1

রোদের চিঠি

 

(১২)

 

চার বছর পর ………

বাস থেকে নামতেই ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো। যেই সেই বৃষ্টি না, মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির সিজনে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই কথাটা নিশার মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো একদম। আচ্ছা বৃষ্টি “ঝুপ” করে নামে কেন, শব্দটা “ঝুপ” কেন!!

আসলে চার বছর পরে বাড়িতে আসবে, এই উত্তেজনায় মাথা থেকে সবটা বের হয়ে গিয়েছিলো।
এসএসসি পরীক্ষার পরে ঢাকার কলেজে ভর্তি হয়েছিলো, এরপর আর বাড়ি আসা হয়নি, প্রথমে মামার বাসা, তারপর হোস্টেল এই করে বছর খানেক কাটার পরে নিশার বাবা বাসা করে দিলেন।
মা মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতে শুরু করেন , বাবাও যান।
তাই ফেলে যাওয়া এই শহরে আর আসা হয়ে ওঠেনি।
কলেজের পাট চুকিয়ে ভর্তি হয়েছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।
এখন হলেই থাকছে, আপুর বিয়ে হয়েছে মাস তিনেক আগে, আপুর বাসাও ঢাকাতে।
মা চলে এসেছেন আপুর বিয়ের পরে এখানে।
অনেক দিন পর তাই এই শহরে ফেরার তাড়া হলো।

এই শহরে ফেলে যাওয়া কৈশোর, প্রথম প্রেম……
প্রথম প্রেম মনে হতেই নিশার গলার কাছে অভিমান জমাট বেঁধে আসে।
সে কিছুতেই মনে করতে চায় এই একটা অধ্যায়, তবুও এক মুহুর্তের জন্যও সেই মানুষটা, সেই সময় পিছু ছাড়েনি।

বৃষ্টি কমছে না।
শহরটা অনেক বদলে গেছে চার বছরে।
এই বাসস্যান্ডের রাস্তাটা এত চওড়া ছিলো না
এই বাদিকের মার্কেটটাও নতুন।
কাউন্টার গুলো অনেক গোছানো, মার্কেটের নিচতলায় বেশ কিছু রেস্তোরা দেখা যাচ্ছে, কেউ নিতে আসেনি নিশাকে।

বাসায় বললে হয়ত বাবা আসত, নিশা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছে বলে কাউকে জানায়নি সে আসছে।

এখন বাজে আড়াইটা, স্ট্যান্ডে তেমন লোকজন নেই, বাস থেকে যারা নামলো, গ্রামের দিকের টমটমে চড়ে চলে গেছে বৃষ্টির মধ্যেই, হয়ত অনেকের ট্রলার ধরতে হবে।
এখানকার বলেশ্বর ঘাট থেকে দু’ঘন্টা পর পর ট্রলার ছেড়ে যায়।
কাউন্টারের লোকটা বিরক্ত মুখে বসে আছে। হয়ত পরের বাসের অপেক্ষায় । নিশার দিকে কয়েকটা ছোকরা ধরণের ছেলে তাকিয়েছিলো, নিশা পাত্তা দেয়নি একদম!

ইশ, ছাতাটা ব্যাগে আনলেই হতো, কাঁধে একটা ব্যাকপেক শুধু, নিয়ে চলে যাওয়া যেতো!

হঠাৎ নিশার চোখ আটকে গেলো একটু দূরে, সবুজ রঙের পাঞ্জাবী পড়া ওই মানুষটা কে, আসিফ না? হ্যা আসিফই তো, কলেজের দিকের রাস্তাটা থেকে হেঁটে আসছে!

নিশা চাইলেও চোখ ফেরাতে পারলো না, কেমন আছে আসিফ, বিয়ে করেছে? এখন কি করছে? এখনো রাজনীতি করে? কারো সাথে কি প্রেম করছে? একটানা এতগুলো প্রশ্ন মনে নড়াচড়া শুরু করলো!
ঝুম বৃষ্টি মানে ঝুম বৃষ্টি, বৃষ্টির বেগ বাড়ছে!
বাইরের সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে!

আসিফ এদিকে আসছে কেন, ওহ আল্লাহ, এদিকে কেন আসতে হবে, নিশা চায় না আসিফের সাথে তার আবার দেখা হোক! এই চার বছরে যে অভিমান বুকের মধ্যে জমা করে রাখা, তার পুরোটাই আসিফের জন্য!

আসিফ বর্ষায় হাঁটতে পারছিল না, বাইকটা গ্যারেজে।
জগলুকে ফোন করে অটো নিয়ে এগোতে বলেছে, ও এখনো আসেনি।
বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়া বোকামি হয়েছে খুব।

আসিফ এখন কলেজের ছাত্র সংসদের সেক্রেটারী। নির্বাচিত সেক্রেটারি, রাজনীতির পাশাপাশি নিজে ব্যবসাও করছে টুকটাক।
আগের সেই গুন্ডা ভাবটা এখন আর নেই, সে রাজনীতি করবে, টিকে থাকার রাজনীতি, এটা মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে।

কাউন্টারের কাছে এসে আসিফ ভীষণ চমকে গেলো, এটা কে, নিশা!!
সেই ছোট্ট নিশা, স্কুলে যেতো দুইবেনী করে!
একদিন আসিফের সাথে দেখা করতে সেই নিরিবিলি বাড়িতে চলে গিয়েছিলো, প্রচন্ড ভালোবাসায় আসিফকে শক্ত করে ধরে চুমু খেয়েছিলো!
তারপর একদিন হুট করে আসিফের বাসায় গিয়ে বলেছিলো, আসিফকে বিয়ে করতে চায়, আসিফ নিজের ভালোবাসা বুকে চাপা দিয়ে নিশাকে হাতে ধরে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিলো!

সেদিনকার সেই নিশা, আসিফ প্রতিরাতে যাকে স্বপ্নে দেখে!
এক মুহুর্তও যাকে ভুলে থাকা যায়নি!
কিন্তু আসিফ যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি, খোঁজও নেয়নি ইচ্ছে করে!
নিশা আর তার দুটো আলাদা পৃথিবী, দুজন কখনো এক হতে পারবে না স্বাভাবিক ভাবে, নিশার বাবা, কলেজের অধ্যাপক, স্যারকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে আসিফ।
তার কোন বদনাম হোক, তাও আসিফের জন্য এটা আসিফ কখনো করতে পারবে না!

সামনা সামনি হতেই আসিফ মাথা নিচু করে নিলো, সেই আসিফ যাকে এলাকার সবাই সমীহ করে, ভয় পায়।
নেতাও তাকে বুঝে চলে এখন!
আসিফ ছাড়া এলাকার রাজনীতি হাতছাড়া হতে সময় লাগবে না। এই প্রভাববলয় আসিফ তৈরি করে ফেলেছে!

নিশা চোখ নামিয়ে না নিলেও অন্যদিকে তাকালো!
আসিফের মনে অনেক প্রশ্ন আসে, হয়ত নিশার তখনকার ব
আবেগ এখন আর নেই, ঢাকা শহরের রঙে সে বদলে গিয়েছে, এখন হয়ত আগের কথা ভেবে লজ্জা পাবে।
থাক কি দরকার, সেসব কথা তোলার!
দু হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকেও কথা হয়না অনেকক্ষণ।

দূরে জগলুর অটো দেখা যাচ্ছে, নিশা উৎসাহী দৃষ্টিতে তাকায়, হয়তো ডাকবে ভাবে, আসিফ নেমে যায় অটো কাছে আসতেই!
কিছু একটা বলে আবার সিড়ি দিয়ে নিশার সামনে এসে শুধু বললো, বাসায় যাবে তো?
এসো…
নিশার ইতস্তত দৃষ্টি, আসিফ বললো, এখানে এখন আর কিছু পাবে না, বৃষ্টি থামবে বলেও মনে হয়না।
এসো।
আসিফ ছাতা ধরে নিশাকে জগলুর অটোতে তুলে দিলো!
নিশা অটোতে বসে একবার আসিফের দিকে তাকলো!
আসিফ আবারো চোখ নামিয়ে নিলো, নিশার দৃষ্টিতে তাকানোর মতো ক্ষমতা তার নেই!

শুধু বললো, সাবধানে যাও!

-জগলু, ওকে নামিয়ে দিয়ে এখানে আয়, আমি দাঁড়াচ্ছি!

নিশা চলে গেলো, আসিফ ছাতা হাতে চলে যাওয়া অটোর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে!

 

আরো চার বছর পরের গল্প ………… 

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 1 comments