বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৮

 

শাফি চলে যাওয়ার পরে পথে দুবার ফোন করেছিলো ইপ্তিকে। কিন্তু তারপর থেকে সুইচড অফ বলছে। ইপ্তি অনেকবার চেষ্টা করলো কিন্তু রিচ করতে পারলো না। ইপ্তি একবার ভেবে নিলো হয়তো শাফির ফোনের চার্য শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পরদিন সকাল, সকাল গড়িয়ে দুপুর, বিকেল, শাফির ফোন অন হলেও পিক করলো না।

বিকেলের দিকে শাফি ফোন করলো।
-ইপ্তি, এতোবার ফোন করছিলে কেন?

-কেন মানে? আপনি পৌছে আমাকে জানাবেন না? আমার টেনশন হয় না?

-টেনশন করার কি আছে!

শাফির কণ্ঠ কেমন নিস্পৃহ, শীতল।

-সেটা আপনি বুঝবেন না, আমি আজ কোন কিছুতেই মন দিতে পারিনি!!

-মন দাও ইপ্তি, পাগলামি করো না। বেশ অনেকটা পাগলামি করে ফেলেছো আর আমিও না বুঝে তোমাকে অনেক প্রশ্রয় দিয়েছি।

-প্রশ্রয় দিয়েছি মানে কি!! আপনার কথা এমন কেন লাগছে, কেন মনে হচ্ছে কথায় কোন প্রাণ নেই!

-কথারও প্রাণ থাকে নাকি!!

ইপ্তি বুঝতে পারলো না কি হয়েছে। শাফির কথা বাবার কাছে বলতে অনেক বেশি প্রেশার নিয়েছে ইপ্তি, বাবা ইপ্তির সব কথা শোনে, তার মানে এটা নয় যে শাফিকে মেনে নিবেন। তবুও বাবা মেনে নিয়েছেন এক কথায়ই বলতে গেলে, এতোটা আশা করেনি ইপ্তি।
এখন শাফির কণ্ঠ শুনে কেমন নিস্পৃহ শীতল মনে হচ্ছে কেন, কি সমস্যা, সমস্যাটা কোথায় আসলে।

-আপনি প্লিজ বলুন কি হয়েছে?

-ইপ্তি, তোমাকে একটা কথা বলি, আমি বিয়ের কথা হবার পরে অনেক ভেবেছি, তোমার আর আমার দূরত্ব অনেক, সেটা তুমি এখন বুঝতে পারছো না। বুঝবে যখন আমরা একসাথে থাকবো। তুমি আবেগে অন্ধ হয়ে আছো। তাই কোন অসামাঞ্জস্যতা তোমার চোখে পড়ছে না।
আমি ঠিক করেছি, এই সম্পর্কটা আর টানবো না! এটা শেষ করি, জীবনটা ছেলেখেলা নয় ইপ্তি, যে আবেগের ভেসে ভেসে পাড় করে দেওয়া যাবে!!

ইপ্তি বুদ্ধিমতী মেয়ে, বুঝতে পারলো কোথাও একটা সমস্যা নিশ্চয়ই হয়েছে। তাই শীতল গলায় বললো, এটা বাবার সাথে দেখা করার আগে বুঝলে ভালো হতো। আমি বাবার কাছে কতো ছোট হয়ে গেলাম, তাই না!!

-না, এখনো কিছুই হওনি, কিন্তু যখন তোমার আমার সাথে বিয়ে হবে, তুমি শুধু তোমার বাবা না, তোমার বন্ধু, আত্মীয় সবার কাছে ছোট হয়ে যাবে।

-আচ্ছা!! তাই বুঝি?

-ইপ্তি তুমি আর আমাকে ফোন করবে না। আর তোমার সাথে আমার এতোদিন যতোটুকু কথা হয়েছে, এটা মাথা থেকে মুছে ফেলবে। সারাকে আমাদের বিষয়ে কোন কথা জানাবে না।

-আপনি কি মনে করছেন, আপনি খুব মুডি এটিচুড করছেন বলে আমি ভেঙে যাবো? সবার কাছে কান্নাকাটি শুরু করবো? সারার কাছে বিচার দিয়ে দিবো!! কক্ষনোই না। আমি কখনোই এমন করবো না। ভালো থাকুন, রাখছি!!

ইপ্তি ফোন কেটে দিলো। শাফি ফোন রেখে মনে মনে বললো, একবার ভালোবাসি বলে ফোনটা রাখতে পরী ! কষ্টটা একটু কম হতো। সবাই তো সবকিছু পায় না!!

ফোন রেখে ইপ্তি কান্নায় ভেঙে পড়লো। কি এমন হয়েছে, নিশ্চয়ই আন্টি রাজী হয়নি, সেটা সরাসরি বললে পারতো, এতো এটিচুড দেখালো কেন!! এই শাফিকে তো ইপ্তি চেনে না!! ইপ্তি যাকে ভালোবাসে, সে সারাক্ষণ ইপ্তিকে “পরী পরী” বলে আদর মাখা কণ্ঠে কথা বলে, সেটা এই শাফি না! অন্য কেউ!! ইপ্তির মনে হলো কোন সমস্যা হয়েছে, সেটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু না, এই সমস্যা আর শেষ হলো না। ইপ্তির নম্বরটা শাফি ব্লক করে দিলো।
সেই সাথে যোগাযোগ করার সকল মাধ্যম অফ করে দিলো।

ইপ্তির বাবা মা এই বিষয়ে কোন কথা বললেন না। বরং কিছুটা বুঝে নিয়ে, ইপ্তিকে নিয়ে দিল্লী, জয়সলমীর ঘুরে এলেন। ইপ্তি যাতে নিজেকে সামলে নিতে পারে। বিষয়টা কাজও করলো, ইপ্তি অনেকটা সামলে নিয়ে নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিলো।
শুধু একটাই প্রশ্ন মনে, শাফি কেন এমনটা করলো, রাতারাতি কি এমন হলো যে বাবার সাথে কথা বলে যাওয়ার পরেও ইপ্তির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো!!

 

###

দুজনের দুটো আলাদা জীবন শুরু হলো৷ হ্যা, এই জীবনটা ওদের আগেও ছিলো, মাঝের দেড় মাসে দুজন খুব কাছাকাছি এসেছিলো, কিন্তু শাফি কোন অজানা কারণে সম্পর্কটা আর টানতে চাইলো না। ইপ্তির খুব কষ্ট হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো পায়ের নিচের পৃথিবীটা নাই হয়ে গেছে। তীব্র কষ্ট একসময় অভ্যস্ততা হয়ে যায়, রাগ হয়না শাফির উপর, শুধু খুব জানতে মন চায়, কেন এতদূর এসেও শাফি ইপ্তিকে ফিরিয়ে দিলো। ও কি এতোই খারাপ, নাকি শাফির ওকে ভালো লাগেনি কখনো, খুব অপমান বোধে ইপ্তি আর একবারও ফোন করার চেষ্টা করেনি।

শাফির দিনগুলো কাটে ব্যস্ততায়। মার্কেট মালিক সমিতির নির্বাচনে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছে ছিলো না ওর, কিন্তু ইপ্তি মাথায় এতো বেশি ঢুকে আছে, ওকে বের করার জন্যই শাফি সক্রিয়ভাবে এই পলিটিক্সে ঢুকে পড়ে, এ বিষয়টা একদমই ভালো হলো না ওর জন্য। শত্রু বেড়ে গেলো, এমনিতে ওর শত্রুর অভাব নেই। ওর বাবারও শত্রু ছিলো, সেই শত্রুতার জের ধরে অনেক বছর আগে রহস্যজনক ভাবে ওর বাবা মারা যায়। যে রাতে বাবা মারা গিয়েছিলেন, সেই রাতে বানী কাকার বাড়িতে বাবার দাওয়াত ছিলো, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে তিনিও নিমন্ত্রিত ছিলেন, না জানি কোন খাবারের বিষক্রিয়ায় শেষরাতে তিনি মারা যান। শাফির বয়স কম ছিলো বলে বিষয়টা চাপা পড়ে গেছে।

আজকাল নিজের জীবন নিয়ে শাফি খুব একটা ভাবে না। সিগারেট খাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে প্রচন্ড পরিমাণে। ল্যাপটপ অন করলে ইপ্তির শাড়ি পরা ছবিগুলো সামনে চলে আসে, ডিলিট করতে গিয়েও করতে পারেনা। কি অদ্ভুত মায়ায় মেয়েটা জড়িয়েছিলো ওকে। ধরে রাখতে পারলো না। রাখা তো সম্ভবও না,কারণ ইপ্তি তো বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। শাফি ওকে ধরে রাখতে চাইলে বাবা মায়ের কোল ফাঁকা করে চলে আসতে চাইতে ইপ্তি। কি দরকার, ইপ্তি কোন সুপ্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত জীবন সাথী পাক, এটাই শাফি কামনা করে। ভালোবাসা তো মানুষকে স্বার্থপর করে না, মনটাও বড় করে দেয়। মাঝে মাঝে এসব ভালোমানুষি ছেড়ে ছুঁড়ে ইচ্ছে করে ইপ্তির কাছে একটু যায়, ইপ্তি আবার আগের মতো পাগলামি করে শাফিকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিক।

ইপ্তি ব্যস্ত হয়ে যায় নিজের পড়াশোনা নিয়ে। রিদমের সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখা হয়, কিন্তু ইপ্তি আর অন্যকিছু ভাবতে পারে না৷ রিদম সুন্দর, হ্যান্ডসাম কিন্তু শাফির মতো না৷ শাফির মধ্যে কি যেন একটা আলাদা খুঁজে পেতো ইপ্তি, শাফির মধ্যে একটা মাদকতা ছিলো, শাফির শান্ত দৃষ্টি অনেক গভীর, অনেক কথা ইপ্তি না বললেও বুঝে যেতো, খুব ইচ্ছে হতো শান্ত চোখের শাফির দৃষ্টিতে একদিন বুনো ভাব দেখতে, কিন্তু দেখা হলো না। কল্পনায় শাফিকে নিয়ে যে আঁকিবুঁকি চলতো, সেটা যেনো কোন দস্যি ছেলে জোর করে ছিড়ে দিয়ে চলে গেছে। শাফিকে মনে করতে চায়না ইপ্তি কিন্তু ভুলতেও পারে না।

দু’মাস পেরিয়ে গেলো। সেদিন রাতে শাফি বাড়ি ফিরছিলো। একটু বেশি রাতই হয়ে গেছে। কয়েক কদম হাঁটার পরে মনে হলো কেই ওর পিছু নিয়েছে। কয়েকবার পেছন ফিরেও কাউকে দেখতে পেলো না। তিন রাস্তার মাথায় শাফির উপর এ্যাটাক হলো। কালো কাপড় মুখে দিয়ে কেই শাফির মাথায় আঘাত করতে এলো, শাফি ডানহাত দিয়ে বাঁধা দেওয়ায় হাতে প্রচন্ড আঘাত পেলো। তখনি উল্টো দিক থেকে দুজন হেঁটে আসছিলো, লোকজন টের পেয়ে আততায়ী ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে গেলো।
কিন্তু শাফির হাতে মারাত্মক চোট লাগলো।

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments