1

রোদের চিঠি

 

(৫)

ম্যাথ কোচিং শেষ করে নিশা সময় মতো বাসায় ফিরে এলো।
কিন্তু বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো, মনে হতে লাগলো, এখনি মা বা বড়আপা জিজ্ঞেস করবে, কি রে এত দেরী হলো কেন?
এটা মানুষের অদ্ভুত স্বভাব, কোন দোষ করলে, নিজের মনেই অশান্তি লাগে!
ধূর কি যে দরকার ছিল ওই রাস্তায় যাওয়া।
মা একবার ডাকলেন, নিশা…
নিশা ভয়ে মুখ চুন করে গেলো মায়ের কাছে, মা জিজ্ঞেস করলেন, মিতুর আম্মা স্কুলে এসেছিলেন কি না।
আজকে আসার কথা ছিল, মায়ের রেসিপির বইটা তার কাছে।
নিশা উত্তর দিয়ে রুমে ফিরে গেলো।
বই নিয়ে বসতেই আসিফের কথাটা মনে হলো, আজকে ওনার সাথে বাইকে উঠেছে, কি সর্বনাশ! যদি ধরে নিয়ে যেত। কামার পাড়ার একটা মেয়েকে গত সপ্তাহে ধরে নিয়ে গেল কারা জানি।
দুদিন পরে তাকে পাওয়া গেছে, হাসপাতালের সামনে।
ভয়ংকর অবস্থা।

নিশার একবার মনে হলো, আসিফ আসলে অতোটা খারাপ নয়, ঠিকই তো বলেছে, ওই রাস্তায় একা যাওয়ার কি ছিল। যে কোন বিপদ হতে পারতো! ইশ ছেলেটা ভালো হলে কি হতো?
গলায় একটা রূপালী চেইন পরে ঘোরে, হাতে কালো রাবার, সিনেমার গুন্ডা গুন্ডা চেহারা! একটু ভাল হলে কি হতো!

নিশা একটা ছবি এঁকে ফেললো, কার্টুনের মতো, হাতা গোটানো শার্ট, চোখে সানগ্লাস!
নিচে গোটা গোটা করে লিখলো, The bad boy!
এর মধ্যে আপু রুমে চলে এলো, নিশা কাগজটা লুকিয়ে ফেললো।

 

(৬)

 

আসিফ বাসায় ফিরেছে বিকেলে। ফিরে বোনকে দশ হাজার টাকা দিলো, সে বিদায় হলো।
বিদায় নেওয়ার সময় নাকের জলে চোখের জলে একাকার অবস্থা।
কারণ আসিফ বলেছে, বুবু প্রতিবার এমনে টাকা আনা তো সম্ভব না, দুলাভাইকে তুই বোঝাবি তা না, মায়ের উপর চাপ দিস। টাকা দুলাভাই চায়, নাকি তোর লাগে এইটাই বুঝি না!

বড় বোন মুখ ভার করে বললো, বিয়ে দেওয়ার পরে বাপের বাড়ি থিকা অনেক কিছু পাঠাইতে হয়, তোরা তো কিচ্ছু পাঠাস না। মাঝে মধ্যে বিপদে পড়লে আসি, আর আসবো না।

আসিফ বললো, তোরে কম দেওয়া হয় নাই, আব্বা সুস্থ থাকতে দিছে, আমিও চেষ্টা করতেছি দেওয়ার। তুই বোঝো না, উল্টা চাপ দাও আম্মারে।

তখন বড় আপা কাঁদতে শুরু করলো। কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিলো। আসিফের আম্মা বললো, এমনে বললি ক্যান, তোর আপা হয় না?

আসিফ বললো, আর কত আম্মা! কম তো দিলাম না!
এমনে এত টাকা কই পাই কও!

আসিফের আম্মা বললো, চা খাবি,বাপ? তুই তো বাসাত থাকোও না, কিচ্ছু খাও ও না!
আসিফ বললো, চা খামু না আম্মা। বাইরে যামু আবার।

কিন্তু তার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে চুপচাপ নিশার কথা ভাবতে। নিশাকে এত ভাল লাগে, আজ এত কাছে ছিল, তাও কিচ্ছু বলা হলো না। বলেও লাভ নাই, নিশা তাকে স্বাভাবিক ভাবে পছন্দ করবে না।
নিশার বাবা মা ও করবে না।

কিন্তু আসিফ তো এমন ছিল না। সেই ফার্স্ট ইয়ারে এক পুলিশ অফিসারের ছেলেকে চড় মেরেছিল, তখন সাহসী বলে ছাত্র নেতারা কাছে ডেকে নিলো, পড়াশোনা শিকেয় তুলে আসিফ রাজনীতিতে ঢুকে পড়লো।

আহারে, আসিফ ভালো ছেলে হতে পারতো!
ওই যে স্যারদের ছেলেরা, আয়রন করা শার্ট প্যান্ট পরে ক্লাশ করে, প্রাইভেট পড়ে। পড়াশোনা শেষ করে ভাল চাকরি করে।

আর আসিফের পোশাকই এখন গুন্ডা গুন্ডা।
পরীক্ষাটাও দিতে পারেনি, নেতার ইলেকশন ছিল।
আসিফকে ভয় পায়না এলাকায় এমন একজনও দোকানদার নাই। নেতার টোল আসিফই তার দলবল নিয়ে ওঠায়। এমন না হলে কেউ ভয় পাবে না! তাই পোশাকেও তার রংবাজ ভাব ধরে এমন থাকতে হয়।

নিশা কি মিষ্টি একটা মেয়ে, আসিফের কাছে কোনদিনও আসবে না হয়তো। তবুও আসিফের ভালো লাগে নিশাকে।
ওকে বার বার দেখে, দূর থেকেই দেখে। কালও যাবে, খুব সকাল সকাল , পার্টি অফিসে! নিশা স্কুলে যাবে, আসিফ দূর থেকে দেখবে।

ঠিক সময় মতো আজ আসিফ পার্টি অফিসে আসে।
নিশা হেঁটে আসছে, আসিফ দরজায় দাঁড়ায়।
নিশার দেখতে পেয়েছে, কাল এত উপকার করলো, আজ কি কথা বলবে, ইতস্তত করে নিশা, না থাক! কথা আর বলা হয় না। আবার সামনে পরলে কথা না বললে খারাপ দেখায়। নিশা শেষ পর্যন্ত নিচের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো, এমন ভাব করলো, যেন দেখতেই পায় নি।

আসিফ দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো, সে জানতো নিশা কথা বলবে না।বলবেই বা কেন! কথা বলার মতো কোন কিছু তো হয় নি!

 

রোদের চিঠি- পর্ব ৭

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 1 comments