1

রোদের চিঠি

 

(১০)

নিশার বাসায় যাওয়ার অজুহাত ঠিক করতে আসিফের বেশি সময় লাগলো না।
ফাইনাল পরীক্ষা কবে হতে পারে, এডমিট কবে আসবে এগুলো জিজ্ঞেস করতে স্যারের কাছে যাওয়াই যায়।
স্যার শিক্ষক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।

আসিফ সাথে নুরুলকে নিলো, নুরুল বছর খানেকের জুনিয়র। আর আসিফের এক বছর ড্রপ হয়েছে ইলেকশনের জন্য।

নিশাদের বাসাটা সুনন্দা আবাসিকে। প্লট করে দুপাশে জায়গা বিক্রি করা, মাঝখানে সুন্দর রাস্তা।
নিশার বাসায় রডের গেট, বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায়। আসিফ বাইক থামালো। গেট বাইরে থেকে খোলা যায়, ওরা বাসার সামনে গিয়ে দরজা নক করলো।

আশে পাশের সব প্লটেই বাড়ি আছে। কিছু বাড়ি তৈরি হচ্ছে, কাজ চলছে।
দরজা খোলাই ছিল, নিশার বাবা সামনে এলেন।
তিনি কোথাও যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন।
আসিফ সালাম দিল৷ নুরুল জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথাও যাচ্ছেন?

নিশার বাবা বললেন, হুম, একটু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাবো, আমার ছোট মেয়েটার জ্বর দুদিন, তাই ব্লাড টেস্ট করাতে হবে।

আসিফ জিজ্ঞেস করলো, ওকে নিয়ে যাবেন স্যার?

–হু, নিয়ে যাবো। একটু দুর্বল আছে, তাও নিয়ে যাই।

আসিফ বললো, দরকার নাই স্যার। নুরুল চলে যা বাইক নিয়ে। তাজমহল ডায়াগনস্টিক এর সুজা ভাইরে বল, স্যাম্পল নিতে হবে, এখনই যেন তোর সাথে চলে আসে।

নিশার বাবা বললেন, কি দরকার, আরো কত মানুষ ওখানে বসে আছে!

–স্যার, ওখানে অনেক ভীর হয়, লোক আছে অনেক।
আমার আব্বার জন্য রেগুলার যায় সুজা ভাই।
সমস্যা নাই, চলে আসবে। আসিফ উত্তর দিলো।

–আচ্ছা আচ্ছা, তুমি বসো!
নুরুল চলে গেলো।

–তা তোমরা কেন এসেছিলো, কোন কাজে?

–জি স্যার মানে পরীক্ষা কবে হইতে পারে আর এডমিট কবে আসবে ?

–পরীক্ষা হবে জানুয়ারীতে মনে হয়, এডমিট পরীক্ষার আগেই পাবা।তোমার তো গ্যাপ আছে তাই না? গতবার পরীক্ষা দাও নি!

আসিফ ঘাড় নাড়লো।

–ঠিক আছে, দাও এবার। মিস করো না।রাজনীতি পরীক্ষার পরেও করা যাবে।

নিশা এসে উঁকি দিয়ে আসিফকে দেখলো। তারপর বাবাকে বললো, বাবা যাবো না?

–না রে যেতে হবে না। ও লোক পাঠিয়েছে, বাসায় চলে আসবে।

আসিফ নিশার দিকে দেখলো, মুখটা শুকনো। একটা চাদর পেঁচিয়ে আছে।

নিশা বাসার সামনে সিঁড়িতে গিয়ে বসলো। আসিফও বের হলো, চলে যাবে। নিশার সাথে কথা হলো না।
আসিফ যখন গেটে, তখন নুরুল লোক নিয়ে এলো।

রক্ত নিবে নিশার কিন্তু আসিফের অদ্ভুত কষ্ট হতে লাগলো, এটা কেমন কথা!
আসিফ নিজেই কিল ঘুষি দিয়ে কত মানুষের রক্ত বের করেছে, আজ নিজের এত দুর্বল লাগছে কেন।

এই পাঁচ বছর ধরে বাবাকে অসুস্থ দেখে আসছে, আসিফের চোখ সয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু তেমন কোন সমস্যা হলো না।
সহজেই স্যাম্পল নিয়ে লোকটা চলে গেলো।
আসিফ বলে দিলো, রিপোর্ট যেন স্যারের বাসায় পৌছে দিয়ে যায়!

লোকটা চলে যাবার পরে নিশার বাবা আসিফ আর নুরুলকে ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, তোমরা চা খাও?
কিন্তু আসিফের কাজ আছে, তাই আর বসা হলো না।
আসিফ চলে গেলো।

নিশা খুব বুঝতে পারলো, এসব পরীক্ষা টরিক্ষা কিছু না।
ও দুদিন বের হয়নি, তাই আসিফ এসেছিল।

আচ্ছা আসিফের সাথে কি কোন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে নিশার! আসিফের দিকে দেখলে নিশার মনে হচ্ছে অনেক কথা বলা হয়ে যাচ্ছে। আসিফেরও কি তাই হচ্ছে?

কই আসিফ তো কিছু বললো না এখনো, সব সময় একটা গার্ডিয়ান ভাব নিয়ে কথা বলছে। যেন কত বড়
মানুষ যেন!

নিশা ভাবছিলো, আসিফেরই কত কিছু ঠিক করা দরকার। প্রথমেই শার্ট গুলি ফেলে দিয়ে গাঢ় নীল শার্ট কিনতে হবে।
এই গুন্ডা চেহারাটা একটু ঠিক করলে কি হয়!

অবশ্য তাহলে হয়তো এত ভালো লাগতো না দেখতে, থাক কিছু না বদলাক৷ যেমন আছে তেমনই থাক আসিফ!
আসিফের মতোই থাকুক। নিশা কি কোনদিন আরো কাছে যেতে পারবে?

নিশার সুস্থ হতে আরো কয়েকটা দিন লাগলো। যেদিন বের হলো, আবাসিক এলাকায় বাইরে দেখলো আসিফ দাঁড়িয়ে আছে!

নিশা একাই ছিল। আসিফ কিছু বললো না।
নিশাই হেসে জিজ্ঞেস করলো, ভালো আছেন?
আসিফ হ্যা সূচক ঘাড় নাড়লো, বললো, এখন সুস্থ পুরোপুরি?

–হু, একটু দুর্বল আছি।

–ওষুধ খাচ্ছো?

–হু, কিন্তু ভালো লাগে না।

–তবুও খাওয়া লাগবে। হুট করে জ্বর এলো কেন?

— সেদিন ভিজলাম পর মাথা ভার লাগছিলো কিন্তু জ্বর আসেনি, পরে ওইদিন বিকেলে শাওয়ার নিলাম, এজন্য মনে হয় । নিশা একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো, আপনি খাচ্ছেন, ওই যে সিগারেট, মদ গাঁজা।

আসিফ হেসে ফেললো, বললো, আমি বললাম, রোজ খাই না, দরকার হলে খাই! আমাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। আমি আমাকে কন্ট্রোল করি!
কতটুকু খেতে হবে, কখন থামতে হবে সেটা আমি জানি।

নিশা বলল, তাই বুঝি!
আসিফের কথা শুনতেও এত ভাল লাগছে।

–হু, এখন কোথায় যাবে, স্কুলে?

— না, আমি মিতুদের বাসায় যাবো।

–আচ্ছা, যাও তাহলে!

—আপনি আসবেন?

—না, তুমি যাও!

নিশার মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই, এখানে কেউ কথা বলতে দেখলেই বাসায় জানাবে। তা যাই বলুক!

–নিশা, একটু শোনো! আসিফ ডাকলো।

নিশা দাঁড়ালো, কিছু বলবেন?

আসিফ একটু ভেবে বললো, নাহ কিছু না, যাও।
সাবধানে যাইও।

আসিফ হেঁটে চলে গেলো।
নিশা দাঁড়িয়ে দেখলো আসিফ চলে যাচ্ছে।

আসিফের কাজ আছে। পার্টির ছেলেদের নিয়ে আজগর ভাইয়ের জায়গাটা দখল নিতে হবে। কিছু মেশিন আনতে হবে আস্তানা থেকে।

ভালো লাগছে না। জীবনটা এমন না হলে কি হতো!

 

##

আসিফ দলবল নিয়ে গেল আজগর ভাইয়ের জায়গা দখল করতে।
কিন্তু কোন কাজ হলো না। জায়গা দখল করতে পারলো না।

আজগার ভাইয়ার কথামতো সে জায়গা কিনেছে বিধু সরকারের কাছ থেকে। কিন্তু জায়গা দখলে আছে রমিজ তালুকদারের। রমিজ তালুকদারও বলছে সে জায়গা বিধু সরকারের কাছ থেকে কিনেছে, তার কাছে কাগজপত্র আছে।

রমিজ তালুকদার এর কাগজপত্র জোর বেশি।
আজগর ভাইয়ের কোন কাগজপত্র নাই।
পুলিশ এলো, পলিটিক্যাল ছেলেরা কিছু করতে পারলো না।

আজগর ভাই শাসিয়ে এলো, রমিজ তালুকদারকে দেখে নেবে।

আসিফকে বললো, কোন বালের পোলাপান আনছো, দু একটা কোপ টোপ না দিলে হয়!

আসিফ ঠান্ডা মাথার মানুষ,ও বললো, ভাইজান আপনে বলছিলেন জায়গা আপনার।
আপনার কথায় ভরসা কইরা আমি আসছি!
এখন কাগজ তো অন্য কথা বলে।

–আমারই জায়গা, রমিজ তালুকদার এর মাথা আমি ফালাইয়া দিমু, এত্ত বড় সাহস, আমার লগে লাগতে আসে।

—স্ট্যান্ডের জায়গা, বিরাট মার্কেট উঠবে, সে জায়গা ছাড়বে কেন!

–তুই রাইতে ওর গলাটা কাইটা দে আসিব, আমি তোরে লাল কইরা দিমু!

–ভাই, খুন খারাপি করতে পারমু না! বলছেন আসছি!
নেতায় জানেও না কিন্তু।

নেতার কথায় আজগর একটু দমে গেলো।

আসিফ চলে গেলো নেতার বাড়িতে।
দুইদিন পরে কলেজ মাঠে বিশাল জনসভা করা হবে।
অনেক আয়োজন আছে, নেতার তাকে ছাড়া চলবে না।
নেতা মিটিং করছিলেন।আসিফকে বললেন বসতে।

তারপর সবাই চলে গেলে নেতা বললেন, একটা গোপন কথা আছে আসিফ, তুই ছাড়া কোন কেউ জানি না জানে বাপ। সভার মাঝখানে দুইটা চকলেট ফাটবে।
আমার বক্তৃতার পরে, যখন আলতাফ ভাই কথা বলবে, তখন।তখন আমরা স্টেজ থেকে নামবো।

আসিফ জিজ্ঞেস করলো ভাই, এখন তো দল ক্ষমতায়, এখন বোম ফাটলে কয়েকটা মানুষ আহত হবে, কি দরকার বলেন তো?

তুই বুঝবি না বাপ, বড় হ, সামনে বড় পোস্ট পাবি।
এই সভায় বোম ফাটলে হেড অফিসের নজরে আসবো তাড়াতাড়ি।
মানুষ তো মরবে না, কয়েকজন হাত পা ভাঙবে।

মরে যদি? তখন? বিরোধী দল এমনেই মাঠে নাই!

না, উপরের লোকজন মনে করবে, আমগোর উপরে বিরোধী দল হামলা করছে, পুলিশ ওগো ধরবে, আমরা সেফ সাইডে থাকবো!
দেখ বাপ ব্যবস্থা করা লাগবে তোর।

আসিফ শুনলো, নেতা চাইছে, কিচ্ছু করার নাই।
এই জনসভার নাম সংবর্ধনা সভা।
নেতাকে জনগন সংবর্ধনা দেবে, নির্বাচনে জিতছে, আসন পাইছে তাই।
কার কার হাত পা ভাঙবে কে জানে!

এগুলি করতে গিয়ে যদি আসিফের কোন ক্ষতি হয়!

এগুলা ভাবার অবকাশ নাই, নেতা বলছে, করতেই হবে।
আসিফ একা একা ভাবে।
নেতা ষাট হাজার টাকা দিলেন।

চকলেট বোম জোগাড় করতে হবে।
বিকেলে একজনের আসার কথা আছে, সে নিয়া আসবে নাকি।

মাঠ টা দেখে প্লান করতে হবে, কোন জায়গায় বোমাটা ফাঁটবে।

আসিফ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো।
চিন্তার সুতা কাটলো, নেতার ডাকে।
বললো, বাড়িত যা বাপ।
কেমনে কি করবি, আমারে জানাইস আগের দিন রাইতে।

আসিফ বাসায় চলে এলো!
এসেই বোনকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হলো।
তার ডেলিভারির সময় হয়ে এসেছে।

তাও ভালো স্বামীটা আছে এখন।
টাকা দিলেই হবে।
বাকিটা ও সামলে নিতে পারবে।

আসিফের কোন এক ফাঁকে নিশার কথা মনে হলো!
কি জীবন আসিফের!!
এখানে বাসন্তী হাওয়ার মতো নিশা এলেও থাকতে পারবে না!
সব কিছু ফেলে ওকে নিয়ে অন্য কোন দেশে চলে যাওয়া যেতো!
সারাদিন সুয়া পাখির মতো বকবক করে আসিফের চারপাশটা ভরে রাখতো!

আহারে!!

##

আজ বড় সমাবেশ কলেজ মাঠে।
আসিফ নেতার কথা মতো তৈরি তার ছেলেপেলে নিয়ে, তবে ঘটনাটা একটু অন্য ভাবে সাজাবে আসিফ।
সভার ডেকোরেশন এর সময় মাঝখানের বাঁশের চারপাশটা একটু ফাঁকা রেখেছে।ওখানে ঘুরিয়ে চারটা চেয়ার দিয়ে রেখেছে, মানুষকে এদিকে আসতে দেবে না।
চকলেটটা ওইখানে ফাটলে কিছু মানুষ কম আহত হবে।
এই চকলেটে ধোঁয়া হবে বেশি।
ভেতর থেকে মানুষ হুড়মুড় করে বের হতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।

জেলার সব উপজেলা ইউনিয়ন থেকে মানুষ এসেছে বাস ভরে ভরে।
লঞ্চ, ট্রলার বোঝাই মানুষ
এদের জন্য পাঁচটা গরু জবাই করে খিচুরি পাকানো হয়েছে।
অন্য ধর্মের মানুষদের জন্য আটটা খাসীও রাখা হয়েছে।
এসব অন্য কমিটির লোকজন দেখছে।

পুলিশও এসেছে অনেক, আসার কথা আসিফও জানে, কিন্তু আসিফের মনে হচ্ছে প্ল্যানে কিছুটা ফাঁকা আছে। যেটা তার জানা নাই।

শেষ মুহুর্তে আসিফ ঠিক করলো, নেতা যাই বলুক, চকলেটগুলো রাস্তায় ফাঁটবে।
কেউ খেয়াল করবে না। সবার নজর মঞ্চে থাকবে।
দলে দলে লোক ঢুকছে।
নেতাও মঞ্চে উঠবে একটু পরে।
স্টেজে আসিফ দাঁড়ায়নি আজ।

তার খুব টেনশন হচ্ছে, মনে হচ্ছে অশুভ কিছু ঘটবে আজ।
এমন কখনো হয় না।
তার বোনের ছেলে হয়েছে।
তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছে, বাসা ভরা মেহমান।
আসিফ মায়ের কাছে টাকা দিয়ে এসে পড়েছে এখানে।
ওদিক সামলাবে মা।

আসিফ কালুকে ডাকলো, কার কার কাছে চকলেট, পজিশন কোথায়, কোথায় দৌড়ে পালাবে সব বলে দিলো। আরেক বার।

সভার ভেতরে ঢোকার গেটে আসিফ দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ দেখলো রাস্তায় নিশা দাঁড়িয়ে আছে।কলেজ মাঠ, তারপর রাস্তা রাস্তার ওপারে।
বেশ কিছুটা দূরে।
এখান থেকে দেখা যায় না কিন্তু আসিফ নিশাকে বুঝতে পারে।

আসিফ একটা ছেলেকে পাঠালো, বললো, নিশাকে যেন বলে, নিশা বাসায় চলে যাক।
আসিফ ভাইয়া চলে যেতে বলেছে।

একটু পরে সেই ছেলেটা এসে জানালো, নিশা বলেছে, সে যাবে না।
মিটিং দেখবে।
আসিফকে ডাকছে!

ধূর, মেয়েটা কথা শুনতে চায় না সহজে।
হাবিব নামের ছেলেটার পজিশন নিশার আসেপাশে হওয়ার কথা।
এখন কি হবে, ভেতরে কে আছে, আসিফের মাথা থেকে বের হয়ে গেলো।
ঠিক দুই মিনিটের মধ্যে সবাই চকলেট ফাটাবে।

কিন্তু নেতারা শুধু এক আসিফের উপর ভরসা করে থাকে না, আসিফের প্ল্যান নেতার কাছে পৌছে দিয়েছে কেউ।
তাই নেতার প্ল্যানও বদলে গিয়েছে!

আসিফ ভাবলো, দৌড়ে গিয়ে নিশাকে বলবে, চলে যাও এখান থেকে।

ইশ মিনিট খানেক বাকি আছে।
দৌড়ে গেলে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।
আসিফ দ্রুত হেঁটে যেতে লাগলো।
শেষ রক্ষা হলো না।
আসিফ আর নিশার মাঝখানেই চকলেটটা ফাটালো কে একজন।
ধোঁয়ায় চারপাশ ভরে গেলো!
কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।
ওই পাশের রাস্তায়ও দুই তিনটা শব্দ হলো, সভার মাঝখান থেকেও শব্দ হলো!

কিছু বোঝার আগেই নিশা দেখলো চারপাশ ধোঁয়া আর ধোঁয়া।
আসিফের কিচ্ছু খেয়াল নেই, এই ধোঁয়ার মধ্যে নিশা কই, সামনে যেতেই হবে, নিশার কাছে!

কয়েকটা আওয়াজ হওয়ার পরে চারপাশে ধোঁয়ায় ভরে গেলো।
মিটিং থেকে লোকজন সব দৌড়ে বের হচ্ছে।
আসিফ নিচে বসে পড়লো, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।
তারপর উঠে হাতরে সামনে চলে গেলো।
এই তো নিশা, কানে হাত দিয়ে বসে আছে, আসিফ নিশার হাত ধরে টেনে তুললো, বললো, নিশা আসো আমার সাথে!

ঘটনার আকস্মিকতায় নিশা হতভম্ব।
ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেছে, বুঝতেই পারছে না কি করবে।
আজ কোন টিউশন বা কোচিং ছিল না।
শুধু মিটিংএ আসিফ থাকবে, আসিফকে দেখতে বাসায় মিথ্যে বলে বের হয়েছে।

মা একশবার নিষেধ করেছে। নিশা বলেছে, তার দুইটা নোট লাগবেই আজকে, না হলে হবে না।
নিজের মিথ্যে বলার ক্ষমতায় নিজেই আশ্চর্য হয়েছে।
অথচ নিশা তো এমন ছিলো না। গত দুদিন আসিফকে দেখেনি। মিটিং এর জন্য সাজসজ্জা চলেছে।
রাজনৈতিক মিটিংএ আসিফ আসবে, এই ভরসায় নিশা চলে এসেছে।

একটু আগে একটা ছেলে এসে নিশাকে চলে যেতে বলেছে, কিন্তু আসিফ আসেনি। নিশা আসিফকে না দেখে যাবে না। তাই দাঁড়িয়ে ছিলো।

এরকম ঝামেলা হবে বুঝতে পারেনি।ধারনায়ও ছিল না এমন ঝামেলা হতে পারে। ও কান চেপে বসে পড়েছিলো।

একটু পরে কেউ একজন হাত ধরে টেনে তুললো, বললো, নিশা আমার সাথে আসো! নিশার সম্বিত ফিরলো, এই তো আসিফ!

আসিফের হাত ধরে দৌড়ে যেতে লাগলো, কত মানুষ, কোন খেয়াল নেই, কোথায় যাচ্ছে!

ভীড় পেরিয়ে নিশার বাসার গলিতে এসে থামলো আসিফ।
নাহ, শুধু ধূলো লেগেছে হাতে পায়ে। আর কোন সমস্যা হয়নি!

আসিফ বললো, নিশা বাসায় চলে যাও। নিশা বললো, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

আসিফ বললো, কলেজ মাঠে, ওইখানে ঝামেলা হইছে, আমার যাওয়া লাগবে।

নিশা আসিফের হাত ধরে ফেললো।
“না না, ওখানে বোমা ফাটছে, আমি আপনাকে যেতে দিবো না!”

আরে বলে কি মেয়েটা, আসিফের বা হাতটা দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছে।

এই হাত ছাড়িয়ে আসিফ কিভাবে যায়!
কিন্তু যেতেই হবে, ছেলেপেলে সব মাঠে, কারও কিছু হলো কিনা কে জানে!

আসিফ ডান হাত দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু নিশা শক্ত করে ধরে রেখেছে।
আসিফ আলতো ভাবে হাত ছাড়িয়ে নিতে পারছে না।
–নিশা হাত ছাড়ো, আমাকে যেতেই হবে।

নিশা বললো, না আমি আপনাকে যেতে দিবো না। নিশা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো। আসিফ নিশার চোখ মুছে দিয়ে বললো, আমি চলে আসবো, ভয় নাই তোমার। বাসায় যাও। আসিফের কেন অদ্ভুত লাগছে। নিশা ওর হাত ধরে আছে, ওকে যেতে দিবে না! এটা কি স্বপ্ন না সত্যি! বাস্তবে ফিরলো আসিফ। জোর করে হাত ছাড়িয়ে বললো, তুমি চলে যাও বাসায়। আমি কাজ শেষ করে তোমাকে ফোন করবো

আসিফ চলে গেলো, নিশার অদ্ভুত কষ্ট হতে লাগলো!
যদি আসিফের কোন বিপদ হয়!
কিন্তু কি করবে, অগত্যা বাসায় চলে গেলো।

বাসায় ঢুকতেই নিশার বড়পা জিজ্ঞেস করল, তুই কই ছিলি, বাজারে নাকি ঝামেলা হইছে!
নিশা বললো, সে জানে না কি হয়েছে।
লোকজন দেখে চলে আসছে, অনেক ভীড়, নোট আনতে যেতে পারেনি। বলেই নিজের ঘরে ঢুকে গেলো।
আবার আসিফ ফোন করবে বলেছে,
টেলিফোন সেট বসার ঘরে। একটু পর পর বসার ঘরের আশেপাশে ঘুরতে লাগলো। দুপুরে তেমন ভালো করে খেতেও পারলো না।
আসিফ কোথায় আছে, ফোন তো করলো না, বিকেল পেরিয়ে গেলো।

 

রোদের চিঠি [পর্ব -১১]

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 1 comments