1

রোদের চিঠি

(৩)

 

পার্টি অফিসের সামনে আসিফ এসে বাইক থামালো। পথে দেরী হয়েছে একটু, সিনিয়র নেতা আজগর ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল। কালু এসে দরজা খুলেছে আগেই। আসিফ বাইকটা সাইড করে রেখে ঘড়ি দেখলো সাড়ে নয়টা বাজে।
নিশা চলে গেছে এতক্ষণে , আসিফের রাগ লাগছে, অকারণে একটা ঝাড়ি লাগালো কালুকে। তারপর বললো, “মন্টুর দোকান থিকা নাস্তা নিয়ে আয়, যা। আর কড়া লিকার দিয়া দুধ চা, না কইলে কিন্তু পাতলা লিকারে দুধ দিয়া মিষ্টি পানি বানাইয়া দেবে।”

আসিফের এবার অনার্স ফাইনাল দেবার কথা। আগেই দিতো, কিন্তু ইলেকশনের ঝামেলায় দেওয়া হয়নি।
গত ছয় মাস ধরে ওর নিশাকে ভালো লাগছে। নিশার আব্বার কাছে ফরম ফিলাপের জন্য গিয়েছিলো। নিশা বাসায় সামনে সিড়িতে বসে গল্পের বই পড়ছিলো। আসিফের কি যেন হয়েছে সেদিন থেকে। স্যার খুবই ভালো মানুষ, তার একটা আলাদা সম্মান আছে। তবুও মাঝে মাঝে আসিফের ইচ্ছে করে নিশাকে বলা যেত যদি, “নিশা তোমাকে খুব ভাল লাগে আমার।”

নিশা স্কুল ড্রেস পরে মাথায় দু বেনী করে, সাদা ফিতা দিয়ে। পায়ে সাদা কেডস থাকে।হাতে একটা চিকন ব্রেসলেট, হাতটা যে কি সুন্দর। আসিফ যদি নিশাকে তুলে নিয়ে আসে তাহলে হয়ত একটু ঝামেলা হবে, কিন্তু কয়েকদিন পরে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু আসিফকে নিশা কখনো ভালোবাসবে না। ওর সাথে জোর করে থাকবে, হয়ত থাকবেও না। হয়ত এক সময় চলেও যাবে, আসিফ এসব উল্টো পাল্টা ভাবছিলো।

মাঝে মাঝে আসিফের মনে হয়, কোন সকালে নিশা জানালার পর্দা সরিয়ে আসিফকে বলবে, ওঠো তো, আরও ঘুমাবে! আসিফ নিশাকে খুব কাছে পাবে, ঘনিষ্ঠ ভাবে ওর তুলতুলে গালে আঙুল ছোঁয়াবে। নিশার হাত ধরে নিজের হাতে রাখবে!

-আসিব্বাই, আসছেন?

জগলু, দুলাল এসেছে । ওদের ডাকে আসিফের ঘোর কাটে। নেতা পাঠিয়েছে।
-স্যারে ডাকছে আপনেরে। কি যেন বলবে, আমাগোরে বলে নাই!

আসিফ বললো, নাস্তা করে যাইতেছি।

নাস্তা চলে এলো, আসিফ চায়ে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেললো।
–এই কাউল্লা, কস নাই যে কড়া লিকার দিতে?
–কইছি তো বাই, না দিলে কি করমু!
–যা, চা বানায় যেডা ডাইকা আন, বল আসিব্বাই ডাকছে।
কালু বিরবির করতে করতে আবার গেল ছ্যামড়ার কপালে ভোগ আ আইজকা! আসিব্বাই এমনে ঠান্ডা মানুষ, চেতলে গুষ্টি উদ্ধার কইরা দিবো।

দোকানের যে চা বানায়, চৌদ্দ পনের বছরের ছেলেটা, একটু ফটকা টাইপের। কালু টানতে টানতে নিয়ে এসেছে।
পার্টি অফিসের সামনে আরো দুইজন ওর দুই হাত ধরে আছে, আসিফ গেল কাপ নিয়ে,
–ওই তরে কয় নাই যে লিকার কড়া দিতে?
–কইছে বাই, ভুল হইছে, মাপ কইরা দেন!
আসিফ জামার কলার ধরে হাত উঠালো, একটা চটকানা মারলে কই যাবি খোঁজ থাকবো না!

কয়েকজন লোক জমা হয়েছে!
হঠাৎ আসিফ দেখলো নিশা যাচ্ছে, আসিফ ছেলেটার কলার ছেড়ে দিলো!
বললো, যা ভাগ, দৌড় দে! ভালা কইরা চা বানাইয়া দিয়া যা।

নিশা নিচের দিকে তাকিয়ে দ্রুত চলে গেলো, ছেলেটা খুব খারাপ, ভীষণ খারাপ। মারামারি করে সারাদিন।

আসিফের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো, কে জানতো নিশা আজকে দেরী করে স্কুলে যাবে!

নিশা ভাবছে, মানুষটা এত রুক্ষ কেন, ইশ, কেউ নাই মনে হয় বুঝানোর মতো! নিশার সাথে কথা হলে, নিশা বুঝিয়ে বলতো এসব ছেড়ে দিতে।
আরে ধূর, নিশা বললেই কি ছেড়ে দিবে নাকি! কে হশ নিশা, যে ওর কথা শুনবে!
নিশা ভাবতে ভাবতে স্কুলে ঢুকে গেলো।

আসিফ গেলো নেতার সাথে দেখা করতে।

 

(৪)

 

আসিফ নেতার বাসার বারান্দায় বসে ছিলো কিছুক্ষণ।নেতা বুলু গাজী সাহেব ঢুকলেন ড্রয়িংরুমে।
অত্যাধুনিক রুম, ঢাকা থেকে কিনে আনা নতুন ফার্নিচারে সাজানো হয়েছে। দামী পুতি চুমকি বসানো পর্দা।
তিনি আসিফকে ডেকে পাঠালেন ভেতরে। সাথে গৃহভৃত্যকে গালাগালি করলেন কতক্ষণ, আসিফকে কেন বারান্দায় বসিয়েছে এটা নিয়ে।

আসিফ ঢুকতেই আসিফের হাত ধরে নিয়ে নিজের পাশে বসালেন। বললেন, বাইরেটা তুই সামলা বাপ, তুই আমার পোলার চাইতেও আপন। যা লাগবে খালি মুখ থিকা বের করবি!

আসিফের মনে হলো, নেতাকে বলে আমাকে একটা চাকরিতে ঢুকায়ে দেন, কিন্তু বলতে পারলো না। নেতা হাজার ত্রিশেক টাকার বান্ডেল দিয়ে বললেন নিজের মত খরচ কর, পোলাপান যা চায় দিয়ে দে, আরও দিবো।
দুপুরে খেয়ে যাবি অবশ্যই।
কিন্তু নেতার মিটিং আছে টিএনও অফিসে, সে চলে গেলো। আসিফ আর দুপুর পর্যন্ত থাকবে না ঠিক করলো!

আজকে আর পার্টি অফিসেও যাবে না।
বাড়িতে বড়আপা এসেছে, মানে তো টাকা লাগবে। আসিফ ভাবলো, যাক, টাকার ব্যবস্থা হয়েছে তো!
এখন একটু নিশ্চিন্ত লাগছে।

আসিফ বাইক নিয়ে চৌধুরী পুকুরের দিকে চলে গেলো।বাইক রেখে ঘাটে গিয়ে বসলো। এই দিকে তেমন কেউ আসে না। ঘাট লাগোয়া চৌধুরীদের দ্বিতল বাড়ি, সকলে বিদেশে থাকে। কালে ভাদ্রে আসে এলাকায়। একজন কেয়ারটেকার আছে, দেখাশোনা করে বাড়িটার। আসিফের সাথে তার খাতির আছে ভালোই। এদিকে আশে পাশে কিছু জায়গা মানুষ কিনলেও জনবসতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে হয়ে যাবে। রাস্তাটাও বেশি ভালো না।
লালা ইটের টুকরো বিছানো। মেইন শহর থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে এই জায়গাটায় আসিফের একা লাগলেই চলে আসে।

নিশা আজ স্কুল থেকে বেড়িয়েছে দেড়টায়। আজ বিকেলে ম্যাথ টিউশনি। তার আগে পর্যন্ত কাজ নেই। বাসায় যাওয়া যায় কিন্তু ইচ্ছে করছে না। তার চাইতে লাল রাস্তায় হেঁটে আসা যায়। একা একা একটু ভয় ভয় লাগছে, মিতুকে ডাকলো কিন্তু মিতু যাবে না। কি যেন একটা কাজ আছে বললো।

নিশা একা একা হাঁটতে হাঁটতে চৌধুরী বাড়ি পর্যন্ত চলে এলো, এই জায়গাটা নির্জন, একটু ভয় ভয় লাগছে। আবার পেছনে চলে যাবে?
মনে মনে ভাবলো, এসেছি যখন পুকুরপাড়ে ঘুরে যাই।
নিশা পুকুর পাড়ে পৌছে দেখলো একটা বাইক, এই বাইক সে চেনে, কিন্তু আসে পাশে কেউ নেই!
আল্লাহ, এই ছেলে গুলি এখানে এসেছে নাকি!
নিশা মনে মনে দোয়া পড়া শুরু করলো, কি কুক্ষণে যে এদিকে এসেছে আজ! তবে কেউ নেই তো আশেপাশে।
নিশা ফিরে যাওয়া শুরু করলো!
কতটা পথ হেঁটে আসার পরে , সাই করে আসিফের বাইক এসে থামলো পাশে।
—-তুমি স্যারের মেয়ে না?
—-জি, নিশা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো।
—-এদিকে আসছো কার সাথে?
—-কারো সাথে না, একা!
—-একা একা এতদূর আসলা, এই পথটা নিরিবিলি, একা আসা ঠিক না।
নিশা আশেপাশে তাকিয়ে বললো, আপনিও তো একাই এসেছেন!
আসিফ হো হো করে হেসে ফেললো, আমার সাথে নিজের তুলনা দিচ্ছো!
নিশা অপ্রস্তুত হয়ে বললো, না আপনি একা আসলে সমস্যা নেই, আমি আসলেই সমস্যা!

আসিফ বললো, আমার কোন বিপদ নাই বুঝতে পারছো? তোমার আছে! এখন যাও, বাসায় যাও!

নিশা কথা না বলে হাঁটতে লাগলো। হেঁটে যেতে অন্তত বিশ মিনিটের রাস্তা। আসিফ পড়েছে মহা সমস্যায়, মেয়েটাকে একা ফেলে বাইক টেনে চলে যেতে পারছে না। আবার বাইক রেখেও যাওয়া যাবে না। এই মেয়েকে তো বাইকে তোলাও যাবেনা। “ধূর, মাইয়া মানুষ মানেই প্যারা!”

আসিফ আবার বাইক টেনে গিয়ে নিশার পাশে দাঁড়ালো।
বললো, “আমার সাথে যাবা?
ভয় নাই, মোড়েই নামিয়ে দিবো, কেউ দেখবে না।”

নিশার মনে হলো, বাইকে উঠলে যদি অন্য কোথাও নিয়ে যায়, এই ছেলেকে যতোই ভাল্লাগুক, এ তো বাজে ছেলে, পলিটিক্স করে, মারামারি করে! তারপর নিশার কি হবে!
নিশা ঘাড় নাড়লো, সে উঠবে না।
আসিফ আবার বললো, ভয় নাই, আসো। অনেক পথ।
একা একা যাবা সেফ না তো!

নিশার এবার একটু সাহস হলো, তাও মনে হলো কেউ যদি দেখে! বাবাকে বলে দিবে।
নিশা ইতস্ততভাবে বললো, থাক, আমি হেঁটে যাই, আপনি চলে যান।

আসিফ নরম ভাবে বললো, আসো, ভয় নাই!

এবারের কথায় কোথায় যেন অনেক ভরসা ছিলো।

নিশা বাইকে উঠে বসলো, দুই তিন মিনিটে রাস্তার মোড়ে এসে আসিফ নামিয়ে দিলো নিশাকে।
তারপর বললো, আর কখনো একা যাইও না। রাস্তাটা ভালো না, বলে আসিফ চলে গেলো!

নিশার কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হলো, ও কতবার ভেবেছে, এই পথে আসিফের সাথে গল্প করতে করতে হাঁটবে। সেই আসিফের সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে, ভাবেনি কখনো! নিশা ঘড়ি দেখলো, আধঘন্টা বাকি এখনো, স্যারের বাসায় গিয়ে বসা যায় এখন।

নিশা হেঁটে চলে গেল ম্যাথ স্যারের বাসায়।

 

আরো পড়ুনঃ রোদের চিঠি [ পর্ব- ৫ ও ৬]

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 1 comments