ভালোবাসার গল্প

 

সালেক মিয়া জ্বর হয়ে দুই দিন ধরে কাজে যেতে পারছে না৷ সে রিক্সা চালায়, কাজে না গেলে ইনকাম বন্ধ, খাওয়াও জুটবে না!! ক্ষুধায় কাহিল লাগছে।
সকালে কাজে যাওয়ার সময় সুফিয়া উকি দিয়ে দেখে গেছে।
সে পাঁচ বাসায় ছুটা কাজ করে, রান্না করে দেবার সময় নাই ! আর যে মেজাজ, চটাং চটাং করে কথা বলে সব সময়।তাও সকালে কাজে যাওয়ার দেখে গেছে। সালেক মিয়ার মাঝে মাঝে এই শহরে সংসার করতে সাধ হয়। ‘সুফিয়ারে বিয়াডা করলে খারাপ অয়না, ইনকাম তো করে, রান্না খাওয়ার ও চিন্তা থাকতো না।

সুফিয়া বিয়ার কথা শুনতেও পারে না। আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, জামাই কিছু করতো না, উল্টা সুফিয়ার টাকায় খেতো, আবার মারতো টাকা না দিলে। এসব কারনে প্রেম পীরিতি, বিয়ে সংসার এসব নিয়ে কথা বললে সুফিয়া চটাং করে ওঠে।
তবুও আসে অনেক রাতে। যখন সালেক ফেরে রিক্সা নিয়ে।কোন বাসায় কি হইলো, কোন বাসায় ম্যাডাম কেমন, কোন বাসায় মেহমান আসলো, কোথায় কার অসুখ এসব গল্প করে। সালেক মিয়ার ভালো লাগে এসব গল্প শুনতে। আশপাশের বন্ধু বান্ধব টিটকারি মারে, তাও সালেক বা সুফিয়া পাত্তা দেয়না।

গ্রামের কথা মনে পড়ে। বউটা খুব খ্যাচ খ্যাচ করতো। অবশ্য খাওয়া পড়া দিতে না পারলে ভাল কথা আসবে কোথা দিয়ে। বাপ মা আলাদা করে দিবে বলেছে টাকা না পাঠালে, তাই মাসে মাসে টাকা পাঠানো লাগে। ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। তারও খরচ দেয়া লাগে।

রিক্সা চালিয়ে দুপুরে রান্না করে খাওয়া হয় না। লেকের পাড়ে সস্তায় খাওয়া পাওয়া যায়, রোজ দুপুরে ওইখানেই খায় সালেক।
সুফিয়াকে একটা শাড়ি কিনে দিতে হবে৷ সামনে যে পয়লা বৈশাখ, ছুটির দিন আছে, ওইদিন রিক্সা চালাবে না সালেক। সুফিয়ারে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবে।
ঢাকায় কত্ত ঘোরার জায়গা আছে। এরপর সুফিয়ারে বোঝাতে হবে, দেশে বউ আছে তো কি, সালেক তো আর দেশে যাচ্ছে না, দেশে জমিজমা নাই, তার চাইতে আস্তে আস্তে দুইটা রিক্সা কিনবে। একটা পানবিড়ির দোকানও দেয়া যায়। খুব চলে ঢাকায়, দিনে পাচশ টাকাও আয় হয়, রিক্সাগুলা ভাড়ায় চালাবে। সুফিয়া কাজ করতে চাইলে করবে, তারা একটা রুম নিয়ে সংসার করবে।
ছুটির দিন জিয়া উদ্যান যাবে ঘুরতে। মাঝে মাঝে খিচুরি রান্না করবে, চাইল, ডাইল, আলু দিয়া।
ক্ষুধার সময় সব চিন্তার মধ্যেই খাবারের কথা চলে আসে।এই ক্ষুধা না থাকলে সবাই বিরাট চিন্তাবিদ হইতো।
এই মুহুর্তে সালেক মিয়ার খেতে ইচ্ছে করছে গরম ভাত, পাতলা ডাল আর রসুন মরিচের ভর্তা।
সে উঠে বসলো। কাপুনি দিতেছে। কাথাটা গায়ে পেচিয়ে পানির বোতল থেকে পানি খেলো। পানিও শেষ প্রায়। আজকে তো অবস্থা খুবই খারাপ মনে হয়।

সুফিয়ারে বুঝায়ে শুনায়ে রাজি করাতে পারলেই হয়।
জ্বর বাড়তেছে।মাথা ব্যাথাও বাড়ছে।

ছুটির দিন ঢাকায় মানুষ জন বেশি রিকশায় চড়ে, ঘুরতে যায়। ইনকামও ভাল হয়।
গ্রামে ফিরতে ইচ্ছা করেনা। খালি অভাব আর অভাব। ভাঙনের বছর জমিটুক ভেঙে যাবার পর গ্রামে কোন কাজ ছিল না। তখন ঢাকায় চলে আসে সালেক।
মোসলেম ভাইয়ের সাথে আলাপ হয় গাবতলী, সেই মহাজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, ভাড়ায় রিক্সা নিয়ে চালানো শুরু করে।
গাড়ি নিয়ে নামলে আয় হয়, থাকে, নিজে খাওয়ার পর বাড়িও পাঠান যায় কিন্তু না চালালে তো খাওয়াও জুটবে না।
সুফিয়ার ইনকাম বান্ধা, মাঝে মাঝে কাজে না গেলেও বেতন বন্ধ হয় না। সালেক আবার চিন্তা করে।
দেশে বউ পোলা থাকলে কি হইছে, সে তো আর দেশে যাইয়া থাকতেছে না। পোলা একটা কাজে ঢুকলে বউরে তো টাকাও দেয়া লাগতো না।
জ্বর এ উল্টা পাল্টা চিন্তা আসতেছে মাথায়।
একটা বিড়িতে টান দিতে ইচ্ছা করে।
পাশের রুম থেকে হাসাহাসির আওয়াজ আসতেছে। ওই রুমে থাকে এক ট্রাক ড্রাইভার মফিজ ভাই, রাতে ট্রিপ দেয়, দিনে প্রায়ই তার রুম থেকে মেয়েছেলের হাসির আওয়াজ আসে। সালেকে সংগে এত ভাব নাই। এইখানে সেই একটু বেশি আয় করে কিনা, কাউরে গোনে না, কথাবার্তায় বড়লোকি ভাব ধরে, আবার মাঝে মাঝে দেখা হইলে চায়ের পয়সাটা সেই দেয়। মানুষের ধরণ বুঝা দায়!!!
আবার দার্শনিক ভাবে চলে যায় সালেক মিয়া।
একসময় চোখ লেগে আসে।
ঘুম ভাঙে বিকেলে। সুফিয়ার ডাকে।
ওঠেন মিয়া, চোখে মুখে পানি দেন।

সালেক মিয়া চোখে মুখে পানি দিয়ে খেতে বসে। রাজার খানা খাদ্য, ভাত, ডিমের তরকারি, বেগুন ভাজি, ডাল।
সুফিয়াকে কথাটা বলা হয় না।

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments