5

লাল গোলাপের গল্প

 

মহিলা ক্রিশ্চিয়ান। মিস ডোনা এলিজাবেথ নামে চেনে সবাই। বিয়ে করেননি মনে হয়, বছর পঞ্চাশের মতো বয়স হবে। একাই থাকেন একতলা বাড়িতে। সাথে হয়ত চাকর আছে একজন৷ সেও বেশ বয়স্ক। আমি তখন স্কুলে পড়ি৷ দেয়াল ঘেরা মিস ডোনার বাড়িটা বেশ লাগতো দেখতে। বাড়িটা ওনার ছিল কিনা ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে বাড়ির সামনে একটা ক্রিসমাসট্রি গাছ, গেটের কাছে বোগেনভিলিয়ার ঝাড় একটা।

আরো সিজনাল ফুল লাগানো থাকতো গেট থেকে বাড়িতে ঢোকার রাস্তার দুপাশে। উঁকি ঝুকি মারতাম মাঝে মাঝে। চুলগুলি বিছিয়ে বসে থাকতেন বাড়ির সামনের লাল সিমেন্টের বেঞ্চে। তেমন কারো সাথে মিশতেন না। আমাদের মায়েরাও তার বিষয়ে গল্প করতেন শুনতাম। তবে আমাদের সামনে কিছু বলতেন না।

মিস ডোনা পাহাড়ের উপরের অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের গান শেখাতেন। সকাল সকাল সাদা গাউন পরে বের হয়ে যেতেন।
বাড়িটা ছিল পাহাড়ের নিচে। বাড়ির সামনে থেকেই এঁকেবেকে পথটা অনাথ আশ্রমের দিকে উঠে গিয়েছে। ওটা পরিচালনা করে মিশনারী সোসাইটি ।

আমদের পাহাড়ের ওপরের দিকে যাওয়া বারণ ছিল। মিস ডোনার বাড়ির সামনে থেকে উল্টো পথে ছিল আমাদের স্কুল
এটা নব্বই দশকের প্রথম দিকের কথা। তখন ল্যান্ডফোনটা কেবল মফস্বলে সচ্ছল লোকেদের বাড়িতে এসেছে। টিভি ছিল চৌকনা বোকা বাক্স। মায়েরা খাওয়া শেষে দুপুরে আশপাশের তিন চারজন মিলে সেলাই হাতে গল্প করতে বসতেন। হয়ত ছাদে, হয়ত কারো বাড়ির বারান্দায়। মিস. ডোনা এসব কখনো করতেন না।

অনাথ আশ্রমে গান শিখিয়ে চলে যেতেন গীর্জায়। কিছু সময় থেকে বাড়িতে ফিরতেন। একদিন আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে উকি দিচ্ছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে কেউ টোকা দিলো। আমি ভেবেছি কোন বন্ধু, পিছন ফিরে দেখলাম মিস. ডোনা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, তবে ভয় পাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। আমি দৌড়ে চলে গেলাম। এরপর প্রায়ই মিস ডোনার সাথে দেখা হতো বাড়ির সামনে৷ কিভাবে যেন ওই সময়ই ওনি বের হতেন।

একদিন আমাকে ডাকলেন। বললেন, ছোট্ট সাহেব, কি নাম আপনার? আমি বললাম, আমার নাম বিপু! প্রতিদিন দেখা হয়ে আমার ভয়টা কেটে গিয়েছিল। মিস ডোনা আমাকে ওনার বাড়িতে ডাকলেন একদিন। আমি গেলাম। এক বুড়ো মহিলা কাজ করছিল। মিস ডোনা তাকে বললেন, মেরী আন্টি, আমার ছোট্ট অতিথিকে তুমি কি খাওয়াবে? মেরী আন্টি হেসে ভেতর থেক আমাকে দুটো মিষ্টি এনে দিলেন। একটা টুকটুকে লাল, আর একটা ধবধবে সাদা সন্দেশ।

মুখে দিতেই কি মিষ্টি ঘ্রান। সেদিন মনে হয়েছিলো, ইস আগে কেন আসিনি এখানে। এর পর থেকে মাঝে মাঝেই যাওয়া শুরু করলাম মিস. ডোনার বাড়িতে। ওনার বাড়িতে একটা পিয়ানো ছিলো। একদম সিনেমায় যেমন দেখাতো, তেমন। কতগুলে সাদা ধবধবে পায়রা আর দুটো খরগোশ। আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে ওখানে কিছু সময় থাকতাম। মিস.ডোনার মাঝে মাঝে ফিরতে একটু দেরী হতো।

আমাকে মেরা আন্টিও খুব ভালোবাসতেন। বলতেন, শিশু হলো যিশু….ইশ্বর। কিন্তু একদিন মায়ের কাছে কোন এক আন্টি নালিশ করে বসলেন, আমি রোজ রোজ খ্রিষ্টান মহিলার বাড়ি যাই। মা তো রেগে মেগে আগুন! কেউ চেনেনা ওদের ভালো করে, অল্প কয়েক বছর এখানে এসেছে, তাও কারো সাথে মেশে না! বাবাকে বলে দিলেন। বাবা অবশ্য প্রফেসর মানুষ, তিনি রাগ করলেন না। বাবা বললেন, মহিলা হয়ত বিপুকে স্নেহ করেন, তাই যায় বেচারা।

মা শুনতে চাইলেন না! খ্রিস্টান মহিলা, কি আছে মনে কে জানে! কারো সাথে মেশে না! একা একা থাকে! বাবা বললেন, আচ্ছা, আমি না হয় একদিন যাবো বিপুর সাথে।

একদিন মিস ডোনার ফিরতে দেরী হচ্ছিল, আমি মেরী আন্টির সাথে বাগানে বসে পায়রাদের গম দিচ্ছিলাম। মিস.ডোনা ফিরলেন। আজ মনে হলো তার মন খারাপ। আমি মেরী আন্টির কাছে জানতে চাইলাম, কি হয়েছে আন্টি? মেরী আন্টি বললেন, আজ মনে হয় রণিতের কথা বেশি মনে পরছে! আবারও জানতে চাইলাম, রণিত কে? মেরী আন্টি বললেন, তুমি বুঝবে না বেবী, আজ বরং পেয়ারা পারি চলো!

মেরী আন্টি আমাকে পেয়ারা পেরে দিলো। তার কয়েকদিন পরে মিস ডোনা আবার আগের মতো হয়ে গেলেন। একদিন আমরা খরগোশকে গাজর কেটে দিচ্ছিলাম, আমি জানতে চাইলাম, ডোনা আন্টি, রণিত কে?
মিস ডোনার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
বললো, রণিত আমার বন্ধু, ওই পাহাড়ের ওপরে থাকে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে ওকে মিস করো কেন!
দেখা করলেই তো হয়!
মিস. ডোনা কিছু বললেন না।

আমি প্রায়ই যেতাম, মিস. ডোনা আমাকে গান শিখিয়েছিলেন। স্কুলের প্রোগ্রামে আমি গাইলাম, মঙ্গল করো, মঙ্গল করে, মলিন মর্ম মোছায়ে…..
তব পুন্য কিরন দিয়ে যাক মোর মোহ কালিমা ঘোচায়ে…..
সবাই খুব খুশি হলো, বিশেষ করে মা।

এক রবিবারে স্কুল ছুটি ছিল। আমি মা কে না বলেই চলে এলাম মিস. ডোনার কাছে। এসে দেখি তিনি তৈরি হয়েছেন, কোথাও যাবেন বলে, হাতে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ। মেরী আন্টি বাড়িতে ছিলেন না। আমাকে দেখে বললেন, চলো বিপু বাবু, তোমাকেও নিয়ে যাই, রণিত খুশী হবে। আমিও মহা উৎসাহে চললাম। এদিকে আমাকে কোথাও না দেখে মা চিন্তা করতে শুরু করলেন।
আসে পাশের বন্ধুর বাড়িতেও খোজ শুরু করলেন। কোথাও না পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে মিস. ডোনার বাড়িতে চলে এলেন।
মেরী আন্টি তো আমাকে দেখেন নি, তাই তিনিও বলতে পারলেন না!

বাবা চিন্তায় পরে গেলেন। মা কান্না কাটি শুরু করে দিলেন। মেরী আন্টি কি বলবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না! তারপর বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, ডোনা ফিরবে এখনি। তার ঘন্টাখানেক বাদে আমরা ফিরলাম, মা আমাকে দেখেই দৌড়ে এলেন।
মিস. ডোনা বললেন, সে কি বিপু বাবু, তুমি বাড়িতে বলে আসোনি??
আমরা ভিতরে গিয়ে বসলাম। ডোনা আন্টি খুব দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আমারই ভুল হয়েছে, আপনাদের না জানিয়ে ওকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি!

মায়ের কৌতুহল ছিল। সে জানতে চাইলো, কোথায় গিয়েছিলেন আপনি বিপুকে নিয়ে।
ডোনা আন্টি কিছু সময় চুপ করে রইলো।
তারপর বললো, পাহাড়ের ওপরে একটা গ্রেভইয়ার্ড আছে, গীর্জার পাশে,
বাবা বললেন, হ্যা, ওখানে তো মুক্তিযুদ্ধে নিহত কয়েকজন ভারতীয় সেনার কবর আছে।
ডোনা আন্টি বললো, হ্যা।
ওখানে রণিতও আছে, আমরা রণিতকে ওর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম।

তারপর আন্টি বললেন, রণিত আমার ফিয়ন্সে ছিল, আমাদের বাড়ি জলপাইগুড়িতে। ও ছিল ইন্ডিয়ান আর্মির তরুন ক্যাপ্টেন। আমাদের এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ওকে এখানে চলে আসতে হয়, ১৯৭১ সালে। রণিত আমাকে বলে এসেছিলো, ওর জন্য অপেক্ষা করতে। তারপর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ওর খবর পাইনি। যুদ্ধ শেষে খবর পেলাম, ও এই অঞ্চলে যুক্ত ছিল।

ওর গুলি লেগেছিল, মিশনারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ও মারা যায়। ওকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। ওর কবর খুজে পেতেই আমি এখানে চলে আসি। ম্যারি আন্টি আমার ন্যানী ছিলেন, আমাকে একা ছাড়লেন না। তিনিও চলে এসেছেন আমার সাথে। আমি এখানে থেকে রণিতকে অনুভব করতে পারি! আমার মনে হয় ও আমার কাছেই আছে!

বাবা কোন কথা বললেন না। মায়ের দেখলাম চোখ ভিজে উঠেছে। বললেন, চোখে কিছু একটা পড়েছে বোধহয়! আমরা ডিসেম্বর পর্যন্ত ওখানে ছিলাম। পরে বাবা ট্রান্সফার হয়ে চলে আসেন। আন্টির কাছে মাঝে মাঝেই যেতাম। আন্টি লাল গোলাপ নিয়ে রণিত আংকেলের কাছে যেতেন।
আজ বুঝতে পারি, কি অসম্ভব ভালোবাসা তিনি পুষে রেখেছিলেন বুকের ভেতর!!

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 5 comments