রোদের চিঠি

 

(৭)

নিশা, এই নিশা, আমার সাথে একটু চল না- আপু ডাকছে নিশাকে।
নিশা অঙ্ক করছিলো। আজ স্কুলে যাওয়া হয়নি৷
বিকেলে পরীক্ষা আছে স্যারের বাসায়।
-কোথায় আপু, আমার পরীক্ষা আছে, আমি এখন যাবো না।
-চল না রে, কাল একটা কানের দুল কিনেছিলাম, কসমেটিকস জোন থেকে, সেটা দেখি ভাঙা। আজকে নিয়ে না গেলে পাল্টে দিতে চাইবে না। কথা বলতে বলতে যাবো আবার চলে আসবো। চল, তোকে বল আইসক্রিম কিনে দিবো!

বল আইসক্রিম মানে বলের ভেতর আইসক্রিম, বলটা কি সুন্দর সাদা, কিন্তু দাম পনেরো টাকা। রোজ রোজ কেনা যায় না। নিশা উঠে রেডি হলো।

কসমেটিকস জোনটা মান্নান মার্কেটের ভেতরে। কয়েকটা দোকান পাশাপাশি। নিশা আর পর বড়আপু নামলো রিক্সা থেকে। মার্কেটে ঢোকার সময় নিশা দেখলো আসিফের বাইকটা সামনে। তার মানে আশেপাশেই আছে, নিশা এদিক ওদিক তাকলো। কিন্তু আসিফকে দেখলো না।
মনে মনে চাইলো, ইশ একটু সামনে আসতো, কিন্তু কোথাও নেই আশেপাশে। ওরা মার্কেটের ভেতরে গেলো।
আপু কথা বলছিলো, নিশা বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলো।

আসিফকে আজগর ভাই ডেকেছিলেন এখানে। আসিফ আর কালু এসে দেখা করে এসেছে। আরো দুজন আসবে। আসিফ মার্কেটের সামনে এসে দাঁড়ালো।
প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে, সূর্য মাথার উপরে একদম। আসিফ প্রচন্ড ঘামছে, ও কালুকে বললো একটা সিগারেট এনে দিতে।

মার্কেটের ভেতরে নিশাকে দেখেনি আসিফ, নিশার দুচোখ খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলো, ইশ, কি সুন্দর লাগছে দেখতে, কি হ্যান্ডসাম, একদম হিন্দি সিনেমার হিরোদের মতো! চেক শার্ট, কলারের কাছে দুটো বোতাম খোলা, ফুল হাতা কনুই অবধি গোটানো। সানগ্লাসটা কালো, এটাও সুন্দর।
ভাগ্যিস আপুর সাথে এসেছিলো, নয়তো আসিফকে দেখতে পেতো না। আপু আইসক্রিম কিনে না দিলেও তাকে মাফ করা যাবে, নিশা কিছু বলবে না।

আসিফ সিগারেটটা ধরালো মাত্র, নিশা তখন বের হয়ে আসছে আপুর সাথে। আপু রিকশা ডাকতে নামলো, নিশা আসিফের দিকে তাকলো। নিশার সাথে আজ সকালে দেখা হয়নি, এখানে নিশাকে হঠাৎ দেখে আসিফ সিগারেট ফেলে দিলো। চোখ নামিয়ে নিলো নিচের দিকে, নিশা বার বার তাকাচ্ছিলো, কথা বলতে চায় নাকি? সাথে তো বড় আপু আছে! কিন্তু নিশা কথা বললো না। রিক্সায় উঠে চলে গেলো।

কালু এসে বললো, আসিব্বাই, শলাডা দেন একটা টান দিই!
আসিফ বললো, ফেলে দিছি, যা আরেকটা নিয়া আয়!
কালু ভীষণ অবাক হয়ে গেলো, নিচে তাকিয়ে দেখলো আসিফ একটা টানও দেয়নি মনে হয়, শলা জ্বালিয়ে ফেলে দিয়েছে!

তবে বিকেলে একটা ঘটনায় আসিফ অবাক হয়ে গেলো!
নিশা ম্যাথ কোচিং থেকে ফিরছিলো!
আসিফ একদম সামনে পড়ে গেলো!
নিশা একটু হাসলো, তারপর বললো, আপনার একটা ছবি এঁকেছি!

আসিফ বললো, মানে? আমার ছবি?তুমি ছবি আঁকতে পারো?

নিশা সেদিনকার আঁকা ছবিটা দিলো আসিফকে!
আসিফ ছবিটা দেখে হো হো করে হেসে উঠলো!
নিশা অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেলো!
ছবিটা পড়ে রইলো আসিফের হাতে, নিশার আঁকা, The Bad boy!!

 

নিশার আঁকা ছবিটা হাতে নিয়ে আসিফ যতোটা খুশি হলো, এতো খুশি ও খুব কাছাকাছি কবে হয়েছে, মনে পড়ছে না।
“ব্যাড বয়” লেখাটা একটু খারাপ লাগছে, তাও কোথায় যেন একটু আদরমাখা কথাটা, আসিফ তো ব্যাড বয়ই!
নিশা তুমি কাছে এসে ব্যাড বয়কে একটু ঠিকঠাক করে দাও না! আসিফ মনে মনে ঠিক করলো, এই গুন্ডা গুন্ডা চেহারাটা একটু সামলে নেবে।

রাতে বাসায় নিজের রুমে বসে ড্রেসিং টেবিলের দাগ পড়া আয়নায় নিজেকে দেখলো। কোনভাবেই ভালো লাগছে না, ভদ্রলোক ভাব আনা সম্ভব না। হ্যাঙ্গারে ঝোলানো নিজের ময়লা হয়ে যাওয়া শার্টটা দেখলো আসিফ। আচ্ছা সেলুন থেকে কি কানের পাশের কলি একটু কমাবে? নাহ, তাহলে তো খুব অদ্ভুত দেখাবে, লাগবে না।

–আম্মাআআ, বলে দুবার ডাকলো আসিফ।
মা আসতেই জিজ্ঞেস করলো, আমার সাদা একটা শার্ট আছে না, ওইটা কই?
–আলমারির নিচে মনে হয়!
আসিফ আলমারি খুলে দুই তিনটা শার্ট পেয়ে গেলো, বছর তিনেক আগের।
সাদা শার্টটায় পকেটের কাছে একটা হলুদ ধরনের দাগ, কাল একটা শার্ট কিনতে হবে। কতদিন নিজের জন্য কিচ্ছু কেনা হয় না। এই শার্ট গুলোই আসিফ লন্ড্রিতে দিয়ে এলো। সাথে বলে দিলো, এগুলো কাল আসিফের লাগবেই।

তারপর নিজের চেইন আর কালো ব্যান্ডটা খুলে রাখলো!
পরদিন সাদা শার্ট টা পরলো আসিফ, আয়নায় নিজেকে বোকা বোকা লাগতেছে। তারপর আবার চেইন ব্যান্ড পরে নিলো।

পরের দিন পার্টি অফিসে একটু আগেই পৌছে গেল, এখনো বিশ মিনিট, তারপর নিশা আসবে। নিশা এলো নয়টা পঁচিশে। আসিফ সোয়া নয়টা থেকেই জানালায় দাঁড়িয়ে আছে।

নিশা ওর দিকে তাকালো না প্রথমে।তারপর একবার তাকালো, আসিফের চোখে চোখ পরতেই আসিফ একটু হাসার চেষ্টা করলো। নিশা দেখলো, আজকে কেমন জানি দেখাচ্ছে, রোজকার মতো নয়। আসিফ বাইরে চলে এলো, নিশা খেয়াল করলো সাদা শার্টের পকেটের কাছে হলুদ দাগ পরেছে, ইশ কেউ খেয়াল করে না নাকি, নিশা একটু তাকিয়ে চলে গেলো।
কালকে সে একটা গাধার মতো কাজ করেছে।
ছোট গাধা নয়, বড় গাধা।কি দরকার ছিল আসিফকে ছবিটা দেওয়া!

নিশা আজ কথা বললো না। আসিফের খুব ইচ্ছে করছিলো একটু কথা বলে। পরপর কয়েকদিন কেটে গেলো, নিশার সাথে তেমন কথা হয়নি।
আসিফের নেতার সাথে কয়েকটা জায়গায় মিটিংএ যেতে হলো। তাই নিশা রোজ পার্টি অফিসে তাকিয়েও আসিফকে দেখেনি।

নিশার ম্যাথ কোচিং থেকে ফিরছিলো একদিন।
গত সপ্তাহ খানেক ধরে দুইটা ছেলে নিশার পিছু পিছু হাঁটছে। ওই ছেলেগুলোকে নিশা চেনে, শিক্ষাসপ্তাহের প্রোগ্রাম থেকে ওর পেছনে লেগেছে! বিরক্ত করার চেষ্টা করছে। বাসায় বললে আব্বু বেশি চিন্তা করবে, একা আর স্কুলে যেতে দিবে না। একা না গেলে আসিফকে দেখবে কিভাবে!

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, পার্টি অফিসে লাইট জ্বলছে, সামনে আসিফের বাইকটা রাখা। নিশা কয়েকদিন আসিফকে দেখেনি! নিশা ভেতরে তাকিয়ে আসিফকে দেখতে পেলো না। আসিফ ভেতর থেকে দেখলো নিশার পেছনে দুটো ছোকরা হেঁটে গেল, কারা এই দুইটা, এলাকার পোলাপান তো না!

নিশা দ্রুত পা চালাচ্ছে। একটু অস্বস্তি লাগছে। ছেলে দুটো আজ জোরে হেঁটে নিশার পথ আগলে দাঁড়ালো।

কিছু বলার আগেই আসিফের বাইকটা এসে থামলো পাশে। বেশ কয়েকদিন পরে আসিফকে দেখলো নিশা।

–কি সমস্যা? কি চাই?
ছেলে দুটোকে জিজ্ঞেস করলো আসিফ।
একটা ঠিঙঠিঙে, আর একটা মোটা।
মোটা ছেলেটা বললো, তাতে আপনের কি! আপনে কেডা?

আসিফের মাথায় রক্ত উঠে গেলো, একটাকে ধরে কানের উপর চড় লাগালো দুই তিনটা, আর একটা দৌড়ে পালিয়ে গেলো। যেটাকে ধরতে পেরেছে, আসিফ বললো, আগে খোঁজ নিবি, এলাকার বাপ আছে কেডা, তারপরে আসবি মস্তানি করতে, এরপর এই টাউনে দেখলে পা ভাইঙ্গা ঝুলায়ে রাখবো।

ঘটনার আকস্মিকতায় নিশা একটু হতভম্ব। এই জায়গাটা নির্জন।আজ একটু বেশি দেরী হয়ে গেছে, প্রি-টেস্ট এর খাতা দেখিয়েছে স্যার। নিশা ভয়ও পেয়েছে প্রচন্ড।

আসিফ অন্ধকারে দেখতে পেলো না।
নিশাকে বললো, বাসায় যাও নিশা, আমি আছি, ভয় নাই।
নিশা নিজেকে সামলে বললো, ওরা যদি আপনাকে কিছু করে?

আসিফ হেসে বললো, এই এলাকায় আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না, আর এইগুলা তো পুটিমাছ!

নিশা বাড়ির হাঁটতে লাগলো। আসিফ পেছন পেছন গেলো কতোটা দূরে!
নিশা জিজ্ঞেস করলো , আপনি কি কোথাও গিয়েছিলেন? কয়েকদিন দেখলাম না?

আসিফ খুব অবাক হলো, নিশা খেয়াল করেছে আসিফ ছিল না।ও উত্তরে বললো , হুম, পার্টি মিটিং ছিল, আশপাশের ইউনিয়নে যাওয়া লাগছে নেতার সাথে।
তারপর একটু থেমে বললো, ওরা কবে থেকে তোমার পেছনে লাগছে বলোতো? তুমি আগে দেখছো?

নিশা বললো, হুম শিক্ষা সপ্তাহের প্রোগ্রাম ছিলো, আমাদের স্কুল ভেন্যু ছিলো, ওই ছেলেগুলো গাবখালী পাইলট স্কুলের। ওর অডিটোরিয়ামের গেট আগলে দাঁড়িয়ে ছিলো, আমি ঢুকতে গিয়ে ধাক্কা লেগেছিলো ওই মোটকুর সাথে। তারপর সরি বলে চলে গেলাম। পরদিন থেকে আমার পিছন পিছন আসছে!

-শিক্ষা সপ্তাহ তো গত মাসে গেলো, এতোদিন সহঢ় করছো, বাসা স্যারকে বলো নাই?

-না বলিনি, বললে বাবা টেনশন করবে, কোচিং-এ আসতে দিবে না আর। একা একা বের হতেও দিবে না। আমার একা একা বের হতে হবে।

-শোনো নিশা, সন্ধ্যা হলে একা বের হবে না। আজকে আমি পার্টি অফিস থেকে না দেখলে কি হতো বলোতো!

নিশা মনে মনে বললো, আপনি সবসময় আমার সাথে সাথে থাকলেই পারেন। স্কুল আর কোচিং থেকে ফেরার সময়টা। কিন্তু মুখে আর কোন কথা বললো না। আসিফ দাঁড়িয়ে পড়লো।

নিশার বাসার গেট এখান থেকে দেখা যাবে, নিশা গেটে ঢোকা পর্যন্ত আসিফ দাঁড়িয়ে রইলো।
নিশা গেটে ঢোকার সময় দেখলো আসিফ অস্পষ্ট হয়ে গেছে অন্ধকারে, তবুও নিশা জানে, আসিফ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।

 

রোদের চিঠি- [পর্ব ৮ ও ৯]

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments