1

রোদের চিঠি

 

(১)

 

শহরের শেষ মাথায় চওড়া লাল ইটের রাস্তাটা ,সামনে তাকালে মনে হয় কোনদিন যেন শেষ হবে না। কিন্তু রাস্তাটা শেষ হয়েছে চৌধুরী পুকুর পাড়ে। নামেই পুকুর, আসলে ওটা দিঘির মতো বড়, লম্বায় এপার ওপার দেখা যায় না। পুকুরের ঘাট চৌধুরী সাহেবরাই বাঁধিয়ে দিয়েছেন। ঘাট লাগোয়া দুটে বকুল ফুলের গাছ আছে।

এই লাল ইটের রাস্তাটা নিশার খুব পছন্দের। রাস্তার মাঝে একটা শিমুল গাছ, এইসব বসন্ত দিনে গাছটা আগুনরঙা ফুলে ভরে থাকে। নিশাদের বাড়ির দিক থেকে এই রাস্তাটা উল্টো দিকে, তবু নিশা এইপথে সময় পেলেই আসে। নিশার খুব ইচ্ছে এই পথে একদিন খুব প্রিয় কারো হাত ধরে হাঁটবে। প্রিয় মানুষটা কে, সেটা ভাবতে নিশার খুব অস্বস্তি হয়, তবুও কেন যেন রঙচটা জিন্স আর নীল রঙ উঠে সাদাটে হয়ে যাওয়া শার্ট পরা ওই ছেলেটা নিশার ভাবনায় চলে আসে। ছেলেটা কলেজের ছাত্র, বাবার কাছে ফরম ফিলাপের জন্য একদিন এসেছিলো। নিশার বাবা স্থানীয় কলেজের অধ্যাপক, বাংলা পড়ান। এমনিতে ছেলেটি সারাদিন কলেজের অপরদিকে যে পার্টি অফিস, ওখানে বসে ক্যারাম খেলে, আড্ডা দেয়, সকলে বলে মদ গাঁজাও খায়। নিশার বিশ্বাস হয় না।

ছেলেটার গায়ের রঙ ফর্সা ছিলো বোধহয় কোন এক সময়, এখন রোদে পোড়া রুক্ষ হয়ে গেছে, মনে হয় কোন যত্ন নেই।
সারাক্ষণ একটা মোটর সাইকেল নিয়ে পুরো এলাকায় এদিক সেদিক দাপিয়ে বেড়ায়।
তবুও নিশার কেন যেন ওই ছেলেটার কথা মনে হয়।

ছেলেটার নাম আসিফ। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা নামের ক্যাডার। নিশা স্কুলে আসা যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে দেখে ছেলেটাকে। মনে হয়না ছেলেটা তাকে খুব একটা খেয়াল করে। নিজের বাড়ির সামনে সিড়িতে বসে এলোমেলো কথা গুলো নিশা ভাবছিল। নিশার হাতে একটা গল্পের বই, ‘নির্বাচিত প্রেমের গল্প’। ভারতীয় লেখকদের গল্প, প্রথম গল্পটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর, গল্পের নাম “কথা”। এক পৃষ্ঠা পড়ে নিশা আটকে আছে নিজের চিন্তায়। এই বইটা তার না, তার বন্ধু রুশার। কাল ফেরত দিতে হবে বলেছে।

মা ডাকছে, নিশা বইটা লুকিয়ে ফেললো। সামনেই এসএসসি পরীক্ষা তার, মা বা বড় আপা দেখলে রক্ষা থাকবে না। তুলোধুনো করে ছাড়বে। নিশা বইটা রেখে বাড়ির ভেতরে গেলো।
রাতে লুকিয়ে বইয়ের ভেতর রেখে পড়তে হবে, এখন আর সুযোগ নেই পড়ার।

 

(২)

 

জাহেদা বেগমের মাথা গরম হয়ে আছে। ইদানিং তার খুব অল্পতেই রাগ উঠে যায়। জীবনযুদ্ধে বারবার হেরে গিয়ে নিজেকে অসহায় লাগে। গত পাঁচবছর ধরে স্বামী বিছানায়। তার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে, আর অসুস্থ স্বামী নিয়ে জাহেদা বেগমের সংসার। বড় মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন দুই গ্রাম পরে।
জামাই দলিললেখক। ইনকাম খারাপ না কিন্তু বছরে দুইবার তার হাত খালি হয়ে যায়। তখন তার বড় মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠায়। মেয়ে মুখ শুকনো করে বলে, তোমার জামাইয়ের হাত খালি, হাজার বিশেক টাকা খুব দরকার। এই টাকা তখন যোগান দেয় তার বড় ছেলে, আসিফ। ছেলেটা ভালো ছাত্র ছিল, তারপর কি রাজনীতি-টিতি করলো, এখনো কলেজে যায় শোনেন৷ কিন্তু পড়তে আর দেখেন না। আশপাশের মানুষে বলাবলি করে ছেলেটা বখে গিয়েছে। নেতার ডান হাত, সবাই ওকে ভয় পায়। নেশাও করে নাকি, যদিও তিনি কখনো টের পাননি।

ছোট মেয়েটার কাহিনী আরো মারাত্মক, এক ছেলেকে নিজে নিজে বিয়ে করেছে। কিন্তু সেই ছেলের পরিবার মেনে নেয়নি। এখন মেয়ে তার কাছেই থাকে। ওই জামাই মাঝে মাঝে আসে। সেই মেয়ে গর্ভবতী, কয়েকদিন পরেই তার বাচ্চা হবে। কে জানে, মা কেই মেনে নেয়নি, বাচ্চাকে মানবে কিনা।

ছোট ছেলেটা একটু বোকা বোকা। বোকা বলতে মানসিক গতি একটু ধীর, পড়াশোনায় তেমন ভালো না।
টেনে টুনে ক্লাশ এইটে উঠেছে।

এই পরিবার নিয়ে জাহেদা বেগমের মাথা ঠিক থাকার কথা না। তবুও এই ছয় সদস্যের পরিবারে তার ভরসা আসিফ, তার বড় ছেলে। তিনি আসিফের সাথে কথা বলেই একটু আরাম পান। নিজের ইনকাম বলতে বাজারের মধ্যে বাসা, সামনে তিনটা দোকান ভাড়া দেওয়া। আর টুকটাক জমি জমা থেকে যেটুকু ধান চাল আসে।

আসিফ যে টাকা দেয় তাতে সংসারের বাজার সহ টুকটাক খরচ চলে যায়, কোথা থেকে টাকা পায়, সেটা তিনি জানতে চান না। জানতে চেয়েও বা কি হবে!

সকালে তার বড় মেয়ে এসেছে, তার নাকি খুবই খারাপ অবস্থা। হাজার পনের টাকা এখনি লাগবে। এই পনের হাজার টাকা কই থেকে আসবে, সে চিন্তায় তিনি অস্থির। আসিফ এখন বাসায় নেই, আসিফ ফিরলে আলোচনা করতে হবে।

জাহেদা বেগম জানালার পর্দার দিকে তাকালেন। ময়লা হয়ে গিয়েছে, শুধু ময়লা না, বেশ পুরোনো। পুরোনো বলে ময়লা দেখায়। জাহেদা বেগমের স্কুল জীবনের কথা মনে পরে। একটা মেয়ে পড়তো তার সাথে, ওই মেয়ের বাবা কি যেন সরকারি চাকরি করতো। ওদের বাসায় বেতের সোফা আর চেক চেক পর্দা ছিলো। জাহেদা বেগমের খুব ইচ্ছে করতো, তার বাসাও এমন সাজাবেন। কেন যেন হয়নি ঘর সাজানো।

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। তারপর একে একে চারটা বাচ্চা, শখ টখ মরে গেছে! জীবনে কোন কিছুই পাননি তিনি, জাহেদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আসিফ বের হয়েছে নয়টার দিকে। তার কোন ক্লাশ নেই, কিন্তু তবুও সে নয়টার দিকেই পার্টি অফিসে যায়। জীবনে অনেক ভেজাল আর টেনশনের মধ্যেও আসিফের একটা ছোট্ট ভালোলাগা আছে। যদিও আসিফ খুব ভালো করে জানে, এই ভালোলাগা নিরর্থক। স্বাভাবিক ভাবে কোনদিন নিশা তার হবে না। তবুও আসিফের কেন যেন নিশাকে খুব ভালো লাগে।

এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা আসিফ ইচ্ছে করলেই একদিন নিশাকে তুলে নিয়ে আটকে রাখতে পারে। কেউ কিচ্ছু বলতে পারবে না। আসিফের কেন যেন এটা করতে ইচ্ছে করে না। আসিফ নয়টা বিশের দিকে পার্টি অফিসের রাস্তার দিকের জানালায় দাঁড়ায়, নিশা স্কুলে চলে যায়। ত্রিশ সেকেন্ড সময়ও না, তবুও যেন কত কি!

নিশা প্রতিদিন বিকেলে ম্যাথ টিউশনে যায়। শনি সোম বুধবারে শাপলা কোচিং এ ক্লাশ করে। আসিফের সব মুখস্থ। এই সময়গুলি আসিফ মোটর সাইকেলে ঘোরাঘুরি করে! নিশার দিকে তাকালেও নিশা বুঝতে পারে না, কারণ আসিফের চোখ ঢাকা কালো রোদ চশমায়।

শহরের শেষে যে লাল ইটের রাস্তাটা, বসন্ত দিনে শিমুল গাছের আগুনরঙা ফুলে অদ্ভুত হয়ে থাকে, আসিফের ইচ্ছে করে কোন একদিন সে নিশার সাথে এই রাস্তায় হাঁটবে, অনেকটা সময় নিয়ে।

 

আরো পড়ুন: রোদের চিঠি – পর্ব- ৩ ও ৪

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 1 comments