4

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৯

শাফির চোট ছিলো বেশ ভালো রকমের। স্থানীয় ডাক্তার বললেন, সম্ভবত ছোট একটা অপারেশন লাগবে, এখানে না করিয়ে খুলনা বা বরিশাল অথবা ঢাকায় করানো ভালো। সারা যেহেতু বেশ ভালো একটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জড়িত আছে তাই খুলনা বা বরিশালের কোন প্রশ্নই আসে না। শাফি একটু দুর্বল হয়ে গেছে৷ এভাবে রাত বিরেতে ও অনেক চলাফেরা করেছে কিন্তু শত্রু যেই হোক, সে যে শাফিকে মেরে ফেলতে পারে, এটা শাফি ভাবতেও পারেনি।
কেন যেন এই দুর্বল সময়ে ইপ্তির কথা মনে হচ্ছে, ইপ্তি কি খুব অভিমান করে আছে, শাফি ইপ্তির নম্বরটা ব্লকলিস্ট থেকে রিমুভ করে দিলো, এখন ইপ্তির ফোন সহজেই ঢুকবে।

শাফি কখনোই ইপ্তিকে হারাতে চায়নি, কিন্তু সেদিন শাফি ওদের বাসা থেকে বের হওয়ার পরে ইপ্তির মা ফোন করেছিলেন। তিনি অবশ্য খুব খারাপ কিছু বলেননি, বলেছেন, ইপ্তির বয়স অনেক কম, ওর আবেগ বেশি। তুমি তো এতো ছোট না ওর মতো। তুমি বুঝে বলোতো শাফি, ইপ্তি আর তোমার মধ্যে সম্পর্ক হলে কি সেটা ভালো হবে?

শাফি উত্তর দিতেই পারতো কিন্তু বেয়াদবি করাটা ওর ভালো মনে হয়নি। সত্যিই তো, ইপ্তির সাথে ওর কোন দিক দিয়ে মিল হয়! কিছুটা অভিমানও জমা হয়েছিলো।

ইপ্তি কি সেদিনের পরে আর ফোন করেছিলো? শাফি জানেনা, শাফি করেনি একবারও, এক একটা মুহুর্ত যে কতো লম্বা ছিলো, এখন অনেকটা কষ্ট প্রশমিত।

সারার হসপিটালে শাফি যেতে রাজী হলো না। কিছুতেই যাবে না৷ খুলনা গেলেই তো হয়, আবার ঢাকায় কেন!!

সারা বুঝিয়ে রাজী করলো, অনেক সময় নিয়ে বুঝালো।
তবে শাফি শর্ত দিলো, সারার ভাই যে ওখানে ট্রিটমেন্ট নিবে, এটা সারা কাউকে জানাবে না। সাধারন পেশেন্ট হিসেবেই শাফি যাবে।

সারা একটু অবাক হলো, এটা ঠিক যে, শাফির ওখানে ট্রিটমেন্টে টাকা কম লাগবে না, বরং বেশিই লাগবে কিন্তু সারার ভাই হিসেবে একটা এক্সট্রা কেয়ার সে পাবে, ভাইয়া সেটাই নিতে চায় না৷ হতে পারে, কোন অভিমান আছে, থাক, ভাইয়া রাজী হয়েছে এটা ভেবেই সারা খুশি হয়ে গেলো।

 

###
শাফি ঢাকায় এলো, হসপিটালের রুটিন কাজগুলো শেষ করে নিলো, হাড়ে অপারেশন এর পরে দু তিনদিন থাকতে হবে। কমও লাগতে পারে।
সারাকে বারবার বলে দিলো, সারা যেন কোন এক্সট্রা খাতির না করার চেষ্টা করে। আসল সমস্যাটা ইপ্তি, সারা কাউকে জানালে ইপ্তি জেনে যাবে, শাফির যতোই ইপ্তিকে মনে পড়ুক, সে আর চায় না ইপ্তির সামনে যেতে।

ইপ্তি কিছুই জানতো না৷ শাফিকে ওটিতে নেওয়া হলো যখন, ফোনটা সারার কাছে ছিলো।
ইপ্তির সেদিন খুব মন অস্থির লাগছিলো, কোনভাবেই নিজেকে থামাতে না পেরে ইপ্তি ফোন করে ফেললো শাফিকে।

ভাইয়ার ফোন ভাইব্রেট করছে দেখে সারা চেক করে দেখে স্ক্রীনে ইপ্তির ছবি, সেই সাথে “পরী” লিখে সেভ করা!!
সারা আকাশ থেকে পড়লো, ইপ্তি ভাইয়াকে ফোন করছে, আর “পরী” নামে সেভ করা, তার মানে কি, ইপ্তির সাথে ভাইয়ার যোগাযোগ আছে, তাহলে কই, ইপ্তি তো জানে না মনে হলো ভাইয়ার এক্সিডেন্টের বিষয়ে। সকালেও দেখা হয়েছে, ইপ্তি ওয়ার্ডে যাচ্ছিলো, সারাকে দেখে হাসলো, চোখে কোন প্রশ্নও ছিলো না। তেমন হলে অন্তত একবার জিজ্ঞেস তো করতো!!

ইপ্তির বিষয়ে অবশ্য মা বলেছিলেন। যে রাতে ইপ্তি আর সারা ছাদে ছিলো, সেদিন রাতে নাকি ইপ্তি ভাইয়ার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলো, ওদের বুয়া দেখে মাকে বলেছিলো বলেই মা রাতারাতি সারা আর ইপ্তিকে ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ।
যদিও সারা জানে ইপ্তি খুবই ভালো মেয়ে, বুয়া অবশ্যই রঙ চঙ মেখে মাকে বলেছে। যদি একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ও তাহলে সমস্যা কোথায় ছিলো, শুধু সারাকে কেউ কিছু বললো না!!

ইপ্তির ফোনটা সারা রিসিভ করে ফেললো, হ্যালো ইপ্তি, আমি সারা!!!

ইপ্তি খুব চমকে গেলো, সারা, তুমি? তোমার সাথে না সকালেই দেখা হলো? তুমি বাড়িতে? না ভাইয়া ঢাকায় এসেছেন?

-ইপ্তি, ভাইয়ার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, ও এখন ওটিতে আছে, আমাদের অর্থপেডিক ডিপার্টমেন্টে।

ইপ্তির নিজেকে অসহায় মনে হলো, এটা কিভাবে সম্ভব, আজই ওর এতো অস্থির লাগছিলো, মন মানছিলো না বলেই ফোনটা করে ফেলেছে।

-সারা, আমি আসছি।

-আচ্ছা , এসো।

ফোন রেখে সারা চেক করে দেখলো, ইপ্তির সাথে রিসেন্ট কোন কল হিস্ট্রি নেই, তাহলে!!
এবার সারা ইচ্ছে করেই ফোন গ্যালারি চেক করে ফেললো।
কিছু ফোল্ডার পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখা আছে, বুদ্ধিমতী সারা
“PORY” লিখে পাসওয়ার্ড ব্রেক করে ফেললো।
তাও ভালো ফিংগারপ্রিন্ট দেয়নি।

সরি ভাইয়া, আমাকে তোর ব্যক্তিগত বিষয়ে এভাবে দেখতে হলো, আসলে আমি চাই তুই খুব খুব ভালো থাক, কোন কষ্ট তোকে স্পর্শ না করুক, মনে মনে বলে ফোল্ডারটা দেখে সারা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। ইপ্তির সাথে ভাইয়ার অনেক অনেক ছবি, এবং ছবিগুলো ঢাকায় তোলা, দুই মাস আগে। তার মানে ভাইয়ার সাথে ইপ্তির একটা যোগাযোগ ছিলো, সেটা দু-মাস ধরে বন্ধ আছে বা এই ফোনে নেই। বন্ধ থাকাও অস্বাভাবিক নয় কারন ইপ্তি কিছুই জানতো না ভাইয়ার এই এক্সিডেন্ট বিষয়ে।

ইপ্তি একটু হন্তদন্ত হয়েই ঢুকলো। সারা অপেক্ষা করছিলো,
ইপ্তি জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে? সারা? সিরিয়াস কিছু?

-না, তেমন সিরিয়াস কিছু না, জানোই তো, আমাদের মার্কেট, ব্যবসা নিয়ে ওর কিছু শত্রু আছে, আর রিসেন্ট ও ইলেক্টেড হয়েছে মালিক সমিতিতে, তাই ওর উপর এ্যাটাক হয়েছিলো! হাত দিয়ে ঠেকিয়েছে, তাই হাত জখম হয়েছে।

ইপ্তি উত্তর দিলো না। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
সারা মনে হলো ইপ্তিকে কিছু জিজ্ঞেস করে কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মনের অবস্থা ভালো না, তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।

ওটি শেষে পোস্ট অপারেটিভে শিফট করে দেওয়া হলো শাফিকে। রাতে কেবিনে দিবে। ইপ্তি বললো, সারা আমি ফোন করবো তোমাকে, আমাকে প্লিজ কেবিন নম্বরটা জানিও। আর একটা কথা, আমি যে তোমার সাথে ছিলাম, এই কথাটা ওনাকে জানাবে না, প্লিজ!

সারা শুধু ঘাড় নাড়লো, ওদের সমস্যা পরে সমাধান করা যাবে, আপাতত দুজনের ইচ্ছেই পূরণ হোক।

ইপ্তি বাসায় ফিরে তিন চারদিন ডরমিটরিতে থাকতে হবে বলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আবার সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে এলো।

 

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ১০

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 4 comments