রোদের চিঠি

 

(৮)

আজ সকাল থেকে আবহাওয়া ভালো না। সকালে নিশা স্কুলে গেলো না। বিকেলে মডেল টেস্ট দিতে যাবে শাপলা কোচিং-এ। আসিফ নয়টার দিকে এসেও নিশাকে দেখতে পায়নি।
এত আবহাওয়া খারাপ, বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া। নিশার আপু বললো, আজ এই আবহাওয়ার কিন্তু কেউ আসবে না রে নিশা। তোর যেতে হবে না।

নিশার যেতেই হবে। সেদিনের পর থেকে নিশা দেখেছে, ওর যেদিন যেদিন দেরী হয়, আসিফ বাইক নিয়ে আসে পাশেই থাকে। নিশার সামনে আসে না, কিন্তু নিশা আসিফকে খুঁজে পায়ই। এই একটুখানি না দেখলে, নিশারও ভালো লাগে না। আজও আসবে, এই বৃষ্টিতে এসে নিশাকে না দেখতে পেলে কেমন হবে!

-আপুনি, আজ সায়েন্স টেস্ট, যেতেই হবে, সবাইই আসবে। বড় ছাতা নিয়ে চলে যাই। সমস্যা নাই।
ঘন্টাখানেকই তো!

নিশার সিরিয়াসনেস দেখে ওকে আপু আর কিছু বললো না। নিশা ছাতা নিয়ে বের হলো, আবহাওয়া আসলেই অনেক খারাপ। রাস্তায় কেউ নেই। পার্টি অফিস তালা বন্ধ। আসিফ মনে হয় আজকে আসবে না। নিশার ভীষণ মন খারাপ হলো। মন খারাপ আরো দ্বিগুন হয়ে গেলো যখন দেখলো কোচিং এ কেউ আসেনি। ও এতো কষ্ট করে সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষা দিতে আসলো।
পরীক্ষা ক্যানসেল। আসিফও এলো না। নিশার কান্না পাচ্ছে। ও চারপাশে তাকিয়ে অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ। অন্ধকার হয়ে আসছে, বৃষ্টিও কমছে না। অগত্যা ও বের হয়ে পড়লো। মন খারাপ লাগছিলো বলে, ইচ্ছে করেই বৃষ্টির পানি হাতে পায়ে লাগাতে লাগাতে হাঁটতে লাগলো।

আসিফ বাসায়ই ছিলো, পার্টি অফিসে আসেনি আজ।নিশার কোচিং শেষ হবে পাঁচটায়, তখন গেলেই হবে। হঠাৎ মনে হলো, একটু আগেই যাওয়া যাক না, পার্টি অফিসে বসা যাবে, পোণে পাঁচটার দিকে নিশার কোচিং এর সামনে আসলেই হবে, সেদিনের পর থেকে আসিফ নিশাকে চোখে চোখে রাখে, সামনে না গেলেও পেছন থেকে খেয়াল করে।

প্রচন্ড বৃষ্টি, আসিফের রেইনকোট নেই, ভিজে যাবে। একটা শার্ট পলিথিনে ভরে বাইকের টুলবক্সে রেখে দিলো।
তারপর বের হলো, শাপলা কোচিং এর সামনে এসে দেখলো, কোচিং তালা বন্ধ। তাহলে নিশা আসেনি আজ! আসিফ শুধু শুধুই ভিজলো! একটু মন খারাপ লাগতে শুরু করলো।
হঠাৎ চোখে পড়লো, নেভী ব্লু ছাতা নিয়ে একটা মেয়ে বৃষ্টির পানি হাতে ধরতে ধরতে হেঁটে যাচ্ছে। এটা সিওর নিশা। আসিফ বাইক টান দিয়ে নিশার সামনে গিয়ে থামালো!

-বৃষ্টিতে ভিজছো কেন তুমি, তোমার দুদিন পরে পরীক্ষা না!

নিশার মনটা ভালো হয়ে গেলো, কিন্তু আসিফ একদম ভিজে গেছে, চুল দিয়ে পানি পড়ছে।

-আপনিও তো একদম ভিজে গেছেন!

আসিফ এই কথার উত্তর দিলো না। আশেপাশে দেখলো একটা মানুষ তো দূরের কথা, পশুপাখিও রাস্তায় নেই।
-বৃষ্টিতে ভিজো না নিশা, কেউ নেইতো রাস্তায়, আসো তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি!

নিশা মনে মনে বললো, কেউ থাকলেও সমস্যা নেই, আমি তো আপনাকে দেখার জন্যই বের হইছি! এইটা হলো মনের টান! কিন্তু মুখে কিছু না বলে আসিফের পেছনে বসলো।

-নিশা ছাতা ধরতে পারবে না তুমি, বন্ধ করে দাও, শক্ত হয়ে বসো।

বাতাসে ছাতা এমনিতেও সামলে রাখা যাচ্ছিলো না। আসিফ স্টার্ট দিলো বাইকে। নিশা একটা সাহসের কাজ করে ফেললো, আসিফকে পেছন থেকে ধরে বসলো। আসিফ নিশার স্পর্শে হালকা কেঁপে উঠলো কিন্তু এটা সে পাত্তা দিলো না একদম। এ টানে নিশাকে ওর বাসার সামনের গলিতে নামিয়ে দিলো!

নিশার মনে অদ্ভুত শান্তি লাগছে। ও শুধু বললো, আপনাকে ধন্যবাদ, আর শোনেন, এখন আপনি বাসায় চলে যাবেন, মাথা মুছবেন, ড্রেস চেইঞ্জ করে ঘুম দিবেন। এই বৃষ্টিতে বাইরে থাকতে হবে না। বলেই গটগট করে হেঁটে বাসার দিকে চলে গেলো।
আসিফ মিনিট খানেক তাকিয়ে থাকলো, নিশা, একটা ছোট্ট মিষ্টি আদরমাখা নাম!

 

(৯)

নিশার মনে তোলপাড় শুরু হলো, এতদিন একরকম ছিল, এখন অন্যরকম। সারাদিন আসিফের চিন্তায় মাথাটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
স্কুলে যাবার সময় বা টিউশন থেকে ফেরার পথ, মনটা আসিফকে খোঁজে। ক্লাশের ফাঁকে মন কখন পালিয়ে যায়, নিজেই টের পায় না। অন্যমনস্ক বলে সেদিন দোলা মিস বকাও দিলেন, খেয়াল করছিলো না নিশা।
মিতু জিজ্ঞেস করলো, তোর সমস্যা কি রে?

–সমস্যা তো অনেক রে মিতু, প্রাণের বন্ধু মিতুকে একে একে সব কটা ঘটনা খুলে বললো নিশা।

মিতু অবাক হয়ে বললো, আসিফ মানে পলিটিক্যাল আসিফ, ওই যে নীল রঙের বাইক নিয়ে ঘোরে, কি সর্বনাশ! ভুলে যা রে, ছেলেটা ভাল না!

নিশা বললো, ক্যান, তোর কি করছে খারাপ বল তো?
মিতু কিছু খুঁজে পেল না, তবুও ভালো না এটাই বলে গেলো!
নিশা সুন্দর যুক্তি দিলো, রাজনীতি করতে গেলে এমন থাকতে হয়, নাইলে কেউ ভয় টয় পায় না!

আসিফ এসেছিল আজগর সাহেবের বাড়িতে।
সে বয়স্ক নেতা, একটা ঝামেলা হয়েছে তার জায়গা নিয়ে, আসিফকে ডেকেছিলো, ছেলেপেলে লাগবে কিছু, আলাপ আলোচনা করতে। কি করা যায়, নিজের জায়গা দখল নিতে হবে!

আসিফ বের হলো কথা শেষ করে। আজগর সাহেবের বাড়িটা নিশার স্কুলের পাশে।স্কুলের পরে রামকৃষ্ণ মিশন, তারপরই আজগর সাহেবের বাড়ি।

নিশার স্কুল ছুটি হয়েছে, রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে আসিফকে দেখলো নিশা, আসিফ দেখেনি ওকে।
নিজে বাইকে উঠতে যাচ্ছিল।
নিশা মিতুকে নিয়ে এগিয়ে গেলো, এই যে, ভালো আছেন?
আসিফ তাকিয়ে দেখলো নিশা। ও একটু হেসে বললো, হ্যা, তুমি ভালো আছো?
হুম, এখানে কোথায় এসেছেন?
এই আজগর ভাইয়ের বাড়িতে কাজ ছিলো!
আচ্ছা!
মিতু বললো, নিশা আমি চলে যাই!
–আচ্ছা যা তাহলে, নিশা উত্তর দিলো।
আসিফ ভাবলো, আরে, মেয়েটা কি কথা বলবে নাকি আরো, মিতুকে পাঠিয়ে দিলো! আসিফ নিশাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কোচিং নাই?
–নাহ, টেস্ট পরীক্ষা সামনে তো, তাই কোচিং অফ!
ওহ আচ্ছা, ঠিক আছে, বাসায় যাও তাইলে।
–কেন আপনি ব্যস্ত?
–না আমি ব্যস্ত না। তুমি বাসায় যাবা না??
–যাবো তো, এই তো তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বের হলাম, তাড়া নাই।

মেয়েটা আসলে কি চায়, আসিফ বুঝতে পারছে না।
ওর সাথে দাঁড়িয়ে কথা বললে ওরই সমস্যা, আসিফের কিচ্ছু হবে না।

—আচ্ছা তাড়া না থাকলেও বাসায় চলে যাও, পথে ঘাটে সময় নষ্ট করা ঠিক না!

নিশা চুপ করে থাকলো।
—কি কিছু বলবা?
–না মানে ওই দিন বললেন না, ওই রাস্তায় একা যাওয়া ঠিক না, আপনি যাবেন?

মেয়েটা বলে কি! নিশা ওর সাথে ওইদিকে যেতে বলছে!
যেতে ইচ্ছে করলেও সব ইচ্ছেকে এত গুরুত্ব দিতে নেই, নিশা হয়তো স্বাভাবিকভাবে বলেছে, মানুষ দেখলে কি ভাববে?

আসিফ বললো, অন্য কখনো যাবো, আজকে বাসায় যাও।নিশার খুব রাগ হলো, গাল ফুলিয়ে ফেললো। আসিফকে বললো, আচ্ছা থাক, আপনার যেতে হবে না। আমি গেলাম।

আসিফ নিশার গাল ফুলানো দেখে হেসে ফেললো।
বললো, আচ্ছা চলো যাই।
দুপুর বেলা, পথে তেমন লোকজন নেই।
আসিফ বললো, তুমি রিক্সা নিয়ে মোড়ে গিয়ে দাঁড়াও, আমি পার্টি অফিসের সামনে বাইকটা রেখে আসছি।

নিশা মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো!

নিশা দাঁড়িয়ে ছিলো মোড় ছাড়িয়ে আর একটু সামনে।
আসিফ দ্রুত হেঁটে এলো, বললো, অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখছি!

নিশা হেসে ঘাড় নাড়লো, বললো এই রাস্তাটা আমার খুব ভাল্লাগে কিন্তু কেউ এদিকে আসতে চায় না।

আসিফ বললো, আমার সাথে তোমাকে কথা বলতে দেখে ফেললে, তোমার সমস্যা হবে না বাসায়?

নিশা হাঁটতে হাঁটতে বললো, হলে হবে! আর কথা বললেই বা কি বলেন! আপনার সাথে তো আর আমার কোন সম্পর্ক নাই, তাই না!

আসিফ হাসলো।

নিশা জিজ্ঞেস করলো, আপনি সিগারেট খান?
আসিফ মাথা নেড়ে জানালো, হু!
আর অন্য কিছু, মানে মদ, গাঁজা এগুলি?
আসিফ বললো, খাই মাঝে মাঝে, দরকার পড়লে!

—-এগুলি খাওয়া দরকার পড়ে বুঝি?
—-লাগে মাঝে মাঝে, মিটিং সিটিং থাকলে!
—এগুলি তো খারাপ তাও খান??
—বাহ, তুমি তো জানো আমি খারাপ ছেলে, আমাকে সবাই ভয় পায়, তাও আমার সাথে কথা বলছো কেন?
—দুটো বিষয় বুঝি এক হলো?

আসিফ কথা বললো না। আরো কিছুটা দূরে এগিয়ে বললো, আর যেতে হবে না। তোমার বাসায় যেতে দেরী হয়ে যাবে। চলো ফিরে যাই!

নিশা পেছন ফিরে বললো, আপনি কি রাগ করেছেন, আপনাকে “ব্যাড বয়” বলেছি তাই?

আসিফ বললো, নাহ ঠিকই বলেছো, সবাই মনে করে তাই, তুমি বলে দিয়েছো! চলো যাই।

মোড় পেরিয়ে আসিফ রিক্সা করে দিলো নিশাকে।
নিশা বাসায় চলে গেলো।

আসিফের টেনশন হচ্ছে, এই ছোট্ট শহরে, সবাই সবাইকে চেনে। কেউ দেখে নিশার বাসায় বলে দিলে, নিশাকে বকাবকি করবে, হয়ত একা বের হতেও দেবে না।
কারন আসিফকে কেউ ভালো ছেলে বলবে না।

আসিফ হেঁটে পার্টি অফিসে চলে গেলো।

নিশার সে রাতে অনেক জ্বর এলো। এতো জ্বর, পরদিন স্কুলে যেতে পারলো না। তার পরের দিনও যেতে পারলো না।

আসিফ বিষয়টা খেয়াল করলো, নিশা দুদিন কোথাও বের হয়নি, মিতুকে একা দেখেছে আসিফ। তৃতীয় দিন আসিফ নিশার বন্ধু মিতুকে জিজ্ঞেস করলো, মিতু নিশা কই?
-নিশার তো জ্বর ভাইয়া, দুদিন আসেনি!

আসিফের একটু অস্থির লাগতে লাগলো, নিশার জ্বর হয়েছে, কোনভাবেই সে নিশাকে দেখতে যেতে পারবে না।
আসিফ ভেবে ঠিক করলো, সে নিশার বাসায় যাবে, যেকোন একটা অযুহাতে।

 

রোদের চিঠি- পর্ব ১০

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments