8

বৃষ্টি নামার আগে- শেষ পর্ব

 

ইপ্তি হসপিটাল বিল্ডিং এ ঢুকে গেলো। ইপ্তির মাও পেছন পেছন ঢুকলেন। ইপ্তির পেছন পেছন সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন। এই সিঁড়িটা সাইডে, ভেতরের লোকজন ছাড়া পেশেন্টরা তেমন ব্যবহার করে না, এই সিঁড়ি দিয়ে উঠলে শাফির কেবিন কাছে হয়। নিরিবিলি থাকায় ইপ্তির মাকে কেউ আটকালো না।

ইপ্তি কেবিনে ঢুকে গেলো, ইপ্তির মা দরজার আড়ালে থাকলেন, ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শাফি ওয়াশরুম থেকে বের হলো একটু পরে।
ইপ্তির মা আফরোজা আহমেদ প্রথমে দেখলেন ইপ্তি টেবিল থেকে ফাইলটা দেখছে। তাহলে বোধ-হয় পেশেন্ট দেখতে এসেছে, কিন্তু ক্লাশ টাইমে, রোদের ভিতর হন্তদন্ত হয়ে আসতে হলো!
শাফিকে বের হতে দেখে তার কাছে স্পষ্ট হলো। ছেলেটা এখানে কেন, হাতে কি হয়েছে, তিনি বলেছিলেন, তুমি বিবেচনা করে দেখো, তোমার যদি মনে হয় পারফেক্ট ম্যাচ তোমারা, তাহলে ওকে, কিন্তু আসলেই কি তাই? ইপ্তি পারবে তোমার সাথে এডজাস্ট করতে? কিছুদিন পরে ও নিজেই চলে আসবে, তখন দুজনের জীবনেই একটা দাগ লেগে যাবে।

ছেলেটা প্রথমে তো যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো, তারপর আবার যোগাযোগ করেছে! তার হাতে কিছুই কি নেই! এই ছেলের সাথেই ইপ্তির বিয়ে দিতে হবে! ইপ্তির মতো সুন্দরী, স্মার্ট, অভিজাত পরিবারের মেধাবী মেয়ে দেখে ছেলেটা নিশ্চয়ই অন্যকোন ট্রিকস করেছে, সহজ সরল ইপ্তি বুঝতে পারেনি।

শাফি একটা ধবধবে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর জিন্স পরা ছিলো, শেভ করা হয়নি কত দিন, মুখে খোঁচা খোঁচা শ্বশ্রুভরা মুখটাও ইপ্তির মায়াবী লাগে।
শাফিকে প্রথমবার ওর বেডরুমে খোলা বুকে দেখেই ইপ্তির কেমন একটা অনুভূতি হয়েছিলো, শাফিরও কি ইপ্তির জন্য এমন লাগে! ভালোবাসা শুধু মনের এই বোকা বোকা কথাটা কে যে বলেছে! ভালোবাসায় শারিরীক স্পর্শ অনেক বড় জায়গা নিয়ে আছে৷ ভালোবাসলে সবকিছু লাগে, অনুভূতি লাগে, নরম স্বরে দুষ্টুমি মেশানো কথা লাগে, শরীরের গন্ধ, স্পর্শ, শিহরণ লাগে, চুমু লাগে, তাহলেই না পুরোপুরি পাওয়া হয় মানুষটাকে!! ইপ্তিকে দেখে ইতস্তত বোধ করে শাফি৷ জিন্স কালারের শার্টটা নিয়ে একহাতে পরতে যায়, ইপ্তি গিয়ে শার্টটা পরিয়ে দিয়ে বোতামগুলো আটকে দেয়!
শাফি তারপরই দূরে সরে যায়, গিয়ে বিছানায় বসে কোন কথা না বলেই।

ইপ্তি জিজ্ঞেস করে, কোন কিছু গোছানো বাকি আছে?

-না, সব গোছানো হয়েছে৷

-ওষুধগুলো?

-সিস্টার বুঝিয়ে দিয়েছেন!

-ব্যান্ডেজ খুলতে বলেছে কবে?

– বাড়ি গিয়েই খুলবো।

-আচ্ছা।

-ইপ্তি,

-বলুন

-তোমাকে আমি আসতে নিষেধ করেছিলাম, তারপরেও তুমি প্রতিবেলায় এসেছো। কাজটা কি ঠিক করেছো?

শাফির কন্ঠস্বর কঠিন শোনায়, আফরোজা আহমেদ অস্বস্তি বোধ করেন, এভাবে কেউ ইপ্তির সাথে কথা বলতে পারে!! তিনি নিজে কখনো ইপ্তিকে জোরে কোন কথা বলেননি।

-আর তো আসার সুযোগ নেই, চলেই তো যাচ্ছেন! – ইপ্তি বললো।

-তুমি এখন চলে যাবে, আমাদের সব কিছু শেষ, তুমি ক্লাশ মিস করে এখানে আসছো, এভাবে একজন পেশেন্টকে কি তোমার বিরক্ত করা ঠিক হয়েছে?

-আমি আপনাকে বিরক্ত করেছি?

-হ্যা, শুধু তাই না, সিস্টারের সাথে যুক্তি করেছো, আমি এগুলো কমপ্লেন করবো হসপিটালে, তোমার কিছু না হলেও সিস্টারের চাকরি থাকবে না!

ইপ্তি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো, ওর জন্য সিস্টারের চাকরি চলে যাওয়া কোন কাজের কথা না৷ শাফি এমন না, কিন্তু ওর কাছে খারাপ সাজতে এটা করে ফেললে মাঝখান থেকে সিস্টারের সমস্যা হবে।

-আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি।

-ইপ্তি, খুব ভালো করে একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নাও, আর কখনো কোনভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করবে না।

-আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করিনি। এখানে এসেছেন তাই জানতে পেরেছি!

-তুমি ফোন করেছিলে, আমি ওটিতে ছিলাম যখন!

ইপ্তি ভাবলো, ওই সময়টা ওর খুব অস্থির লাগছিলো, কিছু না জেনেই ফোন করেছে। কিন্তু কোন উত্তর দিলো না।

একটু সময় চুপচাপ থেকে ইপ্তি বললো, আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন, আপনার ফোনের গ্যালারীতে আমাদের ছবি গুলো আছে, ইভেন পরীকেও তো ভুলে যাননি, নয়তো সেদিন এতো কাছে এলেন কিভাবে? আপনি তো এমন না যে যেকোন মেয়েকে বুকে টেনে নিতে পারবেন!!

ইপ্তি এতো কথা শিখলো কবে, আফরোজা আহমেদ ভাবলেন।

-ছেলেরা সব কিছু পারে, তুমি একটা ছেলের বুকের উপর গিয়ে পড়বে আর সে বেসামাল হবে না, পুরুষ মাত্রই হবে।
অল্প সময়ের জন্য নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি! কেউ ই পারবে না।

-এটা রিদম বললে মেনে নিতাম, রিদম এমন করতে পারে, কিন্তু আপনি এমন না। আমি গভীররাতে আপনার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আপনার স্পর্শ আমি চিনি, সেদিন তো কোন অন্য অনুভূতি হয়নি আমার, এখন হয়।

-ইপ্তি, আর একটাও কথা না, তুমি এক্ষন চলে যাও, আর কোনদিন আসবে না। বুঝতে পারছো!!
এতো বাজে ভাবে বললো শাফি ইপ্তির চোখে পানি চলে এলো। ইপ্তি উঠে বের হয়ে গেলো দ্রুত। মা কে খেয়ালই করলো না।

ইপ্তির মা মনে মনে শান্তি পেলেন, কোন অঘটন ঘটায়নি ছেলেটা। কয়েকদিন পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। আফরোজা আহমেদ আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলেন শাফি ঝিম দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।
তিনি চলে যেতে যেত পেছন ফিরে দেখলেন শাফি শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে ফেললো!

 

###

প্রায় মাসখানেক পরের কথা, ইপ্তি ব্যাংককের জন্য প্লেনে উঠেছে। একটু গন্ডগোল হয়ে গেছে, মামাম সারপ্রাইজ ট্যুর এরেঞ্জ করতে গিয়ে একটু ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছে। তিনটা টিকিট বুক করেছিলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আলাদা ফ্লাইটে টিকিট বুকিং হয়েছে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজে সকাল নয়টায় থাই ফ্লাইটে বুক হয়েছে একটা, ইপ্তি সেটায় যাচ্ছে। বাবা আর মামাম পরের ফ্লাইটে আসবেন।
এমন কখনো হয়নি আগে। তিনজন একই সাথে যায়, এবারে পুরো এলোমেলো অবস্থা। বাবা আলাদা যেতে পারতেন, কিন্তু তার একটা কি কাজ পড়ে গেলো ঘন্টাখানেক দেরী হবে পরে মামামই বললো, ইপ্তি আগে যাক, ও হোটেলে গিয়ে চেকইন করুক, আমরা পরের ফ্লাইটে যাই।

বিজনেস ক্লাসে জানালা ঘেষা সিট, ইপ্তি উঠতে উঠতে দেখে আগেই একজন এসে বসেছে। মাথায় ক্যাপ দিয়ে চোখ ঢেকে বসে আছে, এই লোক মনে হয় সবার আগে প্লেনে উঠেছে।

-এক্সকিউজ মি, একটু চেক করবেন প্লিজ! সিটটা বোধ-হয় আমার!

বিরক্তি নিয়ে ইপ্তি জিজ্ঞেস করলো। প্লেনে এমন হয় নাকি! আরেকজনের সিটে বসে আছে!

লোকটা ক্যাপ সরাতেই ইপ্তি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো, শাফি!!

-আপনি? ব্যাংকক যাচ্ছেন?

শাফি উত্তর না দিয়ে হাসলো! ইপ্তি তাকালোই না শাফির দিকে৷

-বসো, পাশের সিটটা ফাঁকাই আছে।

-ওকে! বসতে বসতে ইপ্তি বললো, কি অদ্ভুত, আপনার পাশেই আমার সিট পড়লো!!

-হুম, একটু অদ্ভুত!

-বাই দ্য ওয়ে, কেমন আছেন?

ইপ্তি স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলো।

-হ্যা ভালো আছি, বিয়ে করেছি!!

ইপ্তি চমকে উঠলো, বিয়ে করেছে! আচ্ছা, করবেই তো, বিয়ে তো ঠিকই ছিলো! ইপ্তি অনেক কষ্টে মনটা শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। কষ্ট লাগছে কেন, গলার কাছে কেমন শক্ত কিছু একটা আটকে আছে মনে হচ্ছে।
ওয়াশরুমে যাবে নাকি, কেমন একটা বমি পাচ্ছে, ফ্লাইং সিকনেস নেই ইপ্তির।

-ইপ্তি কোন সমস্যা?

-না কোন সমস্যা না! আপনার ওয়াইফ কই? তাকে নিয়ে যেতেন? নাকি কাজে যাচ্ছেন!!

-কাজে যাচ্ছি না, হানিমুন ট্রিপে যাচ্ছি! এই ট্রিপটা আমাকে আমার শ্বশুর সাহেব আর শ্বাশুড়ি মা, আমার মামণি, গিফট করেছে।

-হানিমুনে যাচ্ছেন তো ওয়াইফ কোথায়? সিট আলাদা হয়েছে? এই ফ্লাইটে কি সব গন্ডগোল হয়েছে নাকি!
ইপ্তি এদিক ওদিক তাকলো!

-এদিক ওদিক তাকিয়ে লাভ নেই ইপ্তি, আমার বউ আমার পাশেই আছে?

-হোয়াট? পাশে কই? দেখতে পাচ্ছি না তো, পাশে তো আমি বসে আছি!

-হ্যা, তাহলে আমার বউ তুমিই হওয়ার কথা, তাই না!!

শাফি কি মজা করছে, এসব কি হচ্ছে, শাফি তো এমন না!!

-আচ্ছা বুঝতে পারছি, ফান করছেন এতক্ষণ!

-আমাকে জোকার মনে হয় তোমার? আগে তো বলোনি!

-এটা কেমন জোকস হলো?

-মোটেই না, ওয়েট!!

শাফি একটা ফটোকপি করা কাগজ বের করে দিলো, বললো, দেখো, দেখে বলো!

ইপ্তির মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাবে। সব চাইতে বড় কথা এই কাগজে ইপ্তির সই আছে, গতকাল শুক্রবার ছিলো, বিকেলের দিকে বড় চাচা, মেজ মামা, খালু, ফুপা কয়েকজন বাসায় এসেছিল। বাবা ডেকে ইপ্তিকে সই করতে বললেন, বাবা বলেছে, ইপ্তি আর এতো কিছু দেখেনি, তিন চারটা সই দরকার ছিলো, করে দিয়েছে।

ইপ্তির হাত ধরে শাফি ঝাঁকুনি দিলো, এই পরী , কি হয়েছে? তুমি খুশী হওনি?

ইপ্তি হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলো!! সবাই মিলে প্ল্যান করে করেছে এসব, ইপ্তিকে কিছু জানায়নি!

শাফি বললো, আরে বোকা মেয়ে, কাঁদছে কেন! কান্না থামিয়ে একটা হাসি দাও তো, আর দুই মিনিটের মধ্যে ফোন সুইচ অফ করতে হবে, বাবা মামাম দেখছে তোমাকে। ইপ্তি হঠাৎ দেখলো শাফি একটা ভিডিও কল দিয়ে রেখেছে!!

-মামামকে কিছু বলো ইপ্তি, মামামই না সব প্ল্যান করলো, এই ট্রিপ, হুট করে কাবিন করে ফেলা সবটা মামাম সারাকে নিয়ে করেছে৷ ইপ্তি কাঁদতে কাঁদতেই মামামকে বললো, থ্যাঙ্কিউ মামাম।

আফরোজা আহমেদও চোখ মুছলেন।

তারপর শাফিকে জিজ্ঞেস করলো, মামাম বাবা আসছে না ট্যুরে?

-হ্যা, আসবে তো! পরের ফ্লাইটেই আসবে! আর এই ট্যুরটা যেমন তারা আমাদের গিফট করেছে, আমরাও মানে তুমি আর আমি তাদের ট্যুরটা গিফট করেছি! মামণি রাজী হচ্ছিলেন না, আমি অনেক বুঝিয়ে রাজী করেছি। তারা না থাকলে আমাদেরও ভালো লাগবে না।

-সারাকে নিয়ে আসতেন?

-সারাকে পরে একসময় নিয়ে আসবো।

ইপ্তির কাছে বিষয়গুলো দুই দুই চার হতে লাগলো, গত সপ্তাহে সারার সাথে দেখা হয়েছিলো, সারা তখনা মিষ্টি করে হেসে ইপ্তির গাল টিপে দিয়েছিলো, ইপ্তি একটু অবাকই হয়েছিলো, এমন কখনো করে না তো, আর ইপ্তি তো বাচ্চা না!

শাফি বললো, গত মাসে শাফি বাড়িতে যাওয়ার পর পরই ইপ্তির বাবা আর মামাম শাফির সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। শাফি প্রথমে ইতস্তত করেছিলো, তাছাড়া ইপ্তি একেবারেই জানে না, এটা কিভাবে হয়!পরে যদি ইপ্তি না বলে! ইপ্তির বাবা বলেছেন, ইপ্তিকে তিনি জানেন , তাই কোন সমস্যা হবে না।

প্লেন উড়ছে, ইপ্তি শক্ত করে শাফির হাত ধরে আছে।
কিছুক্ষণ পরে শাফি বললে, পরী তোমার জন্য ওই বইটা এনেছি!

কোনটা?

ওই যে তুমি পড়েছিলে, আমাদের বাড়িতে বসে, হৃদয়ের কাছাকাছি তুমি আমি!!

ইশ! কি বাজে বই! ওটা কেন এনেছেন?

না, মানে তুমি না বলেছিলে কি সব যেন শিখেছো, তাই আর কি নিয়ে এলাম!!

এই আপনি এতো বাজে কেন! আগে তো এমন ছিলেন না? সেদিন তো নিজেই টপিক পাল্টে ফেললেন!

আগে তো তোমার বর ছিলাম না!

ইপ্তি হাসছে, জানালা দিয়ে মেঘ ভেসে যাচ্ছে। মেঘের উপরে সূর্যের আলো পড়েছে, মনে হচ্ছে মেঘগুলো লাল রঙের। আকাশটা এমন রঙিণ হয়ে যায়, ঠিক বৃষ্টি নামার আগে!!

(শেষ)

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 8 comments