হয়ে যাবি বল!

-মাইশা, সময় থেমে থাকে না, আনিকা আমার আট বছরের ছোট, ওর বয়সটা এখনো অনেক কম, জেনারেশনও কিছুটা আলাদা!
সব চাইতে বড় কথা, এখনকার রিলেশনশিপের সাথে আনিকা আর আমাকে মেলাতে আসিস না, আমি আনিকাকে ভালোবাসি, ওর ছেলেমানুষিটা ভালোবাসি!
ও আমাকে দেখতে এখানে আসতো, জানিস, ঠিক করে মিথ্যে কথাটাও বলতে পারে না!
তুই একটাও নেগেটিভ কথা বলবি না আর! নিজেকে এত নিচে নামাচ্ছিস কেন?

মাইশা হা হয়ে গেল, বিভোর এত সিরিয়াস, ভাবা যায় না!

কলিংবেল বাজলো, বিভোর বললো, এই যে চলে এসেছে, ওর সামনে এগুলো বলিস না প্লিজ।

মাইশা কিছু বললো না।

আনিকা ঢুকতে ঢুকতে আয়শা বললেন, তোমাকে তো বলেনি, ঘাড়ের ব্যথা নিয়ে শুয়ে আছে, পেইন কিলার খাচ্ছে!
আনিকা হতভম্ব হয়ে গেলো!
বিভোরের রুমে ঢুকে মাইশাকে দেখে থমকে গেলো।

বিভোর বললো, এটা মাইশা আপু, আমার ক্লাশমেট ছিল! ইউনিভার্সিটিতে।

মাইশা বললো, শুধুই ক্লাশমেট!!
বিভোর উত্তর দিলো না।
আনিকার ভেতরে আসতে দ্বিধা হচ্ছে, বিভোর হাত বাড়িয়ে দিল, আনিকা বিছানার পাশে চলে এলো।
বললো, আমাকে জানাও নি কেন!
–তুমি চিন্তা করবে, তাই, পরীক্ষা ভালো হয়েছে!
–হু,
-মুখ শুকনো লাগছে, ফ্রেশ হয়ে নিবা?
বাসায় যেতে হবে তাড়াতাড়ি?
-না পরে যাবো! ঘাড় ব্যাথা হলো কেন হঠাৎ!

মাইশা বললো, এটা কেমন কথা, অসুখ কি ফোন করে আসবে?

আনিকা মাইশার কথা কানে লাগলো, কিন্তু এখন ওর কথা পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে হলো না!

বিভোর আনিকাকে টেনে বসালো, বললো, জুস খাবে একটু!
–না, তুমি আমাকে বলোনি কেন!
–আচ্ছা সরি, বলিনি এজন্য সরি।
-ডক্টর দেখিয়েছো?
মাইশা আবার কথা টেনে নিলো, দেখো না আমি বলছি চল, ডক্টরের কাছে, শুনছে না, দ্যাখো তুমি বলে, শোনে কি না!
নাকি তুমি মাইন্ড করবে আমার সাথে গেলে?

আনিকা উত্তর দিলো, কি আশ্চর্য, আমি মাইন্ড করবো কেন!

–না আজকালকার মেয়েরা তো বয়ফ্রেন্ডকে ছাড়তে চায় না অন্য মেয়ের সাথে!

আনিকা একটু হেসে বললো, ডক্টরের কাছে কেন, প্রয়োজন হলে ও ওয়ার্ল্ড ট্যুরেও যেতে পারে, আমি মাইন্ড করবো না!
ও ঠিক সময়ে চলে আসবে আমার কাছে!

বিভোর ভাবলো, বাহ আনিকা এতোটা ম্যাচিউরড উত্তর দিলো, আশা করেনি!

আনিকাকে ওর মনে হয়, অনেক ছোট একটা মেয়ে, যে শুধু চুপচাপ বিভোর যা বলবে শুনবে! অনেকটা পুতুলের মতো! আসলে মনে মনে হয়ত সব পুরুষেরা নিজের সঙ্গিনীকে এমন আশা করে। হয়ত সবাই না, হয়ত বেশির ভাগ। নিজের ছোট্ট রাজ্যে আধিপত্য থাকবে একান্তই নিজস্ব। ডোমিনেট করে না বিভোর, অনেক কেয়ারিং সে।

এই কেয়ারটাই মাইশা সহ্য করতে পারছেনা কোন কারণে। বন্ধু, এতদিন পরে এসেছে, তাও বিভোর ছাড় দিচ্ছে না। পাল্টা কথা শুনিয়ে দিচ্ছে।

মাইশা আবার বললো, বিভোর যে এত খবরদারি করে তোমাকে, রাগ লাগে না!
দেখলাম তো একা কোথাও যেতেও দেয় না!
আনিকা উত্তর দিলো না, এই মুহুর্তে এই প্রশ্ন অবান্তর, আপুটা বুঝতে পারছে না!

আনিকার মনটা বিষন্ন হয়ে গেলো, কি হতো বিভোর ওকে বললে, সকালে তো একবার আসতে পারতো!

বিভোর বুঝলো, এখানে মাইশা আছে বলে আনিকা ইজি হতে পারছে না!
তখনই তুলি ঢুকলো রুমে, স্যুপ নিয়ে, আনিকার জন্য দইয়ের শরবত ও নিয়ে এসেছে, বিভোরের দিকে তাকিয়ে বললো, মাইশাপু, তুমি এসো তো, মা ডাকছে!
চা খাবে।

মাইশা বললো, এখানে দাও, বিভোরের কাছে বসি!
তুলি একটু ইতস্ততভাবে বললো, আসো তো মা ডাকছে!
অগত্যা মাইশাকে উঠতে হলো!

তুলি বের হয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে একটু মুচকি হেসে চলে গেলো!

বিভোর এবার একটু কাছে এগিয়ে বললো, বেশি মন খারাপ লাগছে?

আনিকা কেঁদে ফেললো!
আরেএএ, বোকা মেয়েটা কাঁদছে কেন! বিভোর আনিকাকে কাছে টেনে চোখ মুছে দিলো। ধূর বোকা মেয়েটা, প্লিজ কেঁদো না!
এই দ্যাখোতো, স্যুপটা খেতে হবে আমার!

আনিকা স্যুপটা নিয়ে বিভোরকে খাইয়ে দিতে লাগলো!
পেছনে হটওয়াটার ব্যাগটা ঠিক করে দিলো!

মাইশা চা শেষ করে উঠে এসে দরজায় থমকে দাঁড়ালো, এই মুহুর্তে বিভোরকে আনিকা স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে, স্বর্গীয় দৃশ্য, হয়তো মাইশার চোখ পুড়ে গেলো! তাও চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করলো না!

 

###

আনিকার বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল না এত তাড়াতাড়ি আনিকার বিয়ে দিবে। ও সেকেন্ড ইয়ার শেষ করেছে মাত্র। কিন্তু আনিকার মামী একটা খুব ভালো ছেলের প্রপোজাল নিয়ে এসেছেন। তার বক্তব্য ফেলে দেয়ার মতো নয়, এখন মেয়ে সুন্দর আছে, বয়স কম, পাত্রপক্ষ নিজেরা আগ্রহ করেছে। আনিকার কাজিনের বিয়েতে আনিকাকে দেখেছিল পাত্রের খালা। ছেলেটি অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেন, বিয়ে করে বউ নিয়ে যাবে!

বয়স একটু বেশি হলেও সেটা কোন সমস্যা নয়, সোনার আংটি আবার বাঁকা কি!! আনিকা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পড়াশোনা করবে।
বিয়ে তো দিতেই হবে, দেরী করে লাভ কি! আনিকার মা বেশ আগ্রহী হলেন, তার বাপের বাড়ির দিক থেকে এত ভাল প্রস্তাব এসেছে! প্রথমে আনিকাকে কিছু জানালেনও না। মামী আনিকাকে শপিং করার অজুহাতে শপিংমলে নিয়ে ঘুরে এলেন, এই সুযোগে পাত্রের মা খালা আনিকাকে দেখে গেলো!

ঘটনা এগিয়ে গেলো খুব দ্রুত। এনগেজমেন্ট এর তারিখও তারা জানিয়ে দিল।আনিকার মতো চুপচাপ শান্ত মেয়ের কোন কথা থাকবে বলে মায়ের মনে হলো না একদম। যদিও আনিকার বাবা বারবার বললেন, আনিকাকে না জিজ্ঞেস করে কিছু করো না। ডেট দিও না। ওর মানসিক প্রস্তুতি দরকার আছে, মেয়েটা পড়ছে, এতদিন তো আমরা বিয়ের কথা কিছু ভাবিনি, ও কিন্তু বেঁকে বসবে!

নাহ, এত ভালো পাত্র, কোন বুদ্ধিমতী মেয়ে বেঁকে বসবে না, নিজের ভাইয়ের বউয়ের কথা আনিকার আম্মু চালিয়ে দিলেন।

ডেট ঠিক হবার পরে, একদিন রাতে ধীরেধীরে আনিকাকে বললেন।
আনিকা একবারে বলে দিলো, এই মুহুর্তে বিয়ে করা সম্ভব নয়, কিন্তু মায়ের সাথে একচোট ঝামেলা হয়ে গেলো!
মা আশা করেননি আনিকা এমন শক্ত আচরণ করবে, তারও জেদ চেপে গেলো, তিনি ভাবলেন, আমি কি নিজের জন্য এমন করছি নাকি, আরে আনিকাই তো ভালো থাকবে!

মা চলে যাওয়ার পরেই আনিকা বিভোরকে ফোন করলো!

—হ্যালো আনিকা, কি হয়েছে, এত রাতে?
সাধারণত এত রাতে ফোন করা হয় না!

—আমার এনগেজমেন্ট সামনের সপ্তাহে!

—মানে কি, এখন তোমার ফান করতে ইচ্ছে হলো!

—না না ফান নয়, আমি জানতাম না, আমি ওই যে গত সপ্তাহে বসুন্ধরা গেলাম না, তখন নাকি আমাকে পাত্রের পরিবার দেখেছে!
মা এইমাত্র বলে গেলেন, কি হবে বিভোর! এখন কি করবো!!

আনিকার ভয়েস শুনে বিভোর বুঝতে পারলো আসলেই সমস্যা হয়েছে!
বিভোর বললো, তুমি বলে দাও, যে তুমি এনগেজড, তোমার অ্যাফেয়ার আছে!

—–না না, আমি বলতে পারবো না, তুমি কিছু করো না প্লিজ, কাল বাসায় আসো!

—-আনিকা, এখন তুমি ছেলেমানুষের মত কথা বলছো, ধরো তুমি বলছো, তোমার এনগেজমেন্ট এর ডেট ঠিক হয়েছে, তার মানে কথা অনেকটাই এগিয়েছে, তুমি জানতে না এটাই আশ্চর্য বিষয়।

—–বিভোর, তুমি কি ভাবছো আমি মিথ্যে বলছি??

—না না আনিকা, এখন নিজেরা ঝামেলা করার সময় নয়, তোমাকে জানায়নি এটাই আশ্চর্য বিষয়, সেটা বলেছি!
এখন হুট করে আমি এসে বললেই তো সেটা একসেপ্ট করবে না, করবে বলো?

–না!

—-মা আর তুলি রাজশাহীতে গিয়েছে গতকাল, ফিরতে আরো দু তিনদিন। ওরা ফিরলে, আমি না হয় কথা বলে একটা কিছু করবো! তুমি একটু অপেক্ষা করো!

—বিভোর আমার ভয় লাগছে, মা খুব সিরিয়াস, আমি না করলাম বলে, আরো শক্ত হয়ে গেছে! মা আশা করেনি আমি না করবো!

—বুঝতে পারছি! কিন্তু একটু অপেক্ষা করো, হুটহাট করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবেনা।

–আচ্ছা, কাল বাসায় আসবো আমি?

—না, আমি দেখা করে আসবো, ওরা বাসায় নেই বললাম না, এখন তুমি আসাটা ভালো দেখায় না!

আনিকা কিছু বললো না, কিন্তু খুব অভিমান হলো কেন যেন। বিভোরকে কি তেমন চিন্তিত মনে হচ্ছে না? কিন্তু আনিকার তো মনে হয়, বিভোর ওকে খুব ভালোবাসে, বিভোর ছাড়া অন্য কেউ, নাহ, ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে! কান্না দলা পাকিয়ে আসছে! কি করবে এখন আনিকা!

বিভোর একটু চিন্তায় পরে গেলো, এমনটা হতে পারে ভাবেনি, এত তাড়াতাড়ি কারো বিয়ে ঠিক হয়ে যেতে পারে, তাও এখনকার সময়ে! অবশ্য আনিকা অনেক চুপচাপ, হয়ত ওর মতামত নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি! একটু টেনশন হচ্ছে, মা কে কি জানাবে, মা কবে থেকেই বলেছে, আনিকার বাসায় কথা বলবে, ওরাই একটু দেরি করেছে। নাহ এতদিন পরে নানাবাড়িতে গিয়েছে, ফিরলেই জানাবে। কাল খুব ব্যস্ত থাকবে, পরশু কিছু একটা ভাবা যাবে!

পরের দিন বিভোর সারাদিন ঢাকার বাইরে একটু ব্যস্ত থাকলো! আনিকার মামী আর খালা এসে ওকে জোর করে শপিং এ নিয়ে গেলো! আনিকাকে যেতেই হলো, কিন্তু খেয়ালই করলো না কি কেনাকাটা হচ্ছে! বিভোরকে কয়েকবার ফোন করতেই ও ফোন কেটে দিলো!

রাতে আনিকা আবার ফোন করলো! রাগে ফেটে পরছে, সারাদিন কেন কথা বলেনি বিভোর! এখন কি ওকে এভয়েড করতে চাইছে! বিভোর বোঝাতেই পারলো না, এমন ব্যস্ততা আগেও হয়েছে, তারপর নিজেই বুঝলো, আসলে মানসিক চাপে মেয়েটা অস্থির হয়ে আছে! বাইরে বৃষ্টি অনেক, এই আবহাওয়াটাও মন খারাপ করা।

আনিকা বললো, কাল সকালে সে বাসায় আসবে!
বিভোর আবারও নিষেধ করলো, বললো, আনিকা এখন ভালো দেখায় না, আচ্ছা বলো, কখন বের হতে চাও, আমরা বাইরে দেখা করি!

আনিকা কথা না বলে ফোনটা রেখে দিলো!

 

★★★

পরদিন কথা ছিল বাইরে দেখা হবে, কিন্তু বাইরে এত বৃষ্টি, তার উপর আবহাওয়াটাও ঝোড়ো, সকাল থেকে অন্ধকার হয়ে আছে।
বিভোর বের হতে চাইলো না আনিকাকে নিয়ে।
বললো, বিকেল পর্যন্ত দেখি!
বাজ পড়ে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে, হঠাৎ যেন আবহাওয়াটাও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে!

বিভোর রান্নাঘর থেকে মোমবাতি এনে রাখলো, মনটা অস্থির, নয়তো ওয়েদারটা আরাম করার মতোই!

কয়েকবার দরজা নক করার আওয়াজ হলো, এই সময়ে কে আসবে!

দরজা খুলে বিভোর দেখলো আনিকা দাঁড়িয়ে আছে! বিভোরের রাগ করা উচিৎ কিন্তু বিভোর রাগ করতে পারছে না! বরং ভালোই লাগছে, এত ঝামেলার মধ্যেও মেয়েটা বের হয়েছে। এখন ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও বসতে হবে, কোথায় বসা যেতে পারে!
ভাবতে ভাবতে দরজা আটকালো বিভোর।

আনিকার দিকে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটা ভিজে গিয়েছে! বিভোর বললো, দাঁড়াও, ঠান্ডা লেগে যাবে, টাওয়েল এনে দিলো আনিকাকে। তুলির আলমারি থেকে একসেট ড্রেস নিয়ে এসে দিলো, বললো, আগে চেইন্জ করে এসো, তারপর কথা বলছি!

আনিকা সবকিছু পাশে রেখে দিলো!
কোন কথা বললো না!

–কি হয়েছে আনিকা! বিভোর কাছে এগিয়ে গেলো, এত অধৈর্য্য হলে চলে বলো!

— আনিকা এবার রাগে ফেটে পড়লো, আমার বাসায় আমার বিয়ের কেনাকাটা শুরু হয়েছে, আর আমি শান্ত হয়ে বসে থাকবো!
তাহলে এতদিন এগুলো কেন!
এখন এত চুপ করে আছে কেন বিভোর!

একটানা কথা বলে গেলো আনিকা!
বিভোর উত্তর দিলো না!
ওর চিন্তা হচ্ছে, ভেজা কাপড়ে আনিকার ঠান্ডা লেগে যাবে।

আনিকা একটু পরেই শান্ত হবে, বিভোর জানে!
আনিকার কাছে গিয়ে।বললো, কফি খাবে, কফি বানাই?

আনিকা বিভোরের বুকে আছড়ে পড়লো, ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো!
বিভোর বললো, এমন করে না আনিকা, ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু, সব সম্পর্কেই কিছু ট্রানজিশনাল সময় থাকে!
আনিকা ছাড়লো না, বিভোরকে ধরে থাকার সব রকমের অলিখিত অধিকার ওর আছে!

বিভোরের হঠাৎ একটু অন্য রকম অনুভূতি হলো, ঠিক পরিচিত নয়, খানিকটা অচেনা! আনিকাকে আস্তে করে বললো, এত কাছে থেকো না আনিকা, কোন ভুল হয়ে যাবে!

আনিকার ঠিক ভুলের হিসেব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে, ও আরো কাছে এগিয়ে বললো, হোক ভুল!

বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ঝড়ো বাতাস, সাথে বাজও পড়ছে থেমে থেমে!

কে জানে ঠিক কতোটা ভুল হলো!

আরো কয়েক প্রহর কেটে গেলো…..

বিভোর আধশোয়া হয়ে বসে আছে বিছানায়, পাশে আনিকা গুটিসুটি হয়ে ঘুমুচ্ছে। যেন কত রাত ঘুমায়নি,প্রচন্ড ঝড়ের পরে শান্ত নীল আকাশের মতো, অথবা শান্ত কোন পাহাড়ি নদী যেন। সাদা কম্বল জড়িয়ে আনিকাকে বেড়াল ছানার মতো মনে হচ্ছে। ওকে ডেকে তুলতে ইচ্ছে করছে না বিভোরের।

আনিকা এসেছিলো তখন কটা বাজে খেয়াল করা হয়নি, তবে এখন সাড়ে তিনটা বাজে।

বাইরের পরিবেশ অনেকটা ঠান্ডা এখন। বৃষ্টিও থেমেছে, ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে কিছু ক্ষণ আগে, বিভোর মোমবাতিটা নেভাচ্ছে না।

আজকের গল্পটা বিভোরের হাতে ছিলো না, আনিকার হাতে কিছুটা থাকলেও সে নিজে লেখেনি কিছুই। সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভেসেছে আবেগে! এই মুহুর্তটা বিভোর কখনোই চায়নি, এই মুহুর্তটা ভুলিয়ে দিতে হবে অন্য কিছুর বিনিময়ে।
যেন কখনো কোন দ্বিধা, অভিযোগ না আসে আনিকার।

বিভোর উঠলো, আনিকাকে ডেকে তুললো!
বললো, চলো বের হই, অনেক গুলি কাজ এখন!
কি আশ্চর্য, আনিকার মুখে কোন অভিযোগের ছাপ নেই!

 

★★★

কাজী অফিস থেকে বের হয়ে বিভোর বললো, আনিকা এভাবে শুরুটা হোক আমি চাইনি, হয়ত তুমিও চাওনি! আজকের গল্পটা শুধু তোমার আমার থাক, আর কেউ না জানুক!
তোমাকে অনেকটা সাহসী হতে হবে, বাসায় যাও, গিয়ে আমাদের কথা বলো।
আমি মা কে বলছি চলে আসতে।
আমাদের বাকি গল্পটা খুব গোছানো হবে, তার দায়িত্ব তোমার কিছুটা, আমার কিছুটা!

আনিকা কোন উত্তর দিলো না, একটু হাসলো শুধু।
আকাশ এখন মেঘমুক্ত।
তার আর কোন ভয় নেই।

অবশিষ্ট গল্পটা সাজাতে তার বিভোর ছাড়া আর কাউকে লাগবে না।

(শেষ)

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 3 comments