2

রোদের চিঠি

 

(১১)

আসিফ মাঠে গিয়ে দেখলো মাঠ প্রায় ফাঁকা, অসংখ্য পুলিশ মানুষকে বের করে দিচ্ছে। স্টেজ ফাঁকা, দলের ছেলে পেলে কাউকে দেখলো না। কোথায় গেলো সব! এখন কি নেতার বাসায় যাবে, কি করা উচিৎ এখন! নাকি হাসপাতালে যাবে!

স্টেজ থেকে নেমে নেতা সোজা নিজের গাড়ি করে বাসায় চলে গিয়েছেন। তিনি ভাবছেন, একটা বড় ভুল হয়েছে।
দলের একটা টিকটিকি আসিফের নামে কথা লাগালো, আর তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না।
আসিফই ঠিক ছিল, আশপাশে বোমা পড়লে কারো কিছু হতো না, হইচই হতো !
এখন প্যান্ডেল থেকে বের হতে গিয়ে কতজন আহত কে জানে। যে বলদ ইনফরমেশন দিয়েছে, ওকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভেতরে অরাজকতা করার। কিন্তু কি হলো !
পুলিশ পোলাপান ধরে নিয়ে গেছে।

এরা দলের কিন্তু স্বীকার করা যাবে না। কেউ যদি আসিফের নাম বলে দেয়, তাইলে আসিফকে বাঁচান কষ্ট হবে, আসিফ গেলে আসিফ আসবে আর একটা, কিন্তু ওর মতো বুদ্ধিমান সাহসী ছেলে কমই পাওয়া যায়।
টাকা দিলেই কাজের মানুষ পাওয়া যায় না।

আসিফের কাছে তার ফোন নম্বর আছে। ছেলেটা যদি একটা ফোন করতো, তাইলে বলে দেওয়া যেত, কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে থাক। ইশ, কি ভুলটা যে হয়েছে , কিন্তু এটা স্বীকার করা যাবে না!

আসিফ কিছুক্ষণ ভেবে একটা ফোনের দোকান থেকে সরাসরি নেতাকে ফোন করলো। নেতা সুর পাল্টে বললো, –বাপ কই আছোস, কিচ্ছু হয় নাই তো তোর!

আসিফ বললো, আমি ঠিক আছি! ভিতরে ঝামেলা করছে কারা, এগুলা তো আমি করাই নাই!

–শোন ঝামেলা হইছে, বলদ পোলাপান ধরা খাইছে, তুই পলনা থাক মাসখানেক। আমি থানা সামলে তোরে খুঁজে বের করবো! সাতদিন পর পর ফোন করিস!

আসিফ বললো, আমি এখন কোথায় যাবো! সদরের বাইরে?

—যেদিক মন চায় যা, টেকা তো আছে, নাইলে চিটাগং যা, ঘুইরা আয়। পুলিশ যেন তোরে না পায়।

বাসায় পুলিশ অফিসার আসছে, নেতা ফোন রাখলো।

আসিফ ফোন রাখলো।সে স্যাবোটেজ বুঝতে পারছে, এখন সে পালালেই মাঠ খালি। কিন্তু কিছু করার নাই।

আসিফ দ্রুত বাসায় গেলো। নিজের ব্যাগে জামা কাপড় নিলো। ড্রয়ার খুলে বইখাতা গুলো চোখে পড়লো, গত মাসে কিনেছিল পরীক্ষার জন্য, ধরাও হয় নাই।
আসিফ বই গুলিও নিলো, একটা পুরোনো ডায়েরি, কিছু ওষুধপত্র নিয়ে নিলো।

আসিফের একটা গোপন জায়গা আছে। কেউ জানেনা সেটার কথা! মা কে বললো, শহরের বাইরে যাচ্ছে, দিন পনেরো পরে ফিরে আসবে! তারপর বের হয়ে মনে হলো, নিশাকে ফোন করা হয়নি। ঝামেলায় মাথা থেকে বের হয়ে গেছে, এখন আর ফোন করার সময় নেই। আসিফ বাইকটা বাসায় রেখে বের হয়ে গেলো, কালো ক্যাপে মুখ ঢেকে।

আসিফের গোপন আস্তানা হলো চৌধুরী বাড়ি, লাল রাস্তার শেষ মাথায়। এ বাড়িতে কেউ থাকে না, দারোয়ান থাকে শুধু। সে নিচতলার পেছনের দিকে একটা ঘর খুলে দিলো আসিফকে। আগেও একবার আসিফ এসেছে। এই দারোয়ান কলিম লোকটা আসিফকে খুব পছন্দ করে। তার মেয়ের বিয়ের সময় এই গুন্ডা আসিফ এক কথায় বিশ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছে। গুন্ডা হইতে পারে, মনটা বিশাল। আগের বার ছিল যখন, তখন ভাড়া নিয়েছিলো, এবার আর কোন ভাড়া নিবে না সে।

এই জায়গায় কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে আসিফ থাকতে পারে। বছরের এ সময়ে চৌধুরীরা কেউ আসবে না বাড়িতে। তাই আসিফ শহরের বাইরে না গিয়ে এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আসিফের এখন কোন কাজ নেই, সময়টা লম্বা মনে হচ্ছে। আশে পাশে পোকামাকড় ডাকাডাকি শুরু করেছে। আসিফ কলিম চাচাকে জিজ্ঞেস করলো, এ বাসায় টিএন্ডটি লাইন আছে? কলিম চাচা জানালো আছে, তবে উপরে যেতে হবে। আসিফ বললো, একটা ফোন করা খুব দরকার! কলিম চাচা দরজা খুলে দিলো। আসিফ নিশার বাসার নম্বর ডায়াল করলো, রিং বাজতেই দৌড়ে এলো নিশা! ওর কণ্ঠ শুনেই আসিফ বুঝতে পারলো! আসিফ শুধু বললো, নিশা আমি ভাল আছি, তুমি চিন্তা করো না।

 

★★★

এইসব দিনগুলি আসিফের ভালোই কাটছে।
তাকে থাকার জন্য একটা রুম খুলে দেওয়া হলেও দোতলার খোলা বারান্দা পর্যন্ত সে যেতে পারে।
দোতলা থেকে এতদিনের চেনা পুকুরটা অচেনা মনে হয়।

সকালবেলা উঁচু আম গাছের পাতার প্রাচীর ভেদ করে রোদ এসে পড়ে আসিফের জানালায়, পায়ের কাছে। নভেম্বর শুরু, শীত শীত ভাব আছে। হাজার হাজার পাখির কিচিরমিচির শোনা যায় সারাদিন। মাথায় একটা চিন্তা কাজ করে যদিও। বাড়ির সামনে ফুলগাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়নি।উঠানে নরম মাটি এখনো, খালি পায়ে হাঁটতে বেশ লাগে। উঠানের কোণে বাগানবিলাসটা বড় হয়ে ছাদ ছুয়েছে। আসিফ ইচ্ছে করেই নেতাকে ফোন করেনি! আসিফের অভাবটা বুঝানো দরকার।

তবে মাঠের রাজনীতি আর ভালো লাগছে না।
একটা বিষয় আসিফ বুঝতে পারছে, তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু টাকার জোর আছে বলে আসিফের সাহস আর ইমেজকে নেতা, আজগর ভাই কিনে নিচ্ছেন। এভাবে মুখে ফেনা তুলে আসিফের স্তুতি করলেও প্রয়োজনে সুপুরি দিয়ে আসিফকে ফেলে দিতে কেউ দুবার ভাববে না।

জীবনের বেশ কয়েক বছর নষ্ট করেছে আসিফ। তবে টিকে থাকতে হবে। রাজনীতির মাঠেই থাকতে হবে।
এবার আর নামে ছাত্রনেতা হয়ে না, সামনে এগিয়ে থাকতে হবে।

নেতার দেখানো দুমুখোরূপটা এবার আসিফ কাজে লাগাবে, তবে একদিনে কিছুই সম্ভব না। আসিফের পরিবারের রাজনৈতিক কোন ব্যাকরাউন্ড নেই, তাই সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে প্ল্যান করে আসিফের এগুতে হবে। এসব ভাবনাগুলো আসিফের মাথায় উঁকি দেয়। তবে কিভাবে শুরুটা হবে, এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। নিশার কথা মনে হয়। ওর সাথে সাত আট দিন আগে একবার কথা বলে জানিয়েছিল আসিফ যে সে ভালো আছে। তারপর আর কথা হয়নি। ওর পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা, হয়েছে নিশ্চয়ই। এখন হয়ত সকাল সকাল স্কুলে যায়না নিশা । তবে পরীক্ষার সময়টা ঠিক জেনে নিত আসিফ। সে সময়ে দূরে দাঁড়াতো। কি মনে করে একদিন বিকেলে আসিফ ফোন করে ফেলে নিশার বাসায়, কিন্তু ফোন নিশা তোলে নি। আরো দুয়েক দিন ফোন করেছে। একদিন ফোন বেজে গেলো, কেউ তুললো না। তৃতীয় দিন নিশা তুললো ফোন।

আসিফ বললো, নিশা……
নিশা অস্থির হয়ে বললো, আপনি কোথায় গেছেন বলেন তো? কোথাও তো দেখি না আপনাকে!

–আমি একটু বাইরে আছি, তুমি ভালো আছো?
-হু, বাইরে কোথায়? কবে আসবেন?
–ঠিক জানিনা এখনো, তোমার পরীক্ষা চলছে?
-হু, দুইটা আছে!

নিশার মা ডাকলো, নিশা কে ফোন করেছে??
নিশা অপ্রস্তুত ভাবে বললো কেউ না মা!

কেউনা তো কথা বলছো কার সাথে?

রুশার সাথে!

আসিফ হেসে ফেললো! বললো, আচ্ছা রাখছি, মিথ্যে বলতে হবে না তোমার!
নিশা আস্তে বললো, না না, রাখবেন না, আপনি কবে আসবেন?

আসিফ একটু দুষ্টুমি করে বললো, তুমি বলো কবে আসতে হবে?
আমি তখনি চলে আসবো!

নিশা বললো, ধুর, সেটা হয় নাকি!

–বলেই দেখো না!

নিশা কিছু বললো না, তার কান গরম হয়ে উঠছে, হাত পা ঝিম ঝিম লাগছে, কি আশ্চর্য, এমন লাগছে কেন!

আসিফ বললো, আচ্ছা আমি এই সময়ে তোমাকে ফোন করবো, এই সময়ে ফোন বাজলে তুমি রিসিভ করবা, ঠিক আছে!

নিশা ঘাড় নেড়ে হ্যা বললো, কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে দেখা গেলো না।
তবুও আসিফ বুঝে নিলো!

নিশা রাখছি এখন, ভালো থেকো!

আসিফ ফোন রেখে দিলো। আসিফ কোথায় আছে কেমন আছে, আসিফের কোন সমস্যা হতে পারে, এই প্রশ্নগুলো নিশার মাথায় এলো না, একটা অদ্ভুত ভালোলাগার নিষিদ্ধ অনুভূতিতে মনটা ছেয়ে রইলো। যেন কেউ এখনি শুনে ফেলবে, বুঝে ফেলবে এমন অনুভূতি।

ফোনটা রেখে আসিফের শান্তি শান্তি লাগলো, নিশা এত অস্থির, ওকে ডাকলেই ও এখানে চলে আসবে। কিন্তু আসিফের ইচ্ছে হলো না নিশাকে এই নির্জন পরিবেশে নিয়ে আসতে। তার চাইতে এই নিরিবিলি পরিবেশে, নিশার কথা ভেবে সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। সামনে পরীক্ষা, ফাইনাল এবার দিতেই হবে। ছাত্র সংসদের নির্বাচন পরীক্ষার পরেই, আসিফ ঠিক করলো, সাধারণ সম্পাদক পদে এবার আসিফ দাঁড়াবে। রাজনীতির পথে কতদূর যাওয়া যায় সে দেখতে চায়।

আসিফ নিজের বইখাতা গুলো নেড়েচেড়ে দেখে।
সব মিলিয়ে সেকেন্ড ক্লাশ পাওয়ার মতো নম্বর তার আছে, প্রথম থেকে পড়লে হয়তো ফার্স্টক্লাশটাও পেতে পারতো, পায় তো তার ডিপার্টমেন্ট থেকে ।
যদিও এগুলো ভেবে এখন আর লাভ নেই।

আসিফ কাগজ কলম নিয়ে হঠাৎ একটা চিঠি লিখে ফেললো, জানালার রোদ সেই কাগজের উপর এসে পড়েছে।
লাল কলমের কালি চিকচিক করছে….
রোদে ঝলমল সে চিঠিতে লেখা ছিলো,

নিশা,

মেঘের ডানায় ভর করে কিছু স্বপ্ন উড়ে যাচ্ছিলো, বৃষ্টির সাথে কিছু স্বপ্ন আমার চোখে এসে পড়ে।
কিন্তু অশ্রুগুলো বড় স্বার্থপর, তাড়িয়ে দিয়েছে স্বপ্নগুলোকে।
আমি অনেকদিন ধরে ওদের খুঁজছি।

তুমি কি পারবে ওদের খুঁজে দিতে?

আসিফ

এই চিঠি কি কখনো নিশা পাবে, আসিফ জানে না।

 

★★★

নিশার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। মোটামুটি মানের ছাত্রী নিশার পরীক্ষাও মোটামুটি হলো। কিছুটা অস্থিরতায় সময় কাটছে তার, মা আর বোনের চোখ এড়ালো না। কিন্তু সন্দেহ করার মতো কিছু চোখেও পড়লো না। এই বয়সটা পার করে আসা নিশার বড়পা নায়লাও বুঝতে পারছে নিশার মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। অন্যমনস্ক হয়ে থাকা বা হুটহাট খাওয়া শেষ করে উঠে যাওয়া এগুলো নিয়ে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন নায়লাকে। নিশার অগোচরে বইখানা ডায়রী খোঁজা হয়েছে, কিন্তু কিচ্ছু পায়নি তারা।
তাই চিন্তা করা বাদ দিলো।

আসিফ ফোন করলো আরো চার পাঁচ দিন পরে।
নিশা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কবে আসবেন?
আসিফ আবারো হেঁয়ালি করেই বললো, বলে দেখো না তুমি, যখন বলবে তখনই আসবো!

নিশা কিছু বললো না, বলতে মন চাইলো, কাল বিকেলে বের হবো, চলে আসেন।

আসিফই বললো, তুমি এক কাজ করো, সেই যে একা এসেছিলে চৌধুরী পুকুরপাড়ে, ওখানে চলে এসো কাল।
আসবে? নাকি ভয় পাবে!

নিশা ভয় পায়নি, আসিফ জানে সেটা। নিশা বললো, আচ্ছা কাল সকালে আসবো!

মিতুকে নিয়ে আসি?

আসিফ শক্ত ভাবে বললো, না।
একাই এসো!

নিশাকে আসতে বলে আসিফের মনে হলো কাজটা ঠিক হলো না। এখন অনেকগুলো বিপদ হতে পারে। সে ঘন্টাখানেক বাদে আরেকটা ফোন করলো, কিন্তু ফোন বেজে গেলো কেউ পিক করলো না।

নিশা সকাল সকাল কিছু নোটপত্র সাথে নিয়ে বের হয়ে কোচিংএ গেলো, তারপর কোচিং এ না ঢুকে উল্টোদিকে চলে গেলো!
এই রাস্তায় আসলেই কারো কোন কাজ থাকে না। দূরে ভর্শাদি গ্রাম থেকে দুয়েকটা ভ্যানে মানুষ সদরে আসে তাও এই মোড়ে।
চৌধুরী বাড়ি পর্যন্ত ফাঁকা। ঢিপঢিপ বুকে ধীরুপায়ে নিশা পৌছে গেলো পুকুর পাড়ে, কই কোথাও তো কেউ নেই! আসিফ কখন আসবে, কয়েক মুহুর্ত পরে দারোয়ান এসে নিশাকে ডাকলো, আপনাকে ডাকে। নিশা চমকে উঠলো, কে? কাঁপা গলায় বললো নিশা।

আসিব্বাই, ওহ আচ্ছা, কোথায় উনি?
দারোয়ান বললো, আসেন।

নিশা এগুলো দারোয়ানের পিছু পিছু। আসিফ গেটের ভেতরে অপেক্ষা করছিলো। নিশাকে দেখে হাসলো!আসিফ কিছুটা ফর্সা হয়েছে। মনে হয় একটু ভারীও হয়েছে মুখটা। চোখটা ক্লান্ত।

নিশা বললো, আপনি এখানে?
আসিফ বললো, আসো ভেতরে আসো!

কোথায় যাচ্ছে, কোন বিপদ হতে পারে, এই বোধ টাই কাজ করছে না নিশার।

আসিফ নিশাকে নিয়ে ঘরে বসালো।বিছানাটা গোছানো, পুরোনো একটা বেডশিট বিছানো।এটা দারোয়ান চাচার রেস্টরুম। নিশা চারপাশ দেখে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখানে থাকছেন? কেন??

আসিফ উত্তর দিলো না।
একটু চুপ করে থেকে বললো, তুমি কেমন আছো?
এখন কোচিং করছো?
স্কুলে যাও?

–স্কুলে কোচিং শুরু করাবে ডিসেম্বরে।
যাবো না মনে হয়।
বাসায় বসেই পড়বো!

-তোমার ভয় করছে না?অপরিচিত একটা জায়গায়, ব্যাড বয়ের সাথে বসে আছো?

-উফফ, আপনি তো এই কথাটাই ভুলতে পারেন না দেখি।

আসিফ হেসে ফেললো। নিশা আসার পরে ওর টেনশন লাগছে না একদম। কিছু সময় গল্প করার পরে দারোয়ান চাচা পরোটা ভাজি রেখে গেলো! নিশা নাস্তা করে এসেছো? পরোটা খাও? নিশা পরোটা ছিড়ে মুখে দিলো একবার। তারপর বললো, একদম শক্ত কিভাবে খাচ্ছেন? আসিফ হাসলো, বললো অভ্যাস হয়ে গেছে। না পারলে খাওয়া লাগবে না! নিশা আর নিলো না। নিশার কোন জড়তা নেই, কেমন একটা অভ্যস্ততা, যেন কত বার আসিফের সাথে এভাবে কথা বলেছে!

আসিফ নাস্তা শেষ করে নিশাকে বাড়ির কম্পাউন্ড, উপরটা ঘুরে দেখালো! আসিফের কেমন অদ্ভুত লাগলো, , এই বাড়িটার কেউ না আমি, অথচ এমন ভাবে ঘুরছি, যেন পুরো বাড়িটায় অনেকটা কর্তৃত্ব আছে। আসিফ ভাবলো, কোনদিন যদি সুযোগ হয়, এরকম একটা বাগানবাড়ি, সে নিশার জন্য করে ফেলবে! পেছনের গাছ ভরা জলপাই। নিশা কয়েকটা হাত দিয়ে পাড়তে চাইলো কিন্তু হাত গেলো না অতোটা উপরে। আসিফ ডাল টেনে পেড়ে দিলো।

ঘন্টাখানেক পরে আসিফ বললো, নিশা কাউকে বলো না আমি এখানে। আর তুমি চলে যাও এখন। দেরী করো না। নিশা বললো, আর একটু থাকি? আসিফ না করলো না! নিশা তুমি আলতা পরো না? আলতা দিলে তোমাকে খুব ভালো লাগবে- আসিফ বলল নিশাকে। নিশা ঠিক করলো এরপর থেকে ও সব সময় আলতা পরবে । নিশা আরো কিছুক্ষণ বিছানার উপরে পা তুলে গল্প করলো! আসিফ বসেছিলো মেঝেতে।

তারপর নিশা ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো। নিশা চলে যাওয়ার পরে হঠাৎ আসিফের খুব একা লাগতে লাগলো।এতদিন একা লাগেনি। জীবনে কেউ না থাকলে একাকীত্ব বোধ যতোটা হয়, কেউ এসে চলে গেলে সেই বোধটা দ্বিগুন বেড়ে যায়। নিশা সাবধানে চলে গেলো, আজ তার খুব ভালো লাগছে। ইশ আসিফের সাথে ওখানে যদি থাকা যেতো, ভাবতেই নিজে লজ্জা পেলো!
আসিফের সাথে থাকতে হলে আসিফকে তো বিয়ে করতে হবে, এটা কি কখনো হবে!

নিশা মনে মনে ঠিক করে ফেললো, যাই হোক, সে আসিফ ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না! নিশার আবেগটাই লাগামছাড়া। শর্তহীন, দ্বিধাহীন।
এমন আবেগ হয়তো খুব স্বল্পস্থায়ী হয়।
কে জানে নিশার আবেগ কতক্ষণ থাকবে!

 

★★★

নিশা নাস্তা করে যাও – সকালে ডাইনিং থেকে মা ডাকছে। নিশার আসতে অনেক সময় লাগলো, একটা উপপাদ্য এক্সট্রা মিলাতে অনেক সময় লেগে গেলো। ডাইনিং এসে দেখে সবার খাওয়া শেষ, টেবিলে সবজি ডিমপোচ আর চার পাঁচটা রুটি রাখা।
নিশার হঠাৎ গতদিনের কথা মনে হলো, আসিফ কিভাবে ওই শক্ত খাবারগুলো রোজ খাচ্ছে।

নিশা দ্রুত টিফিনবাক্স বের করে খাবারগুলো ভরে নিলো, রুমে গিয়ে দুটো খাতা ব্যাগে ভরে বের হয়ে গেলো।
নায়লাপু জিজ্ঞেস করলো, কিরে কোথায় যাচ্ছিস? মিতুকে নিয়ে রুশার বাসায় যাবো- বলে নিশা বের হয়ে সোজা চৌধুরী বাড়ির কাছে চলে এলো।

আজ গেটে কেউ নেই, ও দুবার কড়া নাড়ালো। এই সময়ে আর কেউ আসবে না, আসিফের মনেই হলো নিশা আসছে। তাই ও গেটের কাছে গিয়ে ভীষণ অবাক হলো। নিশার আসাতে ভালোও লাগছে, আবার টেনশন ও হচ্ছে। নিশা আসিফের হাত ধরে ওর ঘরটায় টেনে নিয়ে গেলো। তারপর বললো, আমার আজ সময় নেই, আপনি তাড়াতাড়ি নাস্তা করে ফেলেন, আমি চলে যাই।আসিফের সামনে টিফিনবাক্সটা দিলো।

আসিফ ভীষণ ভীষণ অবাক হয়ে গেলো, নিশা এমন কেন! সে নিশাকে কোনদিন আপন করে পাবেনা, এটা খুব ভালো করে জানে। নিশা এতো পাগলামি কেন করছে, নিশাকে কিভাবে ভুলে থাকবে আসিফ! আসিফ কোন কথা বলছে না দেখে নিশাই রুটি ছিড়ে আসিফের মুখের সামনে ধরলো। আসিফের চোখ ভিজে উঠলো কিন্তু সামলে নিলো নিজেকে।

নিশা পুরো খাবারটা আসিফকে খাইয়ে দিলো। আসিফ পানির বোতল নিতে নিতে বললো, নিশা, তুমি কিন্তু আর এসো না প্লিজ। তুমি এখানে আসছো, এটা সেফ না, রাস্তাটা অনেক নিরিবিলি। আমার টেনশন হয়, আমি তো এখানে আটকে আছি কয়েকটা দিন। আমি বের হলে তারপরে নিয়ে আসবো। ঠিক আছে?

নিশা বুঝতে পারলো। ঘাড় নেড়ে হ্যা বললো।
-তাহলে আজকে আসি? বলে উঠলো নিশা।

দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো আসিফের কাছে, আসিফ ততোক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। নিশা খুব দ্রুত আসিফকে জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু খেলো, আসিফ হতভম্ব হয়ে গেলো, ও বুঝতেই পারলো না কি থেকে নিশা কি করে ফেললো, ও স্বাভাবিক হতেই নিশাকে দূরে সরিয়ে দিলো। আস্তে বললো, বাসায় যাও নিশা, অনেক দেরী হয়ে গেছে। নিশা এক দৌড়ে বের হয়ে চলে গেলো।

 

★★★

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মাসখানেক লাগে। আসিফ ফিরে এলো বত্রিশ দিন পরে। নেতা থানার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন।
আসিফের রোজকার রুটিন আগের মতো চলতে শুরু করে। আসিফ ভাবতে শুরু করে ছাত্রসংসদের নির্বাচন নিয়ে।

নিশার পরীক্ষা সামনে। স্কুলের কোচিং এর অজুহাতে দু তিনদিন পর পরেই বাইরে যায়, যেতে চায়। নিশার বাবার কাছে একদিন খবর চলে আসে নিশা কার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তবে দুয়েকবার ল্যান্ডফোনে কথা বলাও চোখ এড়ায় না নিশার বাবা মায়ের। কিন্তু নিশার পরীক্ষা সামনে। তাই তারা চুপ করেই থাকেন। নিশার বাবা কিছুটা হতভম্ব, নিশার এমন দুর্মতি দেখে। তবুও নিশার মাকে বলেন, খুব সাবধানে সামলে নিতে হবে। ছেলেটা ভাল না, সন্ত্রাসী ধরনের। আরো এমপির কাছের লোক। এখনো নিশা হাতের মধ্যেই আছে, ওর আবেগের বয়স। যদি কোন ভুল করে, তাহলে সামলানো কঠিন হবে। তবে পরীক্ষা এগিয়ে আসায় নিশার বাইরে যাওয়াটা কমে যায়।

চৌধুরী বাড়ি থেকে নিশা চলে আসার পরে আসিফের মনে হয় চিঠিটা নিশাকে দেওয়া হয়নি, ছেড়া কাগজটা ওর ডায়রীর ভাজেই থেকে যায়, বের করা হয়না। নিশার বাবা নিশাকে ঢাকা পাঠাবেন বলে মনস্থির করে ফেলেন। এসএসসি পরীক্ষার পরে সবাই এমনিতেও ঢাকা বেড়াতে যায়। তিনি ভেবেছেন, নিশাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতে পারলে, আর এখানে নিয়ে আসবেন না।
কিছুদিন দূরে থাকলে মন সরে যাবে। আপাতত ছেলেটা নিশাকে ডিস্টার্ব করছে না, নিশাই কথা বলছে, তিনি বিষয়টা খেয়াল করেছেন।

পরীক্ষা শেষ হলো। নিশা ভুলেও জানতে পারেনি, ওর হয়ত এখানে আর কখনো ফেরা হবে না। ঢাকা যাওয়ার আগেরদিন শুনলো, চাচার মেয়ে মিনু আপুর বিয়ের কথা হচ্ছে, তাই আপু আর নিশা বড় চাচার বাসায় যাবে। আর নিশা কলেজে ঢাকায় ভর্তি হবে। তাই কোচিং করবে ঢাকায়। দুপুরবেলায় নিশা দেখলো তার জিনিসপত্র মা সব কিছু গুছিয়ে ফেলেছেন। নিশা কি বুঝলো, কে জানে, ও কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে চলে গেলো।

পার্টি অফিসে আসিফ ছিলো না। এখন আসিফকে কোথায় খুঁজবে, কালুর কাছ থেকে শুনলো আসিফ আসিফের বাসায় আছে।
নিশা আসিফের বাসায় চলে গেলো! দরজা খুলে আসিফের মা অবাক হয়ে গেলেন। এতো ফুটফুটে একটা মেয়ে আসিফকে খুঁজছে! আসিফও ভীষণ অবাক হয়ে গেলো। কিছুটা অপ্রস্তুতও।

নিশা আসিফকে জানালো, সে চলে এসেছে এবং সে আসিফকে বিয়ে করতে চায়। আসিফ ঠিক বুঝতে পারলো না, তার কি খুশি হওয়া উচিত নাকি রেগে যাওয়া উচিত। সত্যিই নিশাকে আসিফ অনেক পছন্দ করে, কিন্তু এই মুহুর্তে বিয়ে করলে কার কি ভালো হবে! আসিফ একটু ভেবে নিশাকে বললো, তুমি এখনো অনেক ছোট নিশা। চলো তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি! নিশা আসিফকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি আমাকে পছন্দ করেন না? এই প্রশ্নের উত্তর আসিফ দিলো না।

নিশা যে বাসায় নেই এই কথাটা তখনো কেউ বুঝতে পারেনি। নিশার বাবা ছিলেন ছাদে। তিনি দেখলেন আসিফের বাইক থেকে নিশা নামছে। নিশা আসিফের হাত ধরে আছে। এই মুহুর্তে কি করা উচিৎ, তিনি আবার খেয়াল করলেন, নিশাই আসিফের হাত ধরে আছে। নিশা কাঁদছে, আশেপাশের কেউ কি দেখে ফেলবে, নিশার বাবা ছাদ থেকে নামতে গিয়েও নামলেন না। তার কেন কোন আশংকা হচ্ছে না। তিনি দেখলেন, আসিফ এক সময় নিশার হাত ধরে নিশাকে বাসার গেটে ঢুকিয়ে দিলো। নিশা ছুটে বাসার ভেতরে চলে এলো! নিশা হয়তো কাঁদছে, আহারে তার ছোট্ট মেয়েটা, কষ্ট পাচ্ছে!

তবে এই মুহুর্তে তার আসিফের জন্য বেশি কষ্ট হচ্ছে। তিনি দেখলেন আসিফ চলে যাওয়ার আগে শার্টের হাতায় চোখ মুছলো!ইশ, বাস্তবতা এত কঠিন! তার হাতে সবকিছু থেকেও কিছুই নেই।

নিশা ঢাকা চলে আসে পরদিন। পরবর্তী চার বছরেও নিশার ফেরা হয়নি। সময় থেমে থাকেনা। আসিফ আসিফের মতো বড় হয়েছে, নিশা নিশার মতো!

আসিফের রোদমাখা চিঠির কথা নিশার আর জানা হয়নি।

 

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 2 comments