4

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৬

 

সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেলো শাফির। আজান শুনেই ওঠে শাফি, কিন্তু ইপ্তি ফোন করেনি। ফোন করবে কি, কয়েকদিন ঘুরে ইপ্তি ঘুমিয়ে কাঁদা, অবচেতন মনও জাগাতে পারেনি৷ নামাজের পরে কিছুক্ষণ ছাদে হাঁটলো শাফি।

ইপ্তি বোধহয় উঠতে পারেনি। মাঝে মাঝে শাফির সত্যিই খুব একা লাগে৷ এসব ব্যবসা, কাজ কারবার ফেলে দূরে কোথাও চলে যেতে৷ আজ খুব উদাস লাগছে, ইপ্তি ফোন করেনি তাই এমন হচ্ছে? আচ্ছা ইপ্তি তো ওকে ফোন করতে বাধ্য না, করেনি হয়তো ভুলে গেছে, হয়তো উঠতে পারেনি। মাথা থেকে ইপ্তিকে সরাতে কি করা যেতে পারে! কোন উপায় কি নেই? বিয়েটা করে ফেলবে? অনেক অনেক চিন্তা করতে করতে শাফি পায়চারী করছিলো।

ইপ্তির ঘুম ভাঙলো সাতটার পরে, নয়টায় ক্লাশ, একছুটে উঠে রেডি হয়ে নাস্তা বক্সে ভরেই বের হয়ে গেলো। পৌছাতেও দেড় ঘন্টা লাগবে। শাফিকে ফোন করতে হবে, মনে পড়লো গাড়িতে উঠে, এখন তো কথা বলা যাবে না, ড্রাইভার চাচা শুনে ফেলবে, বাবাকে বলে দেয় যদি! না বললেও অস্বস্তি লাগছে। ইপ্তি একটা টেক্সট করে দিলো, সরি লিখে।

ইপ্তির টেক্সটটা পেয়ে শাফির মনে হলো কোথাও মেঘ ভেঙে রোদ উঠেছে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটে ওঠে, এটাই কি তাহলে প্রেম?
শাফি বাসা থেকে বের হয়ে ইপ্তিকে ফোনটা করলো।

-পরীর কি ঘুম ভাঙতে দেরী হলো?

-হ্যা, একটু?

-কি করছো এখন?

-ক্লাশে যাচ্ছি।

হু হা করে উত্তর দেওয়ায় শাফি বুঝতে পারলো কোন সমস্যা। তাই ফেন রেখে দিলো। ইপ্তি টেক্সট করলো, “ড্রাইভার চাচা আছেন পাশে।”
“ওকে, পরে কথা বলছি তাহলে”
“টেক্সট করা যাবে”
” আচ্ছা, তাই!”
“কি করছেন?”
“সুপুরির হাটে যাই”
” সো ইন্টারেস্টিং”
“না, ওতোটাও নয়”
“আমাকে নিয়ে যাবেন একবার?”
“আবার আসবে?”
“আপনার বিয়েতে আসবো!”

এটা দেখে শাফি মনে মনে বললো, ধূর শালা, কি মাইয়া দেখা হইলো, ঘুইরা ফিরা সেই খাঁজকাটায় যাইয়া থামে!!

কিন্তু টেক্সট করলো, ওকে, এসো।

পরের টেক্সটটাই লিখলো, তুমি না আসলে তো বিয়েটাই হবে না!!

এটা দেখে ইপ্তি একটু ইতস্তত বোধ করলো, ইপ্তি পৌছে গিয়েছে বলে কথা শেষ করলো। তবে ইপ্তির ক্লাশ আর শাফির কাজের ফাঁকে টুক টাক কথা সারাদিনই বলা হলো। ইপ্তির মনে হলো শাফি পাশেই আছে, শাফির একই রকম অনুভূতি।
প্রচন্ড ম্যাচিউরড শাফির ইমম্যাচিউরড আচরণ করতে ইচ্ছে করতে লাগলো, ইপ্তিকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করতে লাগলো, কোনভাবেই মনটাকে বশে আনতে পারলো না। অদৃশ্য কোন শক্তি বারবার টেক্সট সীন আর উত্তরের অপেক্ষা করাতে লাগলো।

সারার দিকে তাকাতেই ইপ্তির লজ্জা লাগতে শুরু করলো, ছি ছি, ওর সাথে ওর বাড়ি গেলো, এখন ওকে লুকিয়ে ওর ভাইয়ার সাথে গল্প করছে। কিন্তু শাফি না করেছে ওকে বলতে। বারোটার পরে একটা ব্রেক পেয়ে ইপ্তি ফেন করলো৷ শাফি ধরতে পারলো না। তখন প্রচন্ড ব্যস্ত। মিনিট বিশেক পরে ব্যাক করলো। তখন ব্রেক শেষ ইপ্তির। ইপ্তি বললো, ব্রেক তো শেষ, এখন রাখছি।

-রাগ করলে নাকি?

– না রাগ করবো কেন, আপনার অনেক কাজ, প্রায়োরিটির লিস্ট বেশ লম্বা!

-হুম, তবে মনে করবে কি, পরীর ফেন তখনি ধরা হবে না যখন আমি ব্যস্ত থাকবো। বুঝলে?

অজানা ভালো লাগায় ইপ্তি হারিয়ে যেতে লাগলো। সেই সাথে একটা বিষয় মনে হলো, শাফি কয়েকদিন পরে বিয়ে করবে, তাই এতো কথা বলা হয়তো ভালো দেখায় না, তার ওপর ও শাফিকে বলেছে, ওর বিএফ নেই, কোন ভাবে শাফিকে একটা বিএফ এর কথা বললে শাফি ইপ্তিকে খারাপ ভাববে না৷ নয়তো ভাববে কেমন মেয়েরে বাবা, এতো গায়ে পরা! বয়ফ্রেন্ড এর গল্প করলে সহজ ভাবে কথা বলা যাবে, রেডিমেড বয়ফ্রেন্ড এখন কোথায় পাওয়া যাবে!!

 

###

রেডিমেড বয়ফ্রেন্ডের জন্য ইপ্তির বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। রাপা প্লাজায় গিয়েছিলো একটা কাজ, হঠাৎই রিদমের সাথে দেখা হয়ে গেলো। রিদম ইপ্তির সাথে কোচিং করেছিলো, ভালো একটা বন্ধুত্ব ছিলো, পরে সে একটা শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যায়, সিএসই তে। হালকা হাই হ্যালো হলেও যোগাযোগ ছিলো না।

-ইপ্তি, কেমন আছো?
চমকে ইপ্তি তাকিয়ে দেখলো রিদম। এক দুই কথায় বেশ কতক্ষণ আড্ডা জমে গেলো। রিদম বেশ অভিজাত পরিবারের ছেলে, বাবার নিজেরই শপিংমল, ব্যবসা আছে। নিজেই দুটো গাড়ি ইউজ করে, ঝকঝকে চেহারা, সোজা সাপ্টা কথাবার্তা, উদ্ধত আর বেশ খানিকটা অহংকারী। ইপ্তির সারল্য রিদমকে খুব টানে।

কফিশপে বসে গল্প করতে করতে রিদম প্রথমদিনই ইংরেজিতে একটা লম্বা বানী দিয়ে ফেললো যার সারমর্ম দাঁড়ায়,ইপ্তি আমি তোমার জন্য অন্যকিছু অনুভব করছি, যেটা বর্ননা করা সম্ভব নয়, তুমি যদি রাজী থাকো, আমরা কিছুদিন একে অন্যকে আরো গভীরভাবে জানতে পারি, পরে যদি মনে হয়, আমরা একে অপরের জন্য তারপর আরো বিস্তারিত ভেবে নিবো।

ইপ্তির মনে হলো, আইডিয়া খারাপ না, এই অন্যকিছু অনুভব সে শাফির জন্য করছে, কিন্তু শাফিকে সেটা বলতে পারবে না। আর শাফি অন্য একজনের বাগদত্ত পুরুষ। শফির জন্য কোন অনুভূতি আসা অন্যায় কিন্তু ইপ্তি নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না। যতোবারই শাফি ফোন করে বা টেক্সট করে, একটা অদ্ভুত ভালোলাগায় মনটা বিষন্ন হয়। রিদম কি এই কষ্টটা ভোলাতে পারবে!!!

ইপ্তি কিন্তু সময় নিলো না। রিদমকে একটা গ্রীন সিগন্যাল দিয়েই দিলো।

সে রাতে অনেকক্ষণ চ্যাটিং হলো হোয়াটসঅ্যাপে রিদমের সাথে। বেশিরভাগই রিদমের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে। ইপ্তির একঘেয়ে লাগছিলো, শাফির মতো কেন না। শাফি অল্প দুয়েকটা কথা বলছিলো, সেটাই শুনতে ভালো লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো আরো অনেক কথা বলি।

শাফির একটা অভ্যাস হয়ে গেছে, বাড়িতে ফিরে ইপ্তির সাথে আগে কিছুক্ষণ কথা বলে নেয়৷ কিভাবে ওকে বলা যাবে, বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে, সেটা নিয়েও ভেবেছে, কিন্তু কোন কূলকিনারা করতে পারেনি।

আজরাতে ফোন করে কল ওয়েটিং পেলো শাফি। এতো রাতে ইপ্তি কার সাথে কথা বলছে, এমন তো কখনো হয় না, ওর কোন সমস্যা হলো না তো, ইপ্তির কোন ভাইবোন নেই, বাবা বা মা কেউ অসুস্থ হলেও তার জন্য ইপ্তির একাই ছুটতে হবে।

শাফির ফোন দেখে ইপ্তির কেমন অস্থিরতা লাগলো। রিদম তখন মাত্র “ইনসেপশন” মুভিটা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে!

-ইয়ে মানে রিদম আমার একটা ফোন এসেছে, একটু রাখতে হবে।

-ফোন মানে, এতো রাতে? খুব ইম্পর্টেন্ট?

-হ্যা!

-দেশের বাইরের কেউ নিশ্চয়ই!!

ইপ্তি উত্তর না দিয়ে বললো, আচ্ছা এখন রাখছি তাহলে?

-কাল দেখা হচ্ছে?

-কাল তো আমার ফিরতে ফিরতে অনেক দেরী হয়ে যাবে!

-তুমি চাইলে আমি তোমাকে কলেজ থেকে পিক করতে পারি?

ইপ্তি অধৈর্য্য ভাবে বললো, আচ্ছা দেখি, জানাবো তোমাকে।

শাফির ফোনটা পিক করতেই, শাফি জিজ্ঞেস করলো, কোন সমস্যা ইপ্তি? এতো রাতে ফোন ওয়েটিং?

-না না কোন সমস্যা নয়, এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম।

-ওহ আচ্ছা, আসলে এতো রাতে ফোন বিজি পেয়ে খুব টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম।

-না, টেনশনের কিছু নেই। সব ঠিক আছে।

প্রতিদিনের ভয়েস আর আজকের ভয়েস এক নয় ইপ্তির।

-ইপ্তি কোন সমস্যা? মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলতে চাও?

-না না, তেমন কিছু নয়। আপনি বোধহয় ক্লান্ত, ডিনার করে ঘুমিয়ে যাওয়া দরকার।

ইপ্তি ফোন রাখতে চাইছে, শাফি কথা বাড়ালো না। ফোন রাখার পরে ইপ্তির মনটা খারাপ হয়ে গেলো, কেন এতো তাড়াহুড়ো করলো ইপ্তি, আরেকটু কথা বললে কি হতো!! রিদমকে ইপ্তি ভালোবাসে না, ভালোবাসতে পারবেও না। হয়ত ওর সাথে বিয়ে করলে একসময় অভ্যস্ততা হয়ে যাবে, শাফির জায়গাটা মনে হয় একটু অন্যরকম। গলার কাছে একটা অস্বস্তি জমা হয়ে আছে, ইপ্তির কিছুতেই ঘুম আসে না। একটা, দুইটা, ধীরে ধীরে তিনটা বাজে।

তিনটা বাজে দেখে শাফিকে একটা ফোন করে ফেলে। শাফির মন খারাপ হলেও সেটা বুঝতে দেয়নি বা পাত্তা দেয়নি শাফি। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।

এতো রাতে ইপ্তি, ইপ্তির কি সমস্যা হয়েছে? মেয়েটা বলতে পারছে না, শাফির খুব মায়া লাগছে, ইপ্তির কি কাউকে পাশে প্রয়োজন, এজন্য ওকে ফোন করছে!!

শাফি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে “হ্যালো” বললো, ইপ্তির মনে হলো শাফিকে এই মুহুর্তে জড়িয়ে ধরা গেলে মনটা শান্ত হতো।
মনের বিপরীতে কিছু করা বড় কষ্ট।

এই তো রিদম বলছিলো, ওর ওয়েস্টার্ন গেটআপ খুব পছন্দ, বাঙালি থ্রিপিসে মেয়েদের ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে, কুর্তি পর্যন্ত ওকে, সেটা স্লিভলেস হলে আরো আকর্ষণীয় হয়।
ইপ্তি পোশাকে যথেষ্ট আধুনিক হলেও আধুনিকতার মানে নিজেকে আবেদনময়ী করে তোলা এটা বিশ্বাস করেনা।

ইপ্তি যখন বললো, বাঙালি পোশাক ওর পছন্দ, শাড়ি বা অন্য কিছু, রিদম বললো, দু এক দিন ঠিক আছে, নট অলওয়েজ!!

অন্য কোন কথা বলে ইপ্তি আগ্রহ পায়নি। মনে হচ্ছিলো রিদম ওর জন্য না। শুধু শুধুই সময় নষ্ট, তবু মন অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা।

ইপ্তি শাফিকে কোন উত্তর দিলো না। শাফি না বলা কথায়ও অনেক কিছু বুঝে নিলো।

ইপ্তি, বলো কি হয়েছে? ইপ্তি কোন কথা না বলে ফোন রেখে দিলো।

তারপর টেক্সট করলো, আপনি কি একটু আমার সাথে দেখা করবেন??

টেক্সট দেখে শাফি রিপ্লাই করলো, কাল আসছি আমি।

 

বৃষ্টি নামার আগে – পর্ব ৭

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 4 comments