3

হয়তো তোমারই জন্য – পর্ব ২

 

আনিকার দিনগুলি পাল্টে গেলো, সারাদিন সব কাজের মধ্যেও কোথাও একটা বিভোর থেকে যায়। একটু অন্যমনস্ক হয়ে হয়ে থাকে। প্রায়ই গ্রীন থেকে টুকটাক অর্ডার করে ফেলে, অপেক্ষা করে, কিন্তু বিভোর আসে না। তিন নম্বর রোডের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হয়, বিভোরের সাথে দেখা হবে, কিন্তু দেখা হয়না কখনো। ক্লাশ শেষ হলে, বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মনে হয়, বিভোর আসবে, কিন্তু বিভোর আসে না।

-এটা কি হচ্ছে, কেমন হচ্ছে! আমি তো এমনটা ছিলাম না, ধূর, ভাল্লাগে না, একদিন কি বিভোরের বাসায় চলে যাবে, গেলেই হয়, কিন্তু সেটাও কেমন দেখায়!–এসব চিন্তায় আনিকা ডুবে থাকে।

বিভোর ব্যস্ত নিজের কাজে। আনিকার কথা সারাদিন এতোটা মনে থাকে না। কিন্তু কখনো এফবি টাইমলাইন স্ক্রল করতে গিয়ে আনিকার আপডেট সামনে এসে পড়লে, বিভোর একটু থেমে যায়। ভীষণ সুদর্শন আর খেয়ালী বিভোর কখনো কোন মেয়ের ছবি দেখেনি খেয়াল করে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা হালকা স্মৃতি আছে, কিন্তু সেটা আর যাই হোক, প্রেম হয়নি কখনো।
আনিকার ছবি দেখতে গিয়ে অজান্তে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।

মেয়েটা মিষ্টি দেখতে, একটু চুপচাপ ধরনের, ভারিক্কি, বড় বড় ভাব নিয়ে থাকে। ফর্সা নয় অতোটা, পাতলা গরণের, কোথাও একটা মায়া লুকিয়ে আছে। মনে হয় বিভোরকে অনেক কথা বলতে চায় কিন্তু বলে উঠতে পারে না, আচ্ছা এমন কেন মনে হচ্ছে যে আনিকা বিভোরকে অন্যচোখে দেখছে, নাও হতে পারে। তবু মেয়েটার চোখে একটা মুগ্ধতা, তৃষ্ণা আছে, প্রথমবার প্রেমে পড়লে এটা মেয়েদের চোখে ভেসে ওঠে। আনিকা কি বিভোরের দিকে কোন বিশেষ ভাবে তাকায়! বিভোর খেয়াল করেছে, দৃষ্টিতে কিছু একটা আলাদা তো অবশ্যই আছে!

একদিন আনিকার সাথে দেখা হয়ে গেলে মন্দ হতো না! কিন্তু দেখা করার অযুহাত কি হতে পারে? দিন পনেরো পরে একদিন সকালে, আনিকা দরজা খুললো। গ্রীণ থেকে কিছু প্রোডাক্ট এসেছে। শুকনো ধরনের ছেলেটা পরিচিত হয়ে গেছে, ওর নাম মফিজুর। মফিজুর বললো, আপু ভাইয়া নিচে আছে, আপনাকে ডাকছে!

আনিকা খুব অবাক হলো, বিভোর এসেছে, আনিকাকে ডাকছে। আনিকা জিনিসপত্র গুলো রেখে শালটা গায়ে জড়িয়ে নিচে নেমে গেলো। ঠিক বাসার সামনে নয়, দু তিনটে বাসা রেখে একটা জায়গায় বিভোর পেছন ফিরে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মাথায় কালো কানঢাকা টুপি, গায়ে কালো একটা চাদর।

আনিকা নিঃশব্দে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, বিভোর টের পেয়ে গেলো।আনিকার দিকে তাকিয়ে হাসলো, আনিকা বললো, এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাসায় গেলেই হতো!

বিভোর হেসে বললো, এমনিতেই, কেমন আছেন? প্রোডাক্ট রিভিউ দিন, সার্ভিস কেমন হচ্ছে?

আনিকা বললো, সকাল সাড়ে সাতটা বাজে, আপনি এখন প্রোডাক্ট রিভিউ নিতে এসেছেন?

বিভোর বললো, ঠিক তা নয়, আপনি পরিচিত, তাই দেখা করতে এলাম। আপনার কি ক্লাশ আছে? চলুন চা খাই?

আনিকা বললো, চা কি বাসায় খাওয়া যেত না?

বিভোর বললো, হ্যা যেতো, আপনি তো আর আমাদের বাসায় এলেন না

—আরে ওইদিন এমনিতেই গেলাম আপনার সাথে, আন্টিকে এত ভালো লাগলো, পরে আবার কি মনে করবে, তাই ভেবে আর যাওয়া হয়নি।

বিভোর হাসলো, আজ ঘুম ভাঙতেই মনে হল, আনিকার সাথে দেখা করে আসি। বিভোর বললো, চলুন হাঁটি একটু, তাড়া নেই তো?

—- না, তাড়া নেই, ক্লাশ এগারোটায়।

—–আপনি তো সকালেই ওঠেন দেখছি!

——হু, সকাল সকাল ওঠা স্কুল কলেজের অভ্যাস, আপনাকেও উঠতে হয় তো!

—-হ্যা, সাড়ে ছটার মধ্যে আমার প্রোডাক্ট চলে আসে।
এগুলো একটু দেখে প্যাকেট করিয়ে পাঠাই, তারপর কিছুটা সময় আবার ঘুমাই।

আনিকার হঠাৎ মনে হলো, কোন একটা মিষ্টি সকালে ও বিভোরকে ডাকবে, এ্যাই, ওঠো তো, অনেক বেলা হয়েছে।

বিভোর হয়ত আলুথালু ভাবে ঘুম ঘুম চোখে তাকাবে, আনিকা পাশে বসে, আলতো ভাবে বিভোরের কপালে হাত রাখবে!

—কি ভাবছেন?
বিভোরের প্রশ্নে আনিকার চিন্তার সুতো কেটে গেল।

— না কিছু না।

–এই সামনেই একটা চায়ের দোকান আছে, সমস্যা না থাকলে চলুন যাই?
–আচ্ছা চলুন।

শীতের সকাল, কিছুটা হিম হিম ভাব, সারারাত ধরে পড়া শিশিরে ভেজা পথঘাট, হলুদ আর কালো রঙের দুটো কুকুর আলসে ভাবে গা এলিয়ে আছে। কর্মব্যস্ত চাকুরে আর ছাত্রছাত্রীরা বের হয়ে পড়েছে। একটু আলতো রোদের ছোঁয়া লাগছে বিল্ডিং গুলোর বারান্দায়।

আনিকা বিভোরের পাশে হাঁটছে। অদ্ভুতভাবে বিভোরের ইচ্ছে করছে আনিকার হাত ধরে হাঁটতে। যদিও এই ইচ্ছের কোন মানে নেই। জীবনে মাঝে মাঝে এমম নিরর্থক ইচ্ছেরা এসে পড়ে। ইচ্ছে গুলো নিজেরাই বেপরোয়া হয়ে যায়। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মানুষের বেগ পেতে হয়।কই বিভোরের এমন অদ্ভুত ইচ্ছে আগে কখনো হয়নি তো! এখন কেন হচ্ছে এমনটা!
আনিকাকে খুব ভালো লাগছে, ইচ্ছে করছে রাস্তায় মাঝে জড়িয়ে ধরে চিবুকে চুমু খেয়ে নিতে। এতো বেশামাল হয়ে গেলো মনটা, আনিকা ভাগ্যিস মনের ভেতরটা দেখতে পায়না । তাহলে লজ্জা পেয়ে যেতো।

মা তো অনেকদিন থেকে বিয়ের কথা বলছেন, আনিকার যদিও বয়স তুলনামূলক কম, এখনই হয়ত বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। তাছাড়া বিভোরের কাজটা এপ্রিসিয়েট করলেও জামাই হিসেবে হয়ত আনিকার বাবা প্রতিষ্ঠিত কাউকে খুঁজবেন।

 

###

দিন দুয়েক পরে একদিন আনিকার ঘুম ভেঙে গেলো সকাল সকাল। হেঁটে আসার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে তিন নম্বর রোডে গ্রীনের কাছে চলে এলো! সকাল ছয়টা পনেরো। শীত পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। যা ভেবেছিলো, গ্রীনের পিকআপ চলে এসেছে। বিভোর দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকটা ছেলে জিনিসপত্র প্যাকিং করছে। আনিকা গিয়ে বিভোরের পাশে দাঁড়ালো! প্রথমে ভেবেছিল বিভোর ওকে খেয়াল করেনি, কিন্তু বিভোর না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো?

–আপনি তো আমার দিকে তাকাননি, দেখলেন কিভাবে আমি এসেছি?

—তার মানে আপনি তাকিয়েছেন, না হলে দেখলেন কিভাবে যে আমি তাকাইনি!

—আমি কি বলেছি যে আমি তাকাইনি?

—আমিও তো বলিনি, যে আমি তাকাইনি!

আনিকা হেসে ফেললো, বিভোরের কাছাকাছি এলেই মনটা ভালো হয়ে যায়!

বিভোর বললো, চলুন বসি ভেতরে! আমার আর একটু সময় লাগবে। অবশ্য আপনি উপরেও যেতে পারেন।

—আন্টি উঠেছেন?

—-মা ঘুমাচ্ছেন, ফজরের নামাজ পরে মা একটু ঘুমান।
আমি আর ডাকি না তাকে।
— আচ্ছা থাক, এখানেই বসি।

অফিস ঘরটা ছোট নয়, বেশ বড়।
ছিমছাম সাজানো, খুব বেশি কিছু নেই, ওয়ালে একটা হোয়াইট বোর্ড টানানো, সাথে কালো মার্কার ঝুলছে।

আনিকা চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।

এক কোণে কতগুলো সবজি জমা হয়ে আছে একটা ঝুড়িতে।
একটু শুকিয়ে গেছে।
আনিকাকে তাকাতে দেখে বিভোর বললো, এগুলো দু তিন দিন আগের। প্রিজার্ভেটিভ দেওয়া নয় তো, তাই রাখা যায় না!
— এত জিনিস নষ্ট হয়, লস হয় না!
—হু, হয় তো, কি করা যাবে বলুন, অর্গানিক ফুড বিজনেস এ এটা মাথায় রাখতেই হবে।

—আপনার পেজ বুস্ট করা না?

—করা কিন্তু এখন অর্গানিক ফুডের পেজও কম নয়, অথেনটিক পেজ হিসেবে নাম করতে সময় লাগবে।

—আমার একটা আইডিয়া আছে, যদি বলেন শেয়ার করতে পারি!

—একটু অপেক্ষা করুন, আমি একটু গুছিয়ে দেই, তারপর শুনছি!

আনিকা চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে চারপাশ দেখছিলো। বিভোর লিখতে লিখতে আড়চোখে খেয়াল করছিলো আনিকাকে, ভীষন ছেলেমানুষী একটা ভাব আছে আনিকার মধ্যে। এই বিষয়টাই টানছে বিভোরকে। হয়তো আনিকাকেও কোন কিছু টানছে, সত্যি কি তাই!

বিভোর হাতের কাজ শেষ করে বললো, চা আনতে বলি? আনিকা মাথা নাড়লো, এখন চা খাবে না। বিভোর বললো, আপনার যা ইচ্ছে, বলুন কি বলছিলেন?

আনিকা বললো, আপনি একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করান, প্রফেশনাল কোন ফটোগ্রাফি এজেন্সি দিয়ে, যারা সিনেমাটোগ্রাফি করে। আপনার পুরো প্রজেক্ট দেখা যাবে, প্রোডাক্ট গুলো কালেক্ট হচ্ছে, তারপর মাঠে হওয়া ফসল, এসব নিয়ে, নিজেও কিছু বলবেন। জাস্ট এটা বুস্ট করুন। দেখবেন ভাইরাল হয়ে যাবে!

বিভোর ভাবলো, চমৎকার একটা কথা, এটা মাথায় আসেনি! তাই বললো, আইডিয়াটা পছন্দ হয়েছে। দেখি কতদূর সাকসেসফুল করতে পারি!

তারপর আনিকা বললো, আচ্ছা আমি উঠি এখন? বিভোর বললো, আর একটু বসুন, আমি দিয়ে আসবো আপনাকে।

আনিকার অবশ্য যেতে ইচ্ছে করছিলো না। বিভোরের আশেপাশে থাকতে খুব ইচ্ছে করে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে বিভোর। আনিকা কি কোন দিন ডেকে তুলবে বিভোরকে? নাকি এটা শুধুই আনিকা ভাবছে, বিভোরের মনের কথা তো আনিকা জানে না। ওকে বুঝতেও পারে না। শুধু খুব ভালো লাগে বিভোরকে। আনিকা কোন অচেনা আবেশে বিভোর হয়ে যায়!

বিভোরের কাজ শেষ হলো। মফিজুরকে বুঝিয়ে দিয়ে বিভোর আনিকাকে ডাকলো, বললো, এই রোডের পেছন থেকেও আট নম্বরে যাওয়া যায়, গিয়েছেন? আনিকা মাথা নাড়ল, সে যায় নি। বিভোরের গায়ে একটা ছাইরঙের চাদর ছিলো, এতক্ষণ বসে থাকায় তার গরম লাগছে। তাই চাদরটা রাখলো চেয়ারের উপর। চাদরের নিচে কালো টিশার্ট বের হয়ে পড়লো। মাথার কানঢাকা টুপিটা খুলে রাখলো! বিভোরের চুলগুলো টুপির কারণে এলোমেলো হয়ে হয়ে আছে।

গ্রীনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বিভোর। আনিকার এমন অস্থির লাগছে কেন! মনে হচ্ছে পেছন থেকে গিয়ে বিভোরকে ছুঁয়ে দিই, দু বাহুর ফাঁকা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে বিভোরের গায়ের স্মেলটা পিঠে মুখ ঢুবিয়ে নিয়ে নিই, নাহ আনিকা ভাবছে, মাথাটা মনে হয় একদম খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

ফর্সা মুখ ভরা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কেমন একটা বুনো ভাব চোখে মুখে। আচ্ছা, বিভোর প্রেমিক হিসেবে কেমন, খুব কেয়ারিং নাকি ডেসপারেট!

তাছাড়া বিভোর কি ভাবছে আনিকা বুঝতে পারছে না। শ্যামল বর্ণের আনিকা তেমন আহামরি সুন্দরী নয়, সুন্দরী নাম হওয়ায় মনে এক ধরনের হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে যখন বিভোরের মত সুদর্শন কাউকে এত ভালো লাগছে। তবে সুদর্শন এটা ভালো লাগার একটা কারণ শুধু, হতে পরে প্রথম কারণ, সাথে আরো হাজারটা কারণ আছে বিভোরকে ভালো লাগার।

—-সময় থাকলে চলুন পেছন থেকে যাই?

আনিকা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো।
বিভোর হেসে বললো, কথা বলবেন না ঠিক করেছেন নাকি? নাকি আমি কাজ করছিলাম দেখে মুড অফ হয়ে গেলো!

আনিকা বললো না না, তেমন কিছু নয়। ঘাড় নেড়ে কথা বলা আমার একটা বদঅভ্যাস।

–বদঅভ্যাস কেন হবে!!
মুখে বললো বিভোর। মনে মনে বললো, এই সব ছোট ছোট টুকরো অভ্যাস গুলোই কোথাও আনিকাকে এত ভালো লাগতে বাধ্য করছে।

আর একটা বিষয়, আনিকার প্রতিটা মুভমেন্ট বিভোর পড়তে পারছে। এই যেমন এখন বিভোরের মনে হচ্ছে, আনিকা ভাবছে, আরো কিছুটা সময় গল্প করলেও ক্ষতি নেই!. ধূর, বিভোর কি মাইন্ড রিডার নাকি! নিজের মনে অদ্ভুত কিছু ভেবে চলেছে।

-আসুন যাওয়া যাক! বিভোর ডাকলো।

আনিকা বের হয়ে এলো। বিভোর বললো, পেছনের দিকটা একটু প্যাচানো রাস্তা, হেঁটে যেতে পনের বিশ মিনিট লাগতে পারে।
আনিকা জানালো, সমস্যা নেই।

আসলে বিভোর ভাবছিল একই এলাকায় কেউ আনিকার সাথে দেখে ফেললে কি ভেবে ফেলবে, যদিও তার কিছু যায় আসে না!
তবুও একটা কিন্তু থেকেই যায়।

 

###

সেদিন আনিকার ক্লাশ ছিল প্রায় দেড়টা পর্যন্ত। এই সময়টা বাসে একটু ভীড় হয়, আনিকা ভাবছিল, আজ রিক্সা করে চলে যাবে। বন্ধুদের কেউ শ্যামলীর দিকে থাকে না, বেশির ভাগ এই পশ্চিম ধানমন্ডি, লালবাগের দিকে। আনিকার একাই আসা যাওয়া করা হয়। গল্প করতে করতে নিচে আসতে আরো পনেরো মিনিট কেটে যায়। ক্যাম্পাস বিল্ডিং এর নিচে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান।
আনিকার বন্ধুরা চলে যেতেই আনিকাকে কেউ ডাকলো, হ্যালো ম্যাম, কেমন আছেন? আনিকা পেছন ফিরে দেখলো বিভোর দাঁড়িয়ে। পাশে আরেকটা ছেলে আছে।
আনিকা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন?
বিভোর বললো, হ্যা ভালো, আপনি?
ক্লাশ শেষ হলো!

বিভোর আলাপ করিয়ে দিলো, সুশান, আমার স্কুলের বন্ধু!
আমি মাত্রই ওর সাথে বলছিলাম, এখানে আমার পরিচিত একজন পড়ে!

সুশান হাসতে হাসতে বলল, আমি একটু অবাকই হয়েছি!
বিভোরের পরিচিত মেয়ে, এত জুনিয়র!

বিভোর বলল, আপনি কিছু মনে করবেন না, ও এমনই কথা বলে! ছেলের বাবা হয়ে গেছে, ম্যাচিউরড হয়নি!

আনিকা কথা বলার স্কোপ পাচ্ছিলো না দুই বন্ধুর কথার মাঝে। একটু পরে সুশান বিদায় নিলো,
বিভোর জিজ্ঞেস করলো, বাসায় যাবেন তো?
আসুন।

বাইকের পেছনে বিভোরের সাথে বসতে হবে, আনিকরা একটু অস্বস্তি হচ্ছিল, তাই বললো, না ঠিক আছে, আমি রিক্সা করে চলে যাই আজ।

বিভোর হাসতে হাসতে বললো, আরে উবার বা পাঠাও ড্রাইভার মনে করে নিন না, আনইজি ফিল করার কি আছে?

আনিকা হেসে ফেললো!

রাস্তা ফাঁকাই ছিল, বিভোর একটানে নিজের বাসার গেটে চলে এলো!

আনিকা বললো, আমি ভেতরে যাবো না আজ, দেরী হয়েছে।

—তাহলে তো আপনাকে আমিই নামিয়ে দিয়ে আসতাম, আসুন ভেতরে আসুন।
আপনার জন্য মা আর তুলি অপেক্ষা করছে!

–মানে কি! আপনি না আপনার বন্ধুর সাথে গল্প করেছিলেন ওখানে, তাহলে?

-এটা এত রহস্যের কিছু নেই, কথা বলতে বলতে তুলিকে টেক্সট করে দিয়েছি, আমরা বাসায় আসছি লিখে!
আসুন।

আনিকার কিন্তু কোন অস্বস্তি হচ্ছিল না বিভোরের বাসায় ঢুকতে, যেন কত দিনের চেনা।

বিভোরের বোন তুলি পুতুলের মতো, ধবধবে ফর্সা, মোমের মত তুলতুলে দেখতে। দুটো বেনী করা, ভাইয়ের মত সবসময় হাসি মুখ। নিজে খুব একটা ফর্সা নয় আনিকা, এ নিয়ে একটু দুঃখও আছে মনে। তবে তুলিকে দেখে খুব ভালো লাগলো!

আয়শা আন্টি বললেন, তুমি আজ আসবে জানলে তোমার জন্য ভাল কিছু রান্না করতাম, বিভোর তো আমাকে কিছু জানায় নি!
তাই আজ যা রান্না হয়েছে, তাই দিয়ে খাওয়াচ্ছি তোমাকে!

বিভোর বললো, আনিকাকে দেখে গেস্ট মনে হচ্ছে না মা। প্রথম দিনও মনে হয়নি, তাই তোমার মেনুতে সমস্যা নেই!

আনিকা যেন ঘোরের মধ্যে আছে, সব কিছু স্বপ্নের মতো, বিভোরকে নিয়ে এত ভাবছে সারাক্ষণ, সেদিন সকালে দেখা হলো, বিভোর ফোন নম্বর নেয়নি আনিকার। ইভেন ম্যাসেন্জারেও নক করেনি! এখন আবার হুট করে বাসায় নিয়ে এলো!
বিভোরকে বুঝতে পারছে না আনিকা। বিভোরও কি ওকে কিছুটা………

বাসায় নিয়ে এলেও বিভোরকে মধ্যাহ্নভোজের পরে চলে যেতে হলো, কেরানীগঞ্জের দিকে কিছু একটা কাজ আছে। আনিকাকে বললো, সরি, আপনাকে পৌছে দিতে পারছি না, তবে এটুকু জায়গা, আপনি মাইন্ড করবেন না আশা করি! আনিকা হেসে ফেললো, বিভোর সবসময় মজার করে কথা বলে, এইরকম করে কথা বললে, জীবনে কখনো কাঁদতে হবে না, আহা এই সময়টা যদি অনেকটা লম্বা হতো! এই মুখে তাকিয়ে একজীবন পার করে দেওয়া যায়। বিভোর চলে গেলো!

তুলি বললো, আসো আপু, তোমাকে বাড়িটা ঘুরে দেখাই। আনিকা পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখলো, নিচতলায় একটা পরিবার থাকে, তবে বেশি উন্নত নয়, লোকটা কারখানায় কাজ করে। আসলে নিচতলাটা একটু স্যাতস্যাতে হয়ে গেছে, ভালো পরিবার পেতে হলে কাজ করাতে হবে, ভাইয়া এখনি বাড়িটা ভাঙবে না। গ্রীন একটু দাঁড়াবে, তারপর হয়তো ভাববে, তুলি বললো।

তিন তলায় দুটো পরিবার দুপাশে, ছাঁদে একটা ঘর। সেটা বিভোরের আস্তানা, ব্যায়ামের জিনিসপত্র, একটা আলমারি ভরা সেবা প্রকাশনীর বই, মুখোশ, বোতল, একদম যাচ্ছে তাই অবস্থা। একটা ছবি আঁকার ক্যানভাসও দেখা গেলো।

আনিকা জিজ্ঞেস করলো, উনি কি ছবি আঁকে?
না না, তেমন কিছু নয়, নিজে নিজে আঁকিবুঁকি করা আর কি, আমি আঁকতাম, এখন আর সময় পাই না।
ছাদের একপাশে একটা কুলগাছ, ফুল আসছে।

জোছনা রাতে ছাদটা অদ্ভুত সুন্দর হওয়ার কথা। ছাদ থেকে আনিকাকে নিয়ে তুলি বিভোরের ঘরে গেলো, ছাদের ঘরটা যতোটা এলোমেলো, এই ঘরটা ততোটাই ছিমছাম। রুমের এককোণায় একটা গীটার রাখা, বিছানার পাশে টেবিল, জানালায় মানিপ্লান্ট ঝুলছে, বারান্দাটাও সুন্দর! সবমিলিয়ে আনিকার কেমন একটা খালি খালি অনুভূতি হতে লাগলো!

বিভোর, বিভোরের চারপাশটা এমন স্বপ্নের মতো কেন!

প্রায় সাড়ে চারটার দিকে আনিকা উঠলো। অনেকটা দেরী হয়েছে আজকে।

 

##

আনিকার ফিরতে এতোটা দেরী হলো দেখে আনিকার মা জিজ্ঞেস করলেন, কি এত দেরী হলো আজ? আনিকা একটু থতমত খেয়ে গেল, পরে ভাবলো সত্যি কথাটাই বলবে। কিন্তু কার বাসায় কোথায় গিয়েছিল, এটা বলা যাবে না। আনিকা তাই উত্তর দিল, এক ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম। আনিকার মা আর কথা বাড়ালেন না। আনিকা খুব প্রয়োজন না হলে কোথাও যায় না।
আনিকার ছোট ভাই মেঘ আনিকার চাইতে বেশ খানিকটা ছোট, এবার মাত্র স্টান্ডার্ড টু তে পড়ে।

আনিকা বহুদিন একা ছিল, তারপরে মেঘের জন্ম। তিনি ক্লাশ নাইন থেকে মেয়েটাকে আর খেয়াল রাখতে পারেননি, তবুও সে একা একা কখনো বিপথে যাওয়ার মত কিছু করে নি। তবে যেটা হয়েছে, মেয়েটা কোন ভাইবোন ছিল না অনেক দিন, একা থেকে চুপচাপ আর চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে।

আনিকা গরম পানি করে শাওয়ার নিলো, শাওয়ারের পরপর ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। ঘুম ভাঙলো একটু দেরীতেই, হ্যান্ডসেটের ঘড়িতে দেখলো সাড়ে সাতটা বাজে।
একটু চা খেতে ইচ্ছে করছে।
ফোনটা ভাইব্রেট করছে।
অপরিচিত নম্বর, ডাবল ওয়ান সিরিজের নাম্বার কার হতে পারে, আনিকা ফোন পিক করলো!
–হ্যালো, আনিকা বলছেন?

বিভোর, বিভোর ফোন করেছে, এই ভারী কন্ঠস্বর সারাক্ষণ আনিকার কানে বাজে।

আনিকা বললো, জি, বিভোর বলছেন??

বিভোর হাসতে হাসতে বললো, আমার মনে হচ্ছিল, নাম্বার অপরিচিত হলেও আপনি ঠিক চিনতে পারবেন।
বাসায় যেতে সমস্যা হয়নি তো??

আনিকা বললো, আপনি এমন ভাবে বলছেন, যেন আমি ঢাকা থেকে চিটাগং এসেছি! তাও গরুর গাড়িতে!!

বিভোর আবারও হাসলো, বললো আমি ফিরিনি এখনো, এখানে একটা চায়ের দোকানে চা খেতে এসে আপনার কথা মনে হলো!

—নম্বর কোথায় পেলেন?

—কেন, গ্রীনে তো আপনি অনেকবার অর্ডার করেছেন, নাম্বার আলাদা ভাবে নিতে হবে কেন!

ওহ ঠিক তো, এই সহজ কথাটা মাথায় এলো না!

— কেরানীগঞ্জ কি কাজ ছিলো?

—-এখানে ডেইরি আছে অনেকগুলো। ওদের সাথেই মিটিং ছিল, আর আমাদের একটা খামারবাড়ির মতো আছে, বেশি বড় না, জায়গাটায় কিছু সিজনাল সবজি চাষ করিয়েছিলাম, ফলোআপে রাখতে হয়, তাই আসা হয় প্রায়ই!

—-আচ্ছা, গ্রাম এলাকা??
—–হু, আমি যেখানে আসি, সেটা গ্রামই, গ্রামের নাম মনুর টেক। রাস্তা ঘাটও এতোটা ভাল নয়, পাশে একটা নদীও আছে, ইছামতি, তবে নদীর অবস্থা বেশি ভাল নয়, কচুরিপানা বোঝাই।
—- আচ্ছা, সর্ষে ক্ষেত আছে?
— হ্যা আছে, কেন প্রোফাইল পিকচার তুলতে চান??
—- আরে না না, ধূর, আমি কখনো কাছ থেকে দেখিনি!
—- আচ্ছা একদিন সময় করুন, তুলিও আসবে বলেছে, প্রোফাইল পিকাচার তুলবে নাকি, আপনাদের নিয়ে এসে প্রোফাইল পিকচার তুলে দেই!
—সেটা মনে হয় সম্ভব না, সারাদিনের জন্য বাসায় কি বলবো, সত্যি বললে যেতে দিবে না, মিথ্যে বললে ধরা খেয়ে যাবো!

বিভোর হেসে ফেললো, আনিকার কথা শুনে। তারপর বললো, রাখছি তাহলে, আমি ঘন্টাখানেক পরে ফোন করলে, সামনের বারান্দায় আসবেন!

আনিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কেন?

— নাহ, একা একা বাসায় গেলেন তো, একটু নিজের চোখে দেখি, সমস্যা নাই!!

—-উফফ, আপনি কি সারাক্ষণ মজা করেন?

বিভোর বলল, ধরে ফেললেন! আমি আপনাদের রোডের শেষ মাথায় যাবো। একটা ডেলিভারি আছে!

আনিকা বললো, কি আশ্চর্য, আপনাকে কেন যেতে হবে! মফিজুরকে পাঠান! আমাদের বাসায় তো ওকেই পাঠাচ্ছেন!

বিভোর হেসে বললো, আচ্ছা মফিজুরকেই পাঠাবো।
রাখছি এখন!

ফোন রেখে আনিকা রুম থেকে বের হলো! ড্রয়িংরুমে বসে মেঘ ছবি আঁকছে। বাবা টিভি দেখছে! মা আর সুফি সিরিয়াল দেখছে মনে হয়!

আনিকার একবার মনে হলো, ইস, বিভোরকে আসতে বললেই হতো! ডেলিভারিতে কি সমস্যা! বিভোর ডেলিভারি না করলে তো ওর সাথেই দেখা হতো না!! না না থাক, আবার কার ভালো লেগে যাবে, তারপর মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র হিসেবে ঠিক করবে, দরকার নাই। ধুর, এত ছেলেমানুষী চিন্তা কেন আসছে!!

আনিকা কয়েকবার পায়েচারী করলো, নিজের রুম থেকে ড্রয়িং, বারান্দা, ডাইনিং, মায়ের ঘরে উঁকিও দিল। আবার বারান্দায় গেলো! ঠিক পঞ্চাশ মিনিট পরে বিভোর ফোন করলো, আনিকা বারান্দায় এসো…..

আনিকা ছুটে বের হয়ে দেখলো বাবা ড্রয়িংরুমে, বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো, এই বুঝি বাবা বুঝে ফেলবেন! কিন্তু বাবা খেয়ালই করলেন না! আনিকা বাবার পাশ থেকে চাপা পায়ে হেঁটে ড্রয়িং রুমের বারান্দায় কমলা রঙের ডিমলাইটটা জ্বালিয়ে দিলো!

বিভোর বাইক থামিয়ে রাস্তার ওপাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। রঙটা সোডিয়াম বাতির আলোয় কালচে লাগছে, হাতে হেলমেট, চুলগুলো এলোমেলো! জ্যাকেটটা সাদা মনে হচ্ছে৳!

বিভোর দেখলো, চারতলার বারান্দায় কমলা আলোয় আনিকার মুখটা! কি হয়েছে বিভোরের, এমন পাগলামি করতে ইচ্ছে হলো! সেই কতদূর থেকে এসে আনিকাকে দেখতে মন চাইলো, এ কেমন অদ্ভুত অনুভূতি! আনিকা কি অনেকটা প্রশ্রয় দিচ্ছে!!
নাকি বিভোর জোর করছে আনিকাকে! বিভোর ফোন করলো আবার, আনিকা কেটে দিলো!

বিভোর বুঝতে পারলো, তারপর স্মিত হেসে চলে গেলো!
এ হাসির রেশ কাটতে আনিকার অনেক সময় লাগবে, হয়ত কাটবেই না!

 

হয়তো তোমারই জন্য -পর্ব ৩

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 3 comments