32

রোদের চিঠি- (শেষ খন্ড)

 

(১৩)

 

আরও চার বছর পরের গল্প …………

শিবরামকাঠি সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের একাডেমিক ভবনের সামনে এসে আসিফের ড্রাইভার গাড়ি থামালো।
আজ নতুন জয়েন করা শিক্ষকদের সাথে কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার সবার আলাপ করিয়ে দিবেন, বরণ করে নেওয়া হবে। তাই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও নিমন্ত্রিত।

আসিফ ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি ছিলো টানা চার বছর। ছাত্র রাজনীতি থেকে বের হয়ে এখন এলাকায় সক্রিয় রাজনীতি করছে, সামনে হয়তো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও করবে। আসিফের বয়স তেত্রিশ হলেও বিচক্ষণতার জন্য সবার কাছে খুবই সমাদৃত সে। এখনো দুর্নীতির কালি গায়ে লাগেনি, রাজনীতির পাশাপাশি নিজে ব্যবসাও করছে। যদিও ব্যবসা পত্র সব কর্মচারীরা দেখাশোনা করে।

গতকাল কলেজের সংসদ থেকে আসিফকে ফোন করা হয়েছিলো। আসিফ ছিলো বরিশাল, সেখান থেকে এসে সরাসরি এসেছে। এখন প্রায় একটা বাজে। অনুষ্ঠান হয়ত প্রায় শেষ। আসিফ ঢুকলো হল রুমে। স্টেজে আছেন এমপি সাহেব, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও আরো অনেকে, আসিফ স্টেজে না উঠে সামনে বসলো। এমপি সাহেব সঞ্চালককে বলে আসিফকে স্টেজে ডেকে নিলেন। স্টেজে উঠে আসিফের চোখ আটকে গেলো একদম কর্ণারে, গোলাপি রঙের শাড়ি পড়া ওটা কে, নিশা!
নিশা এখানে কি করছে! এখান থেকে জিজ্ঞেস করার মতো কেউ নেই আশেপাশে। সবার বক্তব্য শেষ হলে, নতুন শিক্ষকদের শুভেচ্ছা উপহার দেওয়া হলো যখন, নিশাত সামরিন এলো সামনে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নতুন প্রভাষক, সদ্যই বিসিএস পাশ করে জয়েন করেছে।

আসিফ এমপি সাহেবের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো, নিশার দিকে তাকাতে ভীষণ অস্বস্তি লাগছিলো, এত বছর পরেও কেন এমন হয়, আসিফ ঠিক বুঝতে পারে না। নিশা আসিফকে দেখেছে। বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগে, আসিফ কি জানে, আসিফের জন্যই নিশা আগ্রহ করে এখানে এসেছে। জানেনা, হয়ত বুঝতেও চেষ্টা করবে না। কে জানে, হয়ত বিয়ে টিয়ে করবে সামনে, বিয়ে যে করেনি এটা নিশা জানে। নিশাও বিয়ে করেনি, তবে এবারে হয়ত করতে হবে। বিসিএস হোক আগে, এই অজুহাতে বিয়ে পিছিয়েছে অসংখ্যবার।

নিশাকে স্টেজ থেকে নামতে দেখে তকিব হাসলো। তকিব নিশার কলিগ, ইংলিশে জয়েন করেছে। তকিব ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলেও আগে আলাপ ছিলো না। নিশার সিনিয়র দু বছরের। এখানে এসেই আলাপ হলো। ভালো ছেলে। নিশাকে তকিব বললো, নিশা, চলো লাঞ্চে যাই? নিশা উত্তর দিলো, আমি খাবো না তকিব ভাই, আপনারা যান, আমি বাসায় চলে যাই। বিকেলে চায়ের দাওয়াত, মনে আছে তো?

–হু, মনে আছে, পাকোড়া থাকে যেন, আন্টিকে বলে দিও। তকিব হাসতে লাগলো।

আসিফ তাকাবে না করেও বারবার চোখ চলে যাচ্ছে। নিশা, ছোট্ট নিশার কত স্মৃতি, একটা জীবন সেসব স্মৃতি নিয়ে পার করে দিতে পারবে আসিফ। সবাই বললেও বিয়ে করতে পারেনি সে। রোজ সকালে ঘুম ভাঙার পরে মনে হয়, নিশা একদম পাশে, যদিও নিশা অনেক অনেক দূরে।

আসিফ বের হয়ে গেলো। এমপি সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিচে গেলো, তখনি সংসদের বর্তমান সেক্রেটারি সাইফ ধরে আনলো আসিফকে, না খেয়ে যাওয়া যাবে না। নিশা বের হয়ে যাচ্ছিলো, আসিফ সাইফকে বললো, নতুন ম্যাডাম মনে হয় খান নি, চলে যাচ্ছেন। সাইফ দৌড়ে গিয়ে নিশাকেও ধরে নিয়ে এলো।
-ম্যাম আপনাদেরই জন্য আয়োজন, না থাকলে হয় বলেন!

নিশা না করলো না। কিন্তু দেরী হওয়ায় আসিফ আর নিশাকে পাশাপাশি বসতে হলো। নিশা একবারও তাকায়নি আসিফের দিকে। আসিফও প্রচন্ড অস্বস্তিতে। পোলাও আর ডিমের কোরমা প্লেটে দিয়েছে। আসিফের গলা দিয়ে খাবার নামছে না। নিশার খিদে ছিলো, একটু সময় বসে থেকে খেতে শুরু করলো, আস্তে করে আসিফকে শুধু বললো, আমি পাশে বসেছি বলে খাওয়া যাবেনা, এত অস্পৃশ্য ভাবেন নাকি এখন! আসিফের এরপর আর কিছু বলার থাকে না। আসিফ খাওয়া শুরু করলো, কিন্তু সমস্যা হলো নিশাকে একটা চিকেনের ব্রেস্টপিস রোস্ট দিয়ে গেলো, নিশা এই পিস খায় না। তাই এক পাশে সরিয়ে ডিম দিয়েই খেতে লাগলো। আসিফ বিষয়টা খেয়াল করলো, কিন্তু ডাকার মতো কাউকে দেখতে পেলো না। আসিফ খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলো, নিশা তুমি কি চিকেন খাও না? নিশা বললো, খাই তবে লেগপিস, এটা খাই না।

-আচ্ছা আমার প্লেট থেকে পাল্টে নাও।

-না, ইটস ওকে, আপনি খান।

নিশার প্লেটে এটো হাত দেওয়াটা অভদ্রতা দেখায়। কিন্তু আসিফেরও খাওয়া হলো না।

সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেলো, চৌধুরি বাড়তে আসিফের জন্য আনা নাস্তা নিশা মুখে দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো। তার পরের দিন নিজের টিফিন বক্স ভর্তি করে রুটি, ভাজি আর ডিম নিয়ে আবার গিয়েছিলো নিশা। আসিফকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছিলো। আসিফের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। নিশা এত কাছে বসে আছে, সেই ছোট্ট নিশা না, সরকারি কলেজের নতুন লেকচারার নিশাত ম্যাডাম। এখন আগের কথা ভাবা নিতান্তই বোকামি হয়।

ও দ্রুত খাওয়া শেষ করলো, তবে নিশার সাথে আর কথা হলো না। তকিব এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে, নিশা, তুমি আমাদের সাথেই বসতে পারতে! এখানে একা একা বসতে হলো! নিশার খাওয়া শেষ হলে হাত ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে দেখলো আসিফ নেই, চলে গেছে। নিশার চোখ চলে গেলো আসিফের প্লেটে, ছেলেটা লেগপিস ধরেও দেখেনি, কিন্তু কেন? নিশা খেতে পারেনি বলে? এটা কি সম্ভব!! নিশার জন্য আসিফের এই সফট ফিলিং কাজ করবে এখনো!

ও একট দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো শুধু।

 

###

আসিফের মনটা একটু কেমন যেন লাগছে, নিশা সামনে না থাকলে এত খারাপ লাগে না। কিন্তু ওকে দেখলেই অস্থির লাগে। কেন এমন হয়! নিশা আসিফকে চুমু খেয়েছিলো সেই কবে, সেই উষ্ণতা আসিফকে এখনো শিহরিত করে, নিশা যে বুকে মাথা রেখেছিলো, সেখানে অন্য কাউকে আসিফ ভাবতে পারে না। বার বার বিয়ের প্রসঙ্গে কথা উঠলে আসিফ এড়িয়ে যায়।
আজ কেমন আকস্মিকভাবে নিশা কাছে বসেছিলে একটু সময়, নিশাকে ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। যদিও এসব ইচ্ছে মূল্যহীন। নিশাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসার পরে, আসিফের সাথে নিশা আর কথা বলেনি, আজই অল্প দুয়েকটা কথা বললো, সৌজন্যতার খাতিরে।

আসিফ সেদিন নিশাকে ফিরিয়ে দিয়ে না এলে নিশা আজ এত দূরে আসতে পারতো না।
আসিফকেও হয়তো থেমে যেতে হতো রাজনীতি থেকে, নিশার বাবা সম্মানিত ব্যক্তি, তার মেয়েকে এভাবে বিয়ে করলে তার সম্মানহানি হতো। তাই আসিফ ভুল করেনি, ঠিক ছিলো সেদিনকার সিদ্ধান্ত। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে আসিফ গাড়ির সামনে আসে। গাড়িটা আসিফের নিজের নয়, এমপি সাহেব দিয়েছেন আসিফকে ব্যবহার করতে। ক্ষমতার পালাবদলে আগের নেতাকে সরে যেতে হয়েছে। তার জায়গায় যিনি এখন এসেছেন, তিনি সম্ভ্রান্ত এবং ভালো মানুষ। সেই সাথে কুটিলতাবর্জিত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ।

আসিফের মতো কর্মঠ কর্মীকে তিনি ছায়া দিয়ে বড় হতে সাহায্য করেছেন। তার ঠিকাদারি ব্যবসায় আসিফকে সাথে নিয়েছেন।
মনে মনে হয়তো তার পরে তার জায়গায় আসিফকে ভাবেন। তবে মনে মনে আরো একটা কথা ভাবেন তিনি, আসিফকে তার পরিবারের অংশ করতে পারলে খারাপ হয়না। তার দুই মেয়ে স্বামীর সাথে প্রবাসী, ভাইয়ের মেয়ে সুবহানার জন্য আসিফকে ভেবেছিলেন। কিন্তু আসিফ সরাসরিই না করেছে, আসিফ বিয়ে করতে চায় না। কি কারণে সেটা ঠিক বোঝেন না তিনি।
তবে জোর করেননি। কিছুদিন পরে আবার বলবেন ভেবেছেন। জীবনের নারীসঙ্গীর দরকার। প্রচন্ড কাজের চাপ আর ক্লান্তিতে এখনো তার স্ত্রী মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তার শান্তি হয়। আসিফের তো দুরন্ত যৌবন। কি ভাবে ছেলেটা কে জানে!

 

নিশা টিচার্স কমনরুমের সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। দূরে আসিফকে চোখে পড়লো, গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে খুব ম্যানলি হয়েছে এখন, মুখের ইনোসেন্ট ভাবটা নেই, সেখানে পুরুষালী গাম্ভীর্য এসে জায়গা করে নিয়েছে। খুব কাছে গেলে হয়ত বুনে ঘ্রাণ পাওয়া যাবে।

নিশার হঠাৎ ইচ্ছে হলো, আসিফকে জাপতে ধরে ওর বুকের ভেতর ঢুকে যেতে। মনের অনুভূতির সাথে শারিরীক অনুভূতির যোগাযোগ আছে কি? আছে হয়তো, এখনো আসিফকে দেখলে নিশার কত কিছু মনে হয়, কই ভার্সিটিতে এত ছেলে ছিলো, কখনো তো কিছু মনে হয়নি কাউকে দেখে। আসিফ কি কিছু অনুভব করে নিশার জন্য, কে জানে!

-নিশা, ডরমিটরিতে যাবে? তকিব এসে জিজ্ঞেস করলো।

-নাহ, বাসায় চলে যাই, আপনারা আসবেন কিন্তু বিকেলে।

-ওকে, যাও তাহলে।

নিশা বাড়ির দিকে যেতে রিক্সা নিলো । আচ্ছা সেই রাস্তাটা কি এখনো সেরকম লাল ইটের আছে?
এখনো পলাশ ফোঁটে?

-মামা, চৌধুরী বাড়ির রাস্তাটা কি ঠিক হইছে? রিক্সাওয়ালাকে প্রশ্ন করে নিশা।

-না মামা, পিচ ঢালে নাই, শুনছি কাজ হবে।

-একটু যাবেন ওদিকে?

-মামা আপনের বাসার উল্টা দিকে তো!

-থাক চলেন না একটু, ঘুরে বাসায় যাবো।

-আইচ্ছা চলেন।

দুপুর আড়াইটা, এখন রাস্তাটা হয়তো নিরিবিলি। কেউ নেই, হয়তো পলাশ গাছের নিচটা টুকটুকে কমলা হয়ে আছে ঝরা পলাশের চাদরে।নিশা রিক্সা থামাতে বললো, লাল ইটের রাস্তার আগেই। বললো, আমি আসছি মামা, দশ মিনিট, আপনি একটু দাঁড়ান।

নিশার জন্য সবচাইতে বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো! ও তাকিয়ে দেখলো, সাদা স্ট্রাইপ পাঞ্জাবী পরা কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে! আসিফ!! নিশা নিঃশব্দে পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
-আপনি এখানে? এই সময়ে? একা একা!!

আসিফ ভীষণ চমকে পাশে তাকালো, নিশা!
তারপর নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করলো, তুমি এখানে কি করছো? এই রাস্তাটা নিরিবিলি, সময় অসময়ে এখানে একা আসবে না।

-বাহ, আপনি তো আসেন দেখছি?

-আমি আসলেই তুমি আসতে পারো না, আমি আর তুমি এক না নিশা।

নিশা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো, হুম, জানি।
আপনি আর আমি কখনোই এক না, কখনো এক ছিলামও না!

নিশা পেছন ফিরলো চলে যেতে, আসিফ একটু নরম ভাবেই বললো, চলে যাচ্ছো?

-চলে তো সেই কবেই গিয়েছি!
নিশার অভিমান ভরা কন্ঠে কান্না ভেসে এলেও আসিফকে দেখতে দিলো না।

দ্রুত হেঁটে রিক্সার কাছে চলে এলো।
তারপর বললো, চলেন মামা, বাড়ির দিকে যাই।

 

###

নিশা ভীষণ অভিমানী, কেন ওভাবে বললো আসিফ, নিজের উপরই রাগ হচ্ছে, একটা বিষয় আসিফ খুব ভালো বুঝতে পারছে, নিশা তাকে ভুলে যায়নি।
আসিফ যেমন মনের মধ্যে যত্ন করে নিশাকে রেখেছে, নিশাও রেখেছে আসিফকে।
আচ্ছা নিশাকে বিয়ের কথা বলা যায় না? নিশা বউ সেজে আসুক আসিফের কাছে।
কিন্তু কোথাও একটা বাঁধা অনুভব করে, নিশার বাবা হয়তো রাজনীতি করা আসিফকে পছন্দ করবেন না।
না করে দিলে তখন কেমন একটা বিষয় হবে, আসিফ দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পরে।

নিশা কি সুন্দর হয়েছে এখন।
আগেও ও সুন্দর ছিলো, মিষ্টি দেখতে ছিলো, এখন পরিণত বয়সে লম্বা চুল আর টানা টানা চোখে অনেক ভাষা লুকিয়ে রাখে সে।
ইশ, এমন কখনো হবে , সারারাত নিশার চুলে মুখ গুঁজে কেটে যাবে?
নিশাকে অনেক আদরে ভাসিয়ে আলগা পিঠে আসিফ জল আল্পনা আঁকবে।অথবা নিশা আসিফের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকবে, কোন দিন কি হবে এগুলো?

এগুলো হয়ত হবে না।
নিশা যে ঠোঁট স্পর্শ করেছে, সেখানে অন্য কাউকে জায়গা দিতে পারবে না আসিফ।
আসিফের জীবনটাই তো নিশার জন্য, নিশাকে ভালোবেসে নিজের উন্নতির দিকে মন দিয়েছে আসিফ।
গুছিয়ে রাজনীতি করছে, পাশাপাশি ব্যবসাও করছে।
নিশা কি বোঝে না এসব!
অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আসিফ বাড়ির দিকে আগায়।
গাড়িটা গ্যারেজে পাঠিয়েছে, বরিশাল আসা যাওয়ার পথে একটু সমস্যা করছিলো, সার্ভিসিং করে আনুক।

হঠাৎই ফোন দিনেন এমপি রাজিবুল ইসলাম সাহেব।
-আসিফ, বাসায় আসো, কলেজে তো কথাই হলো না।
কি কি করলে একটু শোনা দরকার না?

-জি আসবো স্যার, রাতে আসি?

-আচ্ছা, আমি সুবহানাকে বলছি একটু রান্নাবান্না করতে।

-স্যার পার্টির ছেলেরা রাতে পিকনিক করতে চাইছে, ওখানে যেতে হবে একটু।

সুবহানার কথা শুনলে আসিফ অজুহাত তৈরি করবেই, এটা এমপি সাহেব দেখেছেন আরো কয়েকবার।
তবে না তো করতে পারে না, অন্যভাবে বলে।
তিনি চান বিয়েটা হোক। দেখা যাক, কতদূর হয়।

আসিফ বাসায় ফিরেছে সন্ধ্যায়, গতকাল রাতে তার ঘুম হয়নি। হোটেলে সে ঘুমাতে পারে না। বাড়িতে ফিরতেই রাইন এসে জড়িয়ে ধরলো। রাইন আসিফের ভাগ্নে, ছোট বোনের ছেলে। ছোটবোনকে শ্বশুরবাড়ি নিয়েছে অনেক পরে, রাইন আসিফদের কাছেই ছিলো তিন বছর পর্যন্ত। শেষে রাইনের বাবার চাকরি হলো প্রাইমারি স্কুলে, সেটাও আসিফের চেষ্টায়। এরপর নিজেরা আলাদা বাসা করেছে।

মা, ছোটপা আসছে নাকি? আসিফ মাকে জিজ্ঞেস করলো।
-আসছিলো, চলে গেছে। কাল আসবে আবার, জাহেদা উত্তর দিলেন।

-কেন, হঠাৎ এত ঘন ঘন?

আসিফ বোনদের বেশি পাত্তা দেয় না, যদিও ভাগ্নেরা খুব আদরের।

না মানে, এমপি সাহেবের স্ত্রী, মানে ভাবী ডাকছিলেন, তোর বড়পাও আসবে কালকে।

আসিফ বুঝতে পারলো, সুবহানাকে নিয়ে কথা বলবে হয়তো। আসিফ বললো, মা, ডাকতেছে যাও, সুবহানাকে নিয়ে কোন কথায় সায় দিবা না, আমি এখন বিয়া করবো না।

জাহেদা বেগম জানেন, আসিফ এখনি বিয়ে করতে চায়
না কেন। সেই যে এক মেয়ে আসছিলো একদিন বাড়িতে, ওই মেয়ের জন্যই।

আসিফ নিজের ঘরে ঢুকলো। মাও পিছন পিছন ঢুকলেন।

নিজের রুমটা পুরো সাদা ফার্ণিচার করেছে। অবশ্য বেশি কিছু না, একটা বেড, আলমারি আর টেবিল।
নিশা এসে বাকিটা করবে, আচ্ছা আসিফের সব সময়ই মনে হয় নিশা আসবে, ও যদি না আসে!

আসিফ নিজের বিছানায় বসার পরে, মা পাশে এসে মাথায় হাত দিলেন, আব্বা, ওই মাইয়াটা কই এখন?

–কোন মেয়ে আম্মা

–ওই যে একদিন আসলো তোর কাছে, কান্না করছিলো, তুই আবার নিয়ে গেলি, কোন স্যারের মেয়ে বলছিলি!

মা নিশার কথা বলছে, আজ মা হঠাৎ ওর কথা কেন বলছে, মায়েরা কি সত্যি জাদু জানে!

আছে মা, ভালো আছে, কলেজে চাকরি হইছে!

ওহ, ভালো তো, সুবহানারে তর পছন্দ না, ওই মাইয়াটারে আন তাইলে, তর তো মনে হয় ওরেই পছন্দ। এখন তো আর আল্লাহর উছিলায় কোন সমস্যা নাই আমাগো। খালি তর আব্বায় পাইলো না কিছু,

জাহেদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার স্বামী মারা গেছে পাঁচ বছর। আসিফই বাড়ির প্রধান। নিজে ব্যস্ত বলে বিয়ে করছে না৷ ছোট ভাইকে বিয়ে করাইছে। তারা থাকে এ বাড়িতেই। সবাইরে সব কিছু করে দিছে তার আসিফ, নিজে ফাঁকা বুকে ঘুরে বেড়ায়।

জাহেদা বেগম দুরাকাত নফল নামাজ মানলেন। আসিফের জন্য ওই মাইয়া যেন পাঠাইয়া দেন, আল্লাহ! পোলাটার কষ্ট কমুক।

আসিফ নিঃশ্বাস ফেলে, কোন সমস্যা নেই, তবুও দূরত্ব বেড়েছে অনেক। নিশার হয়ত নিজের জগত তৈরি হয়েছে, সেখানে ঠিক কতোটা জায়গা আসিফের।

আসিফ হয়তো বুঝতেই পারেনা, নিশার কেউ নেই কিচ্ছু নেই সারা পৃথিবীতে, শুধু আসিফের জন্য এক পৃথিবী ভালোবাসা বুকে নিয়ে বেড়ায় নিশা।

অন্য কেউ আসবে এ ঘরে, কখনোই না।
চৌধুরী বাড়ির বারান্দার রেলিং পাশের বসার জায়গাটা
নিশার ভালো লেগেছিলো, আসিফ বড় একটা জানালা করে তার নিচে দুজনের বসার জায়গা করেছে, বসে শুয়ে বই পড়া যাবে, আসিফের সময় হয়না, নিশা এসে কোন দিন বসবে।

আহারে অবাধ্য ইচ্ছেরা , নিশাকে কিভাবে কাছে আনবে আসিফ, কি করা যায়! আসিফকে যদি ফিরিয়ে দেয় নিশা?

 

রোদের চিঠি- শেষ খন্ড [পর্ব ১৪]

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 32 comments