7

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৫

 

দূর থেকে সারার মনে হলো, ওরা একটা চমৎকার সময় কাটাচ্ছে, শুধু শুধু ওদের বিরক্ত করা কি দরকার!! ভাইয়া ইপ্তিকে অন্য চোখে দেখছে, এটা কোনভাবে মা বুঝতে পেরেই আমাদের আজ রাতেই ঢাকা পাঠাতে চাইছে। কারন ভাইয়ার বিয়ের কথা হয়ে গেছে। এখন মেয়েকে সোনার চেইন দিয়ে সেই বিয়ে ভাঙা বিষয়টা এতোটাও সহজ না। অথচ ভাইয়া ইপ্তিকে….

সেই ভাইয়া, যে কখনো কোন কিছু নিয়ে আবদার করে না! যার কোন নিজের চাওয়া নেই, সে যদি ইপ্তিকে চায়, সারা কিভাবে ম্যানেজ করবে। ইপ্তি কি বুঝতে পারছে, ভাইয়া ওকে অন্যরকম ভাবছে, একটা ছেলে কোন মুহুর্তে একটা মেয়েকে এভাবে যত্ন করে আলতা পরাতে বসতে পারে, সেটা বোঝার গভীরতা কি ইপ্তির আছে? ভাইয়া কখনো কারো ছবি তুলে দেয় না, সে ইপ্তিকে ছবি তুলে দিচ্ছে!!

হয়তো চলে যাওয়াই ভালো, এখানে থাকলে মায়া আরো বাড়বে। সারা দরজার পাশে সরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ইপ্তি আর শাফিকে। নয় বছরের ব্যবধান ইপ্তির সাথে, অথচ দেখতে কি মিষ্টি লাগছে, মনে হচ্ছে ইপ্তির জন্যই বড় ভাইয়া একদম পারফেক্ট।

আলতা দেওয়া শেষ হলে শাফি আবার ছবি তুলে দিলো।

-সারা তো এলো না কি করছে এতক্ষণ!!

-কথা শেষ হয়নি বোধহয়।

-তোমাকে খুব ভালো লাগছে আলতা পায়ে।

-থ্যাংকস, কিন্তু আপনার জিন্সে আলতা লেগে গেছে, দেখেছেন?

শাফি তাকিয়ে হাসলো, লাগুক, সমস্যা নেই।

ইপ্তি বললো, আপনি চমৎকার একজন মানুষ, আপনার সাথে সময়টা খুব ভালো কাটলো।

শাফি মনে মনে বললো, এতো ফর্মাল!! অবশ্য ফর্মাল হওয়ারই কথা। ইনফর্মাল কিছুই হয়নি। তাই শুধু একটু হাসলো।

-আমি কি আপনার ফোন নম্বরটা পেতে পারি?
ভয় নেই, আমি বিরক্ত করবো না, মাঝে মাঝে যোগাযোগ রাখার জন্য!!

-আমি কি বলেছি তুমি আমাকে বিরক্ত করবে, পরীরা একটু আধটু বিরক্ত করলেও কিছু হয় না!!

ইপ্তি বললো, আপনি কেন আমাকে ভুত বলছেন বার বার!!-ইপ্তি কপট রাগের ভাব করলো।

ভুত বলছি না, পরী বলছি।

বিষয়টা আমার পছন্দ হচ্ছে না, আমার আপনাকে গ্রীক মিথোলজির যোদ্ধার মতো মনে হচ্ছে, আর আপনি আমাকে জ্বীন পরী বলছেন!!

শাফি ভীষণ অবাক হয়ে গেলো, ইপ্তি সত্যি ওকে নিয়ে এভাবে ভেবেছে!!তারপর হাসতে হাসতে ইপ্তির পাশে বসে বললো, বুদ্ধু জ্বীন বলিনি, পরী বলেছি, পরী মানে কি জানো, বাংলাদেশী মিথে পরী হলো আকাশ থেকে নেমে আসা ব্লেসিং। এঞ্জেল অফ লাভ!! যার জাদুতে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়!! আর সবার কল্পনায় পরী ভীষণ সুন্দরী, আদুরে, তোমার মতো।

ইপ্তিকে এতো সুন্দর করে কোন ছেলে আগে কিছু বলেনি, বলেনি নাকি ইপ্তির মনে হয়নি!! শাফিকে এতো ভালো লাগছে, এই মানুষটা বিয়ে করে ফেলবে, ওই পর্ণ বই পছন্দ করা মেয়েটাকে! হাউ লাকি সি ইজ!!
ইপ্তির অদ্ভুত কারনে মন খারাপ লাগতে লাগলো। কিন্তু এটা বুঝতে দিলে চলবে না। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বললো, আপনি ঢাকায় আসেন না?

-হ্যা যাই তো, ১৫/২০ দিন পর পরই যাই!

-গুড, এরপর যখনি যাবেন, আমাদের বাসায় আসবেন।
আমার বাসা ধানমণ্ডিতে, প্লাজা এ আর এর পেছনেই।

-আচ্ছা, আমি অবশ্য ইসলামপুরে যাই। দোকানের প্রোডাক্ট আনতে যাই, এক রাতে গিয়ে পরের বিকেলের বাসে ব্যাক করি।

-এবার সময় নিয়ে যাবেন একবার।

-আচ্ছা ঠিক আছে যাবো। তোমার ছবি দেখবে না? পেন ড্রাইভ আছে সাথে? তাহলে আমি দিয়ে দিই? অবশ্য একটু এডিটিং করলে ভালো হতো।

-থাক এখন দেখবো না, আপনি এরপরে যখন ঢাকায় আসবেন, নিয়ে আসবেন প্লিজ।

-ওকে৷ পরীর কথা তো শুনতেই হবে!

দূর থেকে সারা শুনতে পাচ্ছিলো না, শুধু দেখছিলো দুজন গল্প করছে। নিচ থেকে মা ডাকছে, ভাইয়া এখনো দোকানে যায়নি, ইপ্তিকে নিয়ে বসে গল্প করছে, এটা দেখলে আবার কি না কি বলবে কে জানে, এখম ঢোকা দরকার।
তাই সারা ঢুকে পড়লো ছাদে।

সারাকে দেখে শাফি উঠলো।

-আমি সন্ধ্যার পরে এসে তোদের নিয়ে যাবো। রেডি হয়ে থাকিস।

-আচ্ছা ভাইয়া।

শাফি চলে গেলো। সারা আর ইপ্তি দুজন সবকিছু গুছিয়ে নিলো।

বাসে তুলে দিতে শাফি ওদের নিয়ে গেলো স্ট্যান্ডে। একটু বিষণ্ন লাগছে, ইপ্তি ফোন নম্বর নিয়েছে, শাফিও নিয়েছে। কিন্তু আদৌ কি ফোন করবে, হয়ত বাসে চলতে শুরু করলে এই সময়টা পেছনে পরে থাকবে।
শাফি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। ইপ্তির ঠিক অতোটা খারাপ লাগছিলো না, তবে শাফির জন্য কেমন একটা অনুভূতি, এটা বোঝানো যায় না, প্রকাশও করা যায় না।

বাসে ওঠার পরে শাফি জানালার পাশে দাঁড়ালো। ইপ্তির কেমন যেন চাপা কষ্ট হচ্ছে। তবুও হাসার চেষ্টা করলো। এক সময়ে বাসটা ছেড়েই দিলো। চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত শাফি দৃষ্টি সরালো না। এই মুহূর্তে কষ্ট অনুভূতিটা প্রশমিত। শাফি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। রাতে বাড়িতে গিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবে খাওয়া শেষ করলো। শাফির মা খুবই নরমাল আছেন এখন। শাফির মতিগতি তার ভালো লাগছিলো না।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শাফি উঁকি দিলো মায়ের ঘরে। ফুপুআম্মাও আছে, শাফি দ্রুত ঢুকে শক্ত গলায় ভণিতা ছাড়াই বললো, ইশিতাদের বাড়িতে জানিয়ে দাও আমি এখন বিয়ে করবো না!!

 

####

সারা ইপ্তি পৌছে গেলো ভালোভাবে। ইপ্তি প্রথমে সারার সাথে ডরমিটরিতে গেলো, ঘন্টাখানেক বাদে মামাম গাড়ি নিয়ে ইপ্তিকে নিয়ে গেলেন।

শাফির মনটা একটু অস্থির লাগছিলো। ছাদের ঘরে গিয়ে একটা ছোট পাঞ্চ ক্লিপ পেলো বিছানায়। সহসা মনে পড়লো ইপ্তি গতকাল বিকেলে চুল থেকে খুলে রেখেছিলো। ক্লিপটা নিয়ে এসে হাতের মুঠোয় পুরে কিছুক্ষণ বসে থাকলো শাফি। ইপ্তি কি ওকে আর ফোন করবে, মনে হয় না। দিন কাটতে না কাটতেই ইপ্তি সবকিছু ভুলে যাবে।

শাফি বিয়েটা না করে দিয়েছে ঠিক ইপ্তির কথা ভেবে না। শাফি এতো হাওয়ায় ভাসা চিন্তা করে না। ওর মনে হয়েছে, ইশিতা আসলে ওর সাথে এডজাস্ট করতে পারবে না। তার মানেই যে ইপ্তিকে বিয়ে করা যাবে, এমন না৷ ইপ্তি অন্য পরিবেশে বড় হয়েছে, শাফির হয়তো শিক্ষিত, অবস্থা ভালো বা প্রতিষ্ঠিত কিন্তু ইপ্তির পরিবার ওকে কোনভাবেই একসেপ্ট করবে না। যদি করে তাহলে সেটা ব্যতিক্রম বিষয় হবে। হবু ডাক্তার, পুতুলের মতো ফুটফুটে একটা মেয়ে যে বড় হয়েছে ঢাকায় এবং যথেষ্ট অভিজাত পরিবারের, তাকে মফস্বল শহরের সাইডে গ্রামে কাপড়ের দোকান আর সুপুরি ব্যবসায়ী ছেলের সাথে বিয়ে দিতে কোন বাবা মা চাইবে না।ইপ্তি নিজেও চাইবে না। ইপ্তির হয়তো এই বেড়াতে আসা সময়টা শাফির জন্য ভালো কেটেছে। এর বেশি কিছু না।

শাফি মাথা থেকে সরাতে চেষ্টা করে। দুটো প্রাকটিকাল সমস্যা সামনে, মা চায় শুভকে মার্কেটের একটা ফ্লোর লিখিয়ে দিতে, কিন্তু শুভ উড়নচণ্ডী ধরণের। সম্পত্তি রক্ষা করার মতো বুদ্ধি, ম্যাচিউরিটি এখনো হয়নি।

আর বানীকাকা, আব্বার পার্টনার ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, শাফি পড়া ছেড়ে আসবে না, সব কিছু হাতের মুঠোয় নিয়ে নিবেন। সাথে বাবার প্রতিনিধি হিসেবে মায়ের ভাই কুদ্দুস মামাকে নিয়ে নিবেন।

শাফি মেডিকেলের পড়াশোনা ছেড়ে শক্তভাবে ব্যবসা ধরায় কেউ খুশি হয়নি৷ কখনো কখনো মনে হয়, মা ও খুশি না। তবে আত্মীয় মহলে সবাই জানে মা শাফিকে খুব ভালোবাসে, শাফি মা যা বলে তাই করে। এজন্য সায়েরা বেগম প্রশংসাও পান। সতীনের ছেলেকে কেমনে মানুষ করলো!!

অথচ সায়েরা বেগম চেষ্টা কম করে নি শাফিকে দমিয়ে রাখতে৷ স্কুলে ফাইভে স্কলারশিপ পাওয়ার পরে তিনি স্কুল বাদ দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেয়ালেন।তার ধারণা ছিলো মাদ্রাসা থেকে শুধু হুজুর বের হয়, যারা বড়জোর মাদ্রাসায় চাকরি করতে পারে বা জায়গীর থাকতে পারে। শাফি মাদ্রাসায় পড়েও মেডিকেলে চান্স পেয়ে যাবে, এটা ছিলো অভাবনীয়, তারপরের গল্প আলাদা হলেও এটা শাফির একটা বড় অর্জন ছিলো।

কোনভাবেই শাফিকে দমিয়ে রাখতে পারেননি। বানি কাকা এখনো শাফির পেছনে পড়ে আছে, মার্কেটের একটা অংশ বাগিয়ে নিতে৷ কিন্তু সুবিধা করতে পারছে না। এবার মালিক সমিতির নির্বাচনে দাড়িয়েছে। জিতে গেলে শাফিকে কোনঠাসা করার চেষ্টা করবে এতে কোন ভুল নেই। এসব চিন্তা করতে করতে মাথা থেকে ইপ্তি বের হয়ে গেলো।

ইপ্তি বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু ঘুমালো। মামাম এসে ডাকলেন সন্ধ্যায়।
-বাবু , ওঠো! সন্ধ্যা হয়েছে তো!

ইপ্তি উঠে বসলো।
-তুমি আলতা দিয়েছিলে?

ইপ্তি চোখ ডলতে ডলতে ঘাড় নাড়লো।

-বাহ, ভালো লাগছে। ফ্রেশ হয়ে এসো। তোমার প্রিয় পিজ্জা আসছে, অর্ডার করেছি।

ইপ্তি উঠে বসলো। সন্ধ্যা নামবে, জানালা দিয়ে ব্যস্ত মিরপুর রোড দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা শাফি ভাইয়া কি করছে এখন, শপে নিশ্চয়ই!!

ইপ্তি ফোনটা করে ফেললো ইতস্ততভাবে।

শাফি হিসেব দেখছিলে, হঠাৎ ফোনে ভেসে উঠলো পরী। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। সত্যিই ইপ্তি ফোন করছে।শাফি ফোন কেটে দিলো। তারপর মার্কেটে একদম শেষ মাথায় গিয়ে ফোনব্যাক করলো।

ফোন কেটে যাওয়ায় ইপ্তির মনটা খারাপ হচ্ছিলো।

-হ্যালো, আস্তে করে ইপ্তি বললো!!

-তারপর, পরীর কি খবর?? -শাফি ভাববাচ্যে জানতে চাইলো।

-পরীর খবর নিতে তো কেউ একবারো ফোন করেনি। তাহলে পরী কেন খবর বলবে?

-লজিক্যাল অভিযোগ!! তাহলে পরী কেন ফোন করেছে?

-কোন কারণ নেই, আচ্ছা আমি ফোন করলে আপনি হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন, এমনিতে আপনি যা ব্যস্ত থাকেন।

-না তেমন কিছু না, দোকানে হিসেব দেখছিলাম। তুমি কি করছো?

-ঘুম থেকে উঠলাম। এখন ফ্রেশ হবো, হালকা স্ন্যাকস নিয়ে পড়তে বসার চেষ্টা করবো।

-হুম, কষ্ট হয়নি তো যেতে?

-সেটা বলবো না, আমি কেন ফোন করে আপনাকে জানাবো আমার কষ্ট হয়েছে কিনা, আপনি তো জিজ্ঞেস করেননি!!

-আচ্ছা আমার ভীষণ ভুল হয়েছে, আমার সকালেই ফোন করা উচিত ছিলো।

স্বইচ্ছায় সমর্পন, ইপ্তির ভীষণ ভালো লাগে।

-আচ্ছা আমি যদি মাঝে মাঝে আপনাকে ফোন করি, তাহলে কি আপনি বা আপনার উড বি মাইন্ড করবে?

ইপ্তিকে এখনি বলা ঠিক হবে না শাফি বিয়েটা না করে দিয়েছ। তাই বললো, আমি আমার নিজের পছন্দে চলি। তাই কে মাইন্ড করবে আর কে করবে না, এটা আসলে আমার দেখার বিষয় না।

-না মানে খুব বেশি করবো না, মাঝে মাঝে, কথাটা একটু দ্বিধা নিয়ে বলে ফেললো ইপ্তি।

-পরীর যখন ইচ্ছে পরী আমাকে ফোন করতে পারে। সবসময়ই।

মা ডাকছে, বাবু, চলে এসো, পিজ্জা চলে আসছে তো!!

ইপ্তি বললো, এখন রাখছি তাহলে। আপনি কখন ফ্রি থাকবেন?

তোমার যখন মন চায়, ফোন করতে পারো।

ওকেএ, রাখছি তাহলে, বাইই।

শাফি কতক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইপ্তির বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে, ইপ্তি তাকে ফোন করতে চাইছে, ইপ্তিরও কি তাকে ভালো লাগছে? এই ভালোলাগা কি স্বাভাবিক নাকি অন্যরকম!

শাফি একটা ফোন পেয়ে আকাশকুসুম ভাবতে শুরু করে দেওয়ার মতো বোকা না। তবুু ইপ্তিকে এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। শাফি যেন তীব্র স্রোতে একটা নৌকায় বসে আছে। যাক না যেদিকে ইচ্ছে নৌকোটা।
কে জানে হয়তো খরস্রোতে ভাসতে ভাসতে ঠিক তীরে যাবে। অথবা উল্টে গেলেও ক্ষতি নেই। শাফি তো ডুবিয়ে আছে। সাথে ইপ্তিও ডুবে যাক।

 

###

পিজ্জা খেতে খেতে ইপ্তিকে মা জিজ্ঞেস করলেন, বাবু, কেমন হলো ট্যুর?
-অনেক ভালো মামাম, এত্ত ভালো অনেকদিন মনে থাকবে!
-কোথাও গিয়েছিলে? ষাটগম্বুজ বা কোদলা মঠ?

-না মা, দুদিন ছিলাম তো, একদিন মেয়ে দেখতে গেলাম শাফি ভাইয়ের জন্য, আর একদিন বৃষ্টিতে ভিজলাম, আলতা দিয়েছিলাম।

-ওহ, আমি ভেবেছি ঘুরেছো!

– ঘুরেছি, শাফি ভাইয়া নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়েছে, আরো একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে গিয়েছে, বাইকে করে ঘুরলাম একদিন!!

-আলতা কোথায় পেলে? সারা দিলো?

-না, শাফি ভাইয়া কিনে দিয়েছে, নিয়ে এসেছি!!

কথায় কথায় এতো শাফি নামটা আসছে, ইপ্তির মায়ের কানে লাগে তবে কথা বাড়ায় না।

মা শাফি ভাইয়া না বরিশাল মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলো, পরে বাবা মারা যাওয়ায় পড়া ছেড়ে এখন বাবার ব্যবসা শপ দেখাশোনা করছে!!

-হায় হায়, মেডিকেল ছেড়ে দিয়েছে?

-দিতে হয়েছে আর কি!

-হুম!

শাফির জন্য ইপ্তির মনে একটা জায়গা হয়েছে, মায়ের বুঝতে সময় লাগে না।

-মেয়ে দেখলে? বিয়ে কবে?

ইপ্তির হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যায়, বলে ডিসেম্বরে বোধ হয়!!

এটাও চোখ এড়ায় না মায়ের। তবে এটা এতো গুরুত্বপূর্ণও মনে হলো না৷ জীবনটা এমনি। জীবনে একেক সময় একেকটা মানুষ আসবে, চলে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কেউ থাকবে, দাগ কাটবে, ঢেউ তুলবে, আবার কাউকে ভুলে যাবে।

 

###

শাফি ফিরেছে অনেক রাতে। প্রচুর কাজ ছিলো তারপর মার্কেটের মালিক সমিতি শাফিকে ভোটে দাঁড় করাতে চাইছে, জোর করতেছে, শাফি নাও করতে পারছে না। এটা নিয়ে মিটিং ছিলো। বাড়িতে ফিরতে ভালো লাগে না। মা চলে যাওয়ার পরে নতুন মা ওকে তেমন আদর করেনি কখনো৷

শাফিই ভাত খাইয়া যা, শাফি গোসল কর, সবই জোর করে বলে কথা। খেতে দেয়না এমন না কিন্তু ভালোবাসাটা থাকে না। বাবা খুব ভালোবাসতেন শাফিকে, কিন্তু সেটাও মায়ের ভালো লাগতো না। শাফির জন্য বাসায় কখনো টিচার রাখতে দিতো না মা। অথচ শুভ সারার জন্য টিচার থাকতো সবসময়। শাফি কখনো কোন অভিযোগ করেনি। সারাকে খুব আদর করে শাফি। শুভ কম মিশতো ওর সাথে, সারা পাশে পাশেই থাকতো।

সেদিন ইপ্তির সামান্য মাছ এনে দেওয়া থেকে শাফি যত্নটা বুঝতে পারছে, কেউ একজন খুব যত্ন করবে, শাফি খেয়েছে কিনা, ঠিকমতো ঘুমালো কিনা, অথবা মাথা ব্যাথা করছে কিনা৷ কাপড়গুলো গোছানো আছে কিনা! এজন্যই হয়ত বিয়ে করা দরকার৷ তবে সবকিছুর পরেও পাশে থাকা মানুষটার সাথে মনের মিল দরকার।

রাত বারোটা বাজে, শাফি ফোনটা করেই ফেললো ইপ্তিকে। ছাদে গিয়ে সিমেন্ট করা বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে শাফি অপেক্ষা করতে লাগলো।

ইপ্তি ফোন রিসিভ করেই বললো, আপনি নিশ্চয়ই এখন ফিরেছেন?

-হ্যা, পরী কি জাদু জানে, বুঝলো কি করে?

-জাদু জানতে হয় না, কয়েকদিন তো দেখলাম।

-তুমি কি করছো?

-পড়ছি, ভাইভা আছে নেক্সট উইকে।

-আচ্ছা তাহলে ফোন রেখে দিবো?

-না না, ফোন রাখতে হবে না।

ইপ্তি এমনভাবে বললো, শাফি হেসে ফেললো।

-আপনি রুমে?

-না ছাদে?

-একা একা গেছেন? ভয় লাগছে না?

-না, পরী তো এখন নেই, ভর করে উড়ে গেছে,কথাটা বলে শাফি লজ্জা পেলো, বলা উচিত হয়নি।

-আমি মোটেই ভর করিনি।

-সত্যিই তাই!

-হ্যা তাই তো!!

-আজ তো রাগ করলে না? তোমাকে পরী বলছি বলে?

-সত্যি বলতে আমার খারাপ লাগছে না, মনে হচ্ছে আমার আরেকটা নাম পরী!!

-হ্যা আমি ডাকবো পরী!

-খেয়েছেন রাতে?

-না

-খাবেন না?

-যাই একটু পরে

-সবাই ঘুম?

-হ্যা।

-আমি ব্যালকণিতে এসেছি, আমাদের ব্যালকণি থেকে মিরপুর রোড দেখা যায়, গাড়ির হেডলাইট! রাত ঝলমলে শহরে।

-তুমি মাঝরাতে ফেরীতে নদী দেখেছো? নৌকার টিমটিমে আলো?

-না, ঘুমাচ্ছিলাম।

-এটাও অদ্ভুত সুন্দর।

-পরে কখনো দেখে নিবো।

-আচ্ছা, দেখো।

-আপনি এখন খেয়ে ঘুমিয়ে যান প্লিজ, অনেক রাত হয়েছে!

-আচ্ছা যাচ্ছি। পরী তোমার সাথে কথা বলছি, এটা সারাকে বলো না প্লিজ।

-হ্যা বলা যাবে না। ও মাইন্ড করবে আর আপনারও বেশি কথা বলা ঠিক হবে না৷ ইশিতাও জানতে পারলে রাগ করতে পারে।

-সারাকে বলতে না করেছি কারন ও আমার ছোটবোন। ওর ভাইয়া ওর ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে সেটা হয়তো একটু অস্বস্তিকর হবে।
আর কারো কথা ভাবতে বলিনি!!

-আচ্ছা। আমি কি আপনাকে সকালে ফোন করতে পারি?

-তুমি সকালে উঠবে?

-হ্যা, ক্লাশ আছে তো, প্রায় এক ঘন্টা লাগবে যেতে।

– আচ্ছা, তুমি তাহলে আমাকে পাঁচটায় তুলে দিও।

-পাঁচটায় কেন?

-আমি এমনিতে এসময়ে উঠি, আজান শুনে।

-আচ্ছা ঠিক আছে। গুড নাইট।

কথা শেষ করে ইপ্তি ভাবলো, এ কি করছে ও, শাফির সাথে দুবার কথা বলে ফেলেছে, আবার সকালেও ফোন করবে, কেন এমন করছে?
ইপ্তির মনে হলো, শাফিকে ওর মনে ধরেছে, শাফির জায়গায় অন্য কারো আসা দরকার। নয়তো সারাক্ষণ মনটা শাফি শাফি হয়ে থাকবে!!

শাফি ভাবলো, কোন মায়ায় জড়াচ্ছি আমি!! ইপ্তি চাঁদের আলোর মতো, স্নিগ্ধ, মায়াবী, তাকে ভালোবাসা যায়, ঘরে নেওয়া তো অসম্ভব!! চাঁদের আলো কি কখনো আমার ঘরে আসবে!!

ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে ইপ্তি। একটা জায়গায় বন্ধ একটা ঘর, , ইপ্তি সেখানে বন্দি, বের পারছে না। ইপ্তি ধড়ফড় করে উঠে বসে। অদ্ভুতভাবে একই স্বপ্ন শাফিও দেখে, বন্ধ একটা দরজা, কিছুতেই খুলছে না।
কোনো অদৃশ্য বন্ধনে হয়তো দুজনেই কোন ইশারা পায়, কিন্তু বুঝতে পারে না।

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৬

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 7 comments