5

হয়তো তোমারই জন্য – পর্ব ১

 

কলিংবেল বাজলো পরপর দুই বার। কিছুক্ষণ পরে আরো দুইবার। আনিকা বিছানায় শুয়ে ফান্ডামেন্টাল ইকোনোমিকস এর শিটগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল। বার বার কে বেল বাজাচ্ছে! এটা ভেবেই “সুফিইই” বলে জোরে ডাকলো দুবার। কিন্তু সুফি উত্তর দিলো না। বরং মা বলল, “আনিকা দেখো তো কে এসেছে, সুফি ছাদে কাপড় নাড়তে গিয়েছে”।

আনিকা বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠলো, দরজার ছিটকিনি খোলাই ছিল, দরজা খুলে অবাক হয়ে গেলো। একটা ছেলে দাঁড়ানো, ছ ফুটের কাছাকাছি লম্বা , দোহারা শরীর, মুখভরা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, যেন নিয়মিত সেভ করা হয়নি বেশ কিছু দিন, কালো একটা টি শার্ট ধরনের সোয়েটার পরে আছে, সাথে নেভী ব্লু আটপৌরে জিন্স, পায়ে সাধারণ জুতো, চপ্পল ধরণের, মাথায় কানঢাকা টুপি। কিন্তু চোখে কি গভীর মায়া। আনিকা এক পলকে দেখে নিলো। কিন্তু সমস্যা হলো ছেলেটির হাতে এককাঁদি কলা, এবং বাজারের ব্যাগে কিছু সবজি দেখা যাচ্ছে।

ভীষণ সুদর্শন ছেলেটি আনিকাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো এবং বললো, আস্লামুআলাইকুম ম্যাম, আমি “গ্রীণ” থেকে এসেছি। আপনাদের একটা অর্ডার ছিল।

আনিকা ছেলেটিকে দেখে একটু ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল, এটা কেমন কথা, একটা ছেলেকে প্রথমবার দেখে এমন কেন মনে হবে! এটা কেন অপরিচিত দুঃখ দুঃখ অনুভূতি, এই অনুভুতি কি সুখের মতো ব্যাথা!

ছেলেটির কথায় আনিকার সম্বিত ফিরলো, নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, আমাদের অর্ডার? কই দেখি….
রিসিপ্ট টা নিয়ে দেখলো ঠিকানা ঠিকই আছে!

আনিকা দেখতে দেখতে আনিকার বাবা আরাফাত সাহেব বের হলেন, ওহ এসে গিয়েছো, দাও দেখি কি তাজা আনলে তোমরা!

ছেলেটি হেসে বাজারের ব্যাগটা এগিয়ে দিতে দিতে, বললো, দেশী পোলাও এর চাল, কাঁঠালি কলা, পেঁপে, আর আঙ্কেল আন্টির জন্য আঁধপাকা তেঁতুল।

-বাহ, সবই মনে রেখেছো, দাঁড়াও, বিলটা দিচ্ছি– আরাফাত সাহেব বিল এনে দিলেন, ছেলেটি ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো।

রশিদটা এখনো আনিকার হাতে, বাবা চাইলেন, আনিকা বাবাকে ফেরত দিতে গিয়ে দেখলো সই করা বিভোর আহমেদ। বাহ, “বিভোর, বিভোর” , আনিকা দুই বার বললো, কি সুন্দর নামটা! নামেই কেমন বিভোর হয়ে যায় মনটা! এই ছেলেকে পুলিশ অফিসার হিসেবে মানায়, তা না, এ সবজি হোম ডেলিভারি করে, মানে ডেলিভারি বয়, আনিকা প্রমাদ গুনলো।

বাবা এসে কাগজটা নিলেন।
আনিকা জিজ্ঞেস করলো, এরা কারা, অর্ডার করলে কিভাবে?

আরাফাত সাহেব বললেন , তিন নম্বর রোডে একটা দোকান করেছে, ঢাকার আশেপাশের গ্রাম থেকে সবজি টবজি সংগ্রহ করে হোম ডেলিভারি করবে। অনলাইনে পেজ আছে, সেদিন হাঁটতে গিয়ে দেখে এসেছেন। তখনই অর্ডার করে দিয়েছেন।
বিভোর নামের ছেলেটিই ছিল, ভীষন অমায়িক।

আনিকা জিজ্ঞেস করলো, ওনার দোকান?

-হু, আরও দু তিনটা কর্মচারী আছে, এরাই আপাতত কাজ করছে।

আনিকা এরপর হেঁটে নিজের রুমে চলে গেলো! আর কোন শিটে মন বসলো না, মাথায় ঘুরতে লাগলো একটা নাম, বিভোর, বিভোর! কালো কানঢাকা টুপি পরা ফর্সা মুখ, ভীষন মায়াময় চোখ! কি আশ্চর্য, আনিকা নিজের রাফখাতায় দুই বার লিখলো, বিভোর!

আনিকা কখনো প্রেমে পড়েনি, কোন ছেলের সাথে বিশেষ বন্ধুত্বও ছিলো না। কিন্তু মনে হতে লাগলো, বিভোর নামের ছেলেটির জন্য সে সব কিছু করতে পারে। প্রথম দেখায় প্রেম, এটা কি তবে তাই। কেমন যেন অস্থির লাগছে, এই ছেলেটির হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটতে ইচ্ছে করছে। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে বিভোরের সাথে।

এ কেমন অনুভূতি। ছেলেটি হয়তো আনিকাকে ভালো করে দেখেইনি! সুন্দরী বলতে যা বোঝায় আনিকা তা নয়, শ্যামলা গায়ের রঙ, একহারা গঠন। বেশ পাতলা। রোদে গেলে আরো বেশি কালো লাগে বলে আনিকার একটু দুঃখও আছে। তবে সে ভীষণ মিষ্টি দেখতে সব মিলিয়ে। চুলগুলি খুব বড় নয়, কাঁধ ছাড়িয়ে নেমেছে অল্প।

বিভোর এতো হ্যান্ডসাম দেখতে, কাজ যা করুক, নিশ্চয়ই কোন বান্ধবী থাকবে, আনিকার উচিৎ এই টপিক থেকে বের হয়ে যাওয়া। কিন্তু আনিকা একদমই পারলো না। মাথার মধ্যে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছেলেটার হাসিমুখ ভাসতে লাগলো।।

 

###

আনিকার একটা ভীষণ বাজে অভ্যাস হলো গত সাত আট দিনে রোজ সকালে সে “গ্রীন” এর পেজে একবার ঢু মেরে আসে। বিভোর আহমেদ নামে প্রোফাইলটাও ঘুরে এসেছে, একটা ফর্মাল পাসপোর্ট সাইজের ছবির মতো ছবি প্রোফাইল পিকচার করা। খুব একটা এক্টিভ নয় বা আনিকা বন্ধু নয় বলে দেখতেও পারেনা অন্য কিছু। তিন নম্বর রোডে ওদের একটা অফিস আছে। আনিকা ইউনিভার্সিটিতে থেকে ফেরার পথে একদিন তিন নম্বর রোডে হেঁটে এলো। একটা তিনতলা বাড়ির নিচতলায় সামনে গ্যারেজে সাইনবোর্ড লাগানো, “Green” সবুজ রঙ করা। কিন্তু বিভোরকে আসে পাশে দেখতে পেলো না।

পরে আরো একদিন গেলো, বাড়িটা ছাড়িয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখলো, অনেকটা পথ চলে এসেছে। তাই আবার ফিরলো। গ্রীনের সামনে আসতেই বুক ধুকপুক করতে লাগলো, তবে কেউ নেই আসে পাশে।

তখনি হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ডাকলো, আরে ম্যাম, আপনি এখানে?

আনিকা ভয়েসটা শুনে চমকে উঠলো, একটা সাদা কালো স্ট্রাইপ ট্রাউজার আর নেভী ব্ল্ হুডি পরা বিভোর! তিনতলা বাড়িটার গেট দুটো, পাশের গলির গেট থেকে বিভোর বের হচ্ছে।

আনিকা চিনতে পেরেও না চেনার ভাল করলো, চোখে অচেনা ভাব আনার চেষ্টা করলো! বিভোর হেসে বললো, আমি বিভোর, ওই যে আপনার বাসায় গেলাম!

আনিকা এবার বললো, ও হ্যা হ্যা!
তবে অভিনয়টা খুব একটা ভালো হলো না।
বিভোর মনে মনে ভাবলো, চিনতে পেরেও না চেনার ভাব করলো মেয়েটা। তারপর বললো, আসুন না আমাদের বাসা এটা! মা আছেন, আমার ছোট বোন আছে, আসুন!

আনিকা অদ্ভুতভাবে রাজি হয়ে গেলো, বললো, আচ্ছা চলুন!

বিভোর খুবই অবাক হয়ে গেলো, একবার বলতেই অপরিচিত কারো বাসায় এভাবে যেতে কোন মেয়ে রাজি হয় না, মেয়েটা ভীষণ অদ্ভুত তো!

তারপর বিভোর বললো, আপনাকে আরো একদিন দেখলাম এদিকে, কতদূর গিয়ে আবার ফিরে এলেন! এদিকে কাউকে খুঁজছেন?

আনিকা মনে মনে লজ্জা পেলো কিন্তু মুখে বললো, না না, এমনিই সময় ছিল, ভাবলাম এ রাস্তায় ঢুকিনি কখনো, একটু হেঁটে দেখি! আপনি কোথা থেকে দেখলেন?

বিভোর দোতলায় বারান্দা দেখালো, বারান্দাটা পাশের গলির দিকে, মেইন তিন নম্বর রোডের দিকে না, বললো, এটা আমার রুমের বারান্দা, দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন দেখলাম।

বিভোর কেচিগেট খুলে ভেতরে গেলো, সিড়িটা অন্ধকার, কিন্তু একটা সাদা এনার্জি বাল্ব জ্বলছে। মোজাইক করা সিড়ি, বাড়িটা মনে হয় অনেক আগে তৈরি করা!

আনিকা জিজ্ঞেস করলো, এটা আপনার বাড়ি?

বিভোর বললো, হ্যা, এখন আমারই, আমার বাবার আর কি, তার অবর্তমানে আমার।

দোতলার দরজা খোলাই ছিল, ভীষণ সাধারন একটা ড্রয়িংরুম কিন্তু ছিমছাম। রুচির ছাপ স্পষ্ট, সোভার কভার, জানালার পর্দা সবই চেক, এক ধরনের, কনট্রাস্ট রঙের কুশন। একপাশে একটা শোকেসে বেশ কিছু মেডেল আর ক্রেস্ট রাখা, ওয়ালে দুটো ছবি, একটাতে পাঁচজন, দুজন মেয়ে সাথে বিভোর আর বাবা মা সম্ভবত আর একটায় বিভোরের স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছবি!
কি মায়াময় মুখটা। আনিকার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করলো।মনে মনে লজ্জিত হলো, বেহায়া ইচ্ছের কথা ভেবে।

বিভোর ডাকলো, আসুন ভেতরে!আনিকা কিছু মনে না করেই ভেতরে চলে গেলো। বিভোর একবারে কিচেনে নিয়ে গেলো, আম্মু, একজনকে নিয়ে এসেছি, দেখো!

বিভোরের মা আয়শা আহমেদ, তিনি কাজ করছিলেন, আনিকা দেখলো বিভোরের মা বেশ সুন্দরী, এবং পরিপাটি, তিনি রান্নাঘরের কাজ করছেন, কিন্তু চুলটা সুন্দর করে আঁচরানো, এবং শাড়িটাও সুন্দর করে পরা।

আয়শা আহমেদ আনিকার দিকে তাকিয়ে বললেন,
কি নাম মা তোমার?

আনিকা সালাম দিয়ে বললো, আমি আনিকা, আন্টি।
এই আট নম্বর রোডে আমার বাসা

বিভোর বললো, ওনার বাসায় একদিন ডেলিভারি দিতে গিয়েছিলাম।

আয়শা আহমেদ বললেন, আমার এমবিএ পাশ করা ছেলে সগর্বে বলছে, ডেলিভারি দিতে গিয়েছিলাম, একটু লজ্জাও লাগে না তোর!

বিভোর হা হা করে হেসে বললো, নাহ, লাগে না তো, তাহলে কি আর ব্যবসা করতে পারতাম।

আনিকার মা ছেলের কথোপকথন খুব ভালো লাগছিলো।

আসলে একটা মানুষকে ভালো লাগলে তার আশেপাশের সব কিছুই ভালো লাগতে শুরু করে! এই বাড়িটা, রুমটা, আয়শা আন্টি বা আশপাশের সব কিছুই আনিকাকে কেমন মোহগ্রস্ত করে ফেলছিলো। বারবার মনে হচ্ছিল, ইশ সব কিছু কি সুন্দর! কোথাও একটা কষ্ট কষ্ট অনুভূতিও ছিল, মনে হচ্ছিলো কি যেন নাই ধরনের।

এখন সাড়ে এগারোটা বাজে, আনিকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরছিলো, সকালে একটা ক্লাশ ছিল, বাকি একটা ক্লাশ লাঞ্চের পরে, এতক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছে করলো না বলে চলে এসেছে।এসে মনে হলো এই রোডের একটু ঢুকি, রিক্সা গলির মাথায় ছেড়ে দিয়ে ভেতরে হাঁটছিল।

আয়শা হাত মুছতে মুছতে আনিকার সাথে কথা বলছিলেন। আনিকারও গল্প করতে ভালো লাগছিলো। কিছুক্ষণ পরে বিভোর নিচের দোকান থেকে সিংগাড়া নিয়ে এলো, আনিকা জমিয়ে বসে সিংগাড়া খেলো, বিভোর অবাক হয়ে দেখলো, আনিকা সোফায় পা তুলে বসে সিংগাড়া খাচ্ছে আর মায়ের সাথে গল্প করছে! যেন কতবার এসেছে এ বাড়িতে। বিভোরের এই বিষয়টা খুব ভালো লাগলো।

তুলি থাকলেও ভালো হতো, কলেজে গিয়েছে বোধহয়। দেরী করে ঘুম ভাঙার কারনে বিভোরের সাথে দেখা হয়নি! বিভোর একবার খুব সকালে ওঠে, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সবজি গুলো রিসিভ করে ডেলিভারিতে পাঠিয়ে তারপর একটু ঘুমিয়ে নেয়। তাই তুলির সাথে সকালে দেখা হয় না। আনিকা গল্প করতে করতে শুনলো, বিভোরের বড় বোন লন্ডনে থাকেন।বিভোরকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন কিন্তু সে যায়নি। দেশে থেকেই কিছু করবে বিভোর।

প্রায় সোয়া বারোটা বেজে গেলো, আনিকা বললো, আন্টি এবার আমি উঠি!পরে একদিন আসবো। বিভোরের মা বললেন, সেকী, দুপুর হয়ে গেছে, আমাদের সাথে খেয়ে যাও আজ! আনিকা উত্তর দিলো , না আন্টি, আমি না হয় পরে একদিন আসবো, আজ আসি তাহলে। মা চিন্তা করবেন।

-বিভোর, আনিকাকে পৌছে দিয়ে আয়!

আনিকা আবারও বললো, না না আন্টি, আমার বাসা তো কাছেই! পৌছে দিতে হবে না!

বিভোর তাও বাসার নিচে নামলো। তেমন কোন কথা হলো না, তবে আনিকাকে গলির মাথা পর্যন্ত পৌছে দিয়ে চলে এলো!

আনিকা রিক্সা নিলো না, একটু সরে দাঁড়ালো, দেখবে বিভোর কি পেছনো তাকাবে, মনে মনে কাউন্ট করা শুরু হলো, ওয়ান, টু, থ্রি….বাহ, এই যে তাকিয়েছে!

বিভোর কিছু মনে করে তাকায়নি, এমনিই তাকিয়েছে! আনিকা রিক্সায় উঠেছে কিনা দেখতে, নাহ ওঠেনি, ওই যে দোকানটার চিপসের বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে! ভারী অদ্ভুত মেয়ে তো!সমস্যা কি ওর! ভাবতে ভাবতে বাসার গেটে ঢুকে গেলো বিভোর।

 

###

আনিকা বাসায় ফিরে চিন্তা করলো, এটা কি করলাম, চেনা নাই জানা নাই একজনের বাসায় ঘুরে এলাম। বেশি গায়ে পড়া দেখালো না! থাক বাদ দেই, আর না গেলেই হলো! একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো, ছেলেটা বদও হতে পারতো। নাহ, এই ছেলেটা খারাপ হতেই পারে না। ইশ, ওর যে বান্ধবী, সে কতো লাকি, কি সুন্দর হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেন্ড, এতো অমায়িক শ্বাশুড়ি পাবে, বিভোরের কল্পিত বান্ধবীকে নিয়ে হিংসায় পুড়ে যেতে লাগলো আনিকা।

বিভোর নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকে। তাই আনিকার বিষয়টা আর মনে থাকলো না। রোজ ভার্সিটি যাওয়ার সময় বা ফেরার সময় আনিকা একবার তিন নম্বর রোডের ভেতরের দিকে তাকায়। কেউ থাকেনা, তবুও একটু কেমন যেন লাগে!

আনিকার বাবা একদিন রাতে বললেন, গ্রীনে গিয়েছিলাম। কাল সকালে কিছু সবজি দিয়ে যাবে। আনিকার সেরাতে ঘুম হলো না , সকালে সে ক্লাশে যাবে না ঠিক করলো! হালকা পার্পল একটা সুতির জামা বের করে রাখলো! এই জামাটায় তাকে সুন্দর লাগে।
সকাল সকাল উঠে তৈরিও হয়ে গেলো! হালকা কাজল দিলো, একটু লিপগ্লসে ঠোঁটটা ভেজালো। মিষ্টি লাগছে দেখতে, নিজেই আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে বাহবা দিলো।

সাড়ে সাতটার দিকে কলিংবেল বাজলো, আনিকা দৌড়ে সবার আগে গিয়ে দরজা খুলে দেখে একটা শুটকো মতো ছেলে হাতে কিছু সবজি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!আনিকা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কে? কি চাই?

ছেলেটি বললো, গ্রীন থেকে আপনাদের অর্ডার ছিল!

আনিকা মাকে ডাকলো , মনটাই খারাপ হয়ে গেলো! বোঝা উচিত ছিল, রোজ রোজ তো বিভোর আসবে না। কিন্তু আনিকা এতো অপেক্ষা কেন করছিলো! আশ্চর্য তো!

আনিকার মা জিজ্ঞেস করলেন, কোথাও কি যাবি?

আনিকা মুখে বললো, না, এমনিই, ভার্সিটি যাবো!  ধূর ক্লাশেও যেতে ইচ্ছে করছে না! তাও আনিকা ক্লাশের জন্য বের হয়ে ভার্সিটি গেলো।

ক্লাশ শেষে ফেরার সময় ক্যাম্পাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বাস আসছে না। প্রচন্ড গরম লাগছে, সকালে নিয়ে আসা শালটাও বিরক্ত লাগছে!

কোথা থেকে সাঁ করে একটা বাইক এসে আনিকার পাশে থামলো!
–আরে আপনি? কেমন আছেন?

আনিকা দেখলো, হেলমেট খুলছে বিভোর! আনিকার একটু অস্বস্তি লাগলো, সকালে বিভোরের জন্যই অপেক্ষা করছিলো।

— এই তো ক্লাশ শেষ করলাম, বাসায় যাবো! বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি!

–আচ্ছা, আমার সাথে যেতে পারেন, তবে বাইকে না, এটা বন্ধুকে দিতে হবে, এই শংকরে অপেক্ষা করছে।

–তো বাইকে না, কিভাবে যাবেন? রিকশায়? বাইকটা কি রিক্সার পেছনে নিয়ে যাবেন?

বিভোর হেসে ফেললো, বললো না না, ধরুন আপনাকে বাইকে তুললাম, তারপর সামনে নিয়ে নামিয়ে বললাম, এখন রিক্সায় যাবো! বিষয়টা কেমন না?

আনিকা বললো, কি আশ্চর্য, আমি কি আপনার সাথে যেতে চেয়েছি!

-আমি কি সেটা বলেছি নাকি!

– আচ্ছা আপনি চলে যান, আমি বাস পেয়ে যাবো!

-ওকে, গেলাম তাহলে! বাস আসতে দেরী হবে কিন্তু, আজ অনেক বাস নেই পথে, কোথাও জনসভায় নিয়ে গেছে।
আপনি রিকশা করে চলে যান।

আনিকা কিছু বললো না। তবে মনে মনে ভাবলো, আর একটু জোর করে বললো না, একবার বললে কেউ যায় নাকি!

বিভোর বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো।

আনিকা খুবই অবাক হলো, তারপর মনে হলো, ছেলেটা অহংকারী, একবার বলেই চলে গেলো। এখান থেকে ওদের এলাকায় একটাই বাস সার্ভিস সরাসরি যায়, আশুরা।

মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকার পরে একটা বাস এলো। বাস কম থাকলেও ভীর নেই, আনিকা লেডিস সিটে না বসে জানালার পাশে বসলো। পরের স্টপেজ এ লোকজন উঠলো কিছু, হঠাৎ চেনা কণ্ঠস্বর, হ্যালো, ম্যাম, আপনার পাশের সিটটা ফাঁকা, আমি বসতে পারি?

বিভোর, আবার!

ঘুরে ফিরে ওর সাথেই বারবার দেখা হয়ে যাচ্ছে, এটা কি কাকতালীয় ঘটনা!

বিভোর বসতে বসতে বললো, বন্ধু এখানে চলে এসেছিলো, ওকে বাইকটা দিয়ে আমিও বাসের অপেক্ষা করছিলাম, তাই আবার দেখা হয়ে গেলো!

আনিকা কথা না বলে হাসলো! বিভোর নিজের ফোন বের করে স্ক্রল করতে লাগলো, আনিকা জিজ্ঞেস করলো, আপনার এফবি আইডি কি নামে? গ্রীনের এডমিন আপনি?

আনিকা জানে কিন্তু, তারপরেও জিজ্ঞেস করলো ।

বিভোর বললো, বিভোর আহমেদ, না গ্রীনে এক্টিভ থাকে তুলি, আমার বোন।আপনার প্রোফাইল কি নামে?

–আনিকা আরাফাত, আনিকা উত্তর দিলো!

–ওহ, আঙ্কেলের নাম তো আরাফাত!

বিভোর খুঁজে বের করে বললো, এড করে নিলাম, আনিকা মাথা নাড়লো।

এরপর কিছুক্ষণ চুপচাপ, বিভোর আনিকার প্রোফাইল দেখে বললো, আপনি সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন! আমার থেকে পাক্কা আট বছরের ছোট আপনি! অথচ কি একটা ভারিক্কি ভাব নিয়ে ঘোরাঘুরি করে এখনকার মেয়েরা! যেন কত বড় হয়ে গেছে!

আনিকা বললো, ভারিক্কি ভাব কই নিলাম!আমি এমনিতেই এমন!

-ওহ আচ্ছা, বাদাম খাবেন?

-জি না! আপনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন?

-ঢাকা ইউনিভার্সিটি!

-তো চাকরি না করে, বিদেশে না গিয়ে এমন ব্যবসা করতে ভালো লাগছে?

– ভালো লাগছে বলেই করছি, বিভোর উত্তর দিলো।

– আন্টি কি রাগ করেন না?

-রাগ ঠিক না, একটু অভিমান আছে, ছেলে কি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না! তাই।

পাত্রীপক্ষ কে বারবার এই উত্তর দিচ্ছেন, আর পছন্দের পাত্রীরা ভেগে যাচ্ছে!

বিভোর খুব মজা করে কথাটা বললো, আনিকা হেসে ফেললো!মেকি হাসি না, প্রাণ খোলা হাসি।

প্রথমবারের মতো, বিভোরের আনিকাকে একটু ভালো লাগলো, আগে একবারো অন্যভাবে ভাবেনি!

-আপনার বুঝি বিয়ের কথা চলছে? আনিকা মনে মনে ভাবলো তাহলে বান্ধবী টান্ধবী নাই মনে হয়।

– মা তিন বছর ধরে পাত্রী খুঁজে চলেছেন, আমি আসলে এখনো প্রস্তুত নই, গ্রীনকে চেইন সুপার শপ করার ইচ্ছে আছে, এজন্য সময় দিতে হয়।বউকে সময় দিতে পারবো না এখনি!

-নিজের পছন্দ নেই কোন??
আনিকা জিজ্ঞেস করে লজ্জা পেলো।

-নাহ, এখন আর নেই কেউ! বিভোর উত্তর দিলো।

-তার মানে আগে ছিলো? আনিকা আবার জিজ্ঞেস করলো।

-থাকতেই পারে!!

বিভোরের উত্তরে ভীষন লজ্জা পেলো আনিকা।

আনিকা টপিক পাল্টে জিজ্ঞেস করলো , আজ আপনি আসেননি কেন ডেলিভারি দিতে?

-আমি তো খুব একটা যাই না, লোকজন কম থাকলে যাই।

-ওহ আচ্ছা।

কথা বলতে বলতে চলে এলো শেষ স্টপেজ।
তিন নম্বর রোড পর্যন্ত হেঁটেই এলো আনিকা, বিভোরের সাথে গল্প করতে করতে, ওখান থেকে রিক্সা নিয়ে নিলো।

ইশ আজ দিনটা এতো সুন্দর, রিক্সার ভেতর থেকেই পেছন ফিরে বিভোরকে আর একবার দেখে নিলো আনিকা।

 

হয়তো তোমারই জন্য – পর্ব ২

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 5 comments