7

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৪

 

দুপুর হওয়ার আগে একপশলা বৃষ্টি হলো। শাফি বাড়ি ফিরে দেখলো ধুন্ধুমার কাণ্ড, সারা আর ইপ্তি ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছে। শাফি বলেছে পরশু যাবে, তারপরেও মা কাকে দিয়ে যেন টিকিট বুক করিয়েছেন। আজ রাত নয়টায় বাস। শাফি সাধারণত রাগে না, আজ খুব রাগ হচ্ছে। ওর ফিরতে দেরী হয় বলে ও সাধারণত একাই খায় টেবিলে। ইচ্ছে করছে না খেতে। সবার খাওয়া হয়ে গেছে।

ড্রয়িংরুমে মা বসে পান খাচ্ছিলেন। শাফির হাতে প্যাকেট দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইশিতার জন্য আনছো, দেখি?

শাফি বললো, না সারার জন্য।

তাও তিনি চাইলেন, প্যাকেট খুলে দেখবেন। শাফি কথা না বলে -সারা, সারা বলে দুবার ডাকলো। সারা দৌড়ে এলো। শাফি প্যাকেট দুটো দিলো, একটা তোর আর একটা ইপ্তিকে দিস। সারা গিফট পেয়ে ভীষণ খুশি, শাফি নিজের ঘরে চলে গেলো। ইপ্তি প্যাকেটটা পেয়ে একটু অবাক হলো। সারা বললো, ভাইয়া এনেছে, তোমার জন্য।

আমার জন্য!! আশ্চর্য তো, উনি আমার জন্য কেন গিফট কিনবে!!

এটা এখানকার রিচুয়াল, কেউ বেড়াতে এলে তাকে গিফট করা হয়।

ওহ আচ্ছা, তাহলে ঠিক আছে!!

প্যাকেটটা খুলে ইপ্তি ভীষণ অবাক হলো, কি সুন্দর একটা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, যদিও সে শাড়ি পরে না বলেছিলো,
চুড়িগুলো খুব মনে ধরলো, ঢেউখেলানো কাঁচের চুড়ি।

এই সারা, দেখো চুড়িগুলি কি সুন্দর!! উনি অনেক চুজি!!

-হ্যা ভাইয়ার পছন্দ অনেক ভালো। আমাদের এটা গ্রাম এলাকা হলেও ভাইয়ার দোকানে খুব ভালো ভালো ড্রেস, শাড়ি পাওয়া যায়৷ অনেক সময় দূর দূর এলাকা থেকেও বিয়ের জন্য কেনা কাটা করতে ভাইয়ার দোকানে আসে।

-সত্যিই তাই!!

-ভাইয়ার বউয়ের খুব ভাগ্য ভালো হবে জানোতো, দেখো কি সুন্দর গুছিয়ে প্যাকেটটা করেছে!! আলতাও আছে, তুমি আলতা পরেছো আগে?

-নাহ, আলতা দেখিও নি!! প্রথম দেখলাম।

-পরবে? এসো পরিয়ে দি??

-না না, থাক। এখন ইচ্ছে করছে না।

-আচ্ছা। আমার দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাইয়া আমাকে বেশি আদর করে, আমি যা চাইতাম ছোটবেলায়, টিফিন টাকা বাঁচিয়ে হলেও কিনে দিতো। মেজ ভাইয়া একটু নিজের মতো থাকে আর কি আর আমার সাথে খালি হিংসা করে। সারা হাসতে হাসতে বললো।

-ভাইয়া কোথায়? নিজের ঘরে?

-ডাইনিং এ মনে হয়, খেয়ে আবার দোকানে যাবে।

-ওয়েট থ্যাংকু বলে আসি, এরপর তো আর দেখা হবে না।

-আচ্ছা যাও।

সারা ডাইনিংএ উঁকি দিয়ে শাফিকে দেখতে পেলো না। তাই শাফির রুমে চলে গেলো সোজা।

শাফির ক্লান্ত লাগছিলো, শার্টের বোতামগুলো খুলে স্ট্যান্ড ফ্যানটা বেডের কাছে নিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছিলো।

ইপ্তি দরজার দুই পর্দার মাঝে মাথাটা ঝুলিয়ে বললো আসবো?

শাফি হকচকিয়ে উঠে বসে বোতাম লাগাতে লাগলো।ততক্ষণে ইপ্তির শাফির আধখোলা বুকে চলে গিয়েছে, ভীষণ ম্যানলি, ইপ্তি নিজেই লজ্জা পেলো। কখনো কোন ছেলের দিকে তাকাতে এতো ভালো লাগবে, এটা ধারণাই ছিলো না। অদ্ভুত ভাবে ইপ্তির ইচ্ছে করলো, শাফির পশমাবৃত বুকে একটু হাত ছুঁইয়ে নিতে।

নারীর অনাবৃত শরীর নিয়ে গল্প উপন্যাসে উপমার শেষ নেই, লেখকেরা কেন পুরুষের সৌন্দর্য লেখেনি সেভাবে, নাকি ইপ্তির চোখ এড়িয়ে গেছে। শাফিকে দেখে ইপ্তির কল্পনায় গ্রীক মিথোলজির দেবতাদের মতো মনে হলো। সুঠাম, পুরুষ্টু, পুরুষালী, প্রেমময়। ইপ্তি চোখ নামিয়ে নিতে নিতে শাফি ঠিক হয়ে বসেছে।

এসো ভেতরে এসো।

আপনাকে থ্যাঙ্কস দিতে এসেছি। আপনার গিফট খুব ভালো হয়েছে, আই লাভড ইট।

শাফি হাসলো।

আপনি লাঞ্চ করেছেন?

না এখনো করিনি।

আচ্ছা, তাহলে লাঞ্চ করে নিন।

হুম, যাচ্ছি।

আমি আসছি….

ইপ্তি…. পিছু ডাকলো শাফি।

জি বলুন??

গিফট পছন্দ হয়েছে যখন, শাড়িটা পরে দেখো কেমন লাগছে? – শাফির কেমন তোলপাড় ইচ্ছে হচ্ছে একবার ইপ্তি শাড়ি পরে সামনে আসুক।

-আচ্ছা, কিন্তু টেকনিক্যাল প্রবলেম আছে, আমি তো শাড়ি পরার মতো আদার্স এক্সোসরিজ আনিনি। আই মিন, ব্লাউজ অর আদার্স।

শাফি দমে গেলো, এটা তো মাথায়ই ছিলো না। পরে বললো, আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। পরে কখনো পরে নিও।

ইপ্তি চলে গেলো। শাফি ভাবতে লাগলো ইপ্তিকে নিয়ে। মেয়েটার মধ্যে কি যেন একটা আছে, যতক্ষণ আসেপাশে থাকে একটা অদৃশ্য আলোয় চারপাশটা ঝলমল করে, আজই চলে যাবে, মন বিষন্ন লাগছে। আর হয়তো কোনদিন আসবে না। দেখাও হবে না।

শাফিকে বুয়া খেতে ডাকছে। শাফি উঠলো, খেয়ে আবার দোকানে যেতে হবে।

ডাইনিংএ শাফি একা বসে খাচ্ছিলো, মেনু ইলিশমাছ ভাজি, মুরগীর মাংস, ডাল, কাঁচকলা চিংড়িমাছ। ইলিশ মাছ শাফির খুব পছন্দের। কিন্তু আজ খেতে পারলো না। মা খেয়াল করেনি, মাথার পরের মাছটা শাফির বাটিতে তোলা। এটা এতো কাটা, শাফির বিরক্ত লাগে খেতে। তাই মুরগীর মাংস নিলো।

শাফি মাথা নিচু করে খাচ্ছিলো, হঠাৎ একটা অচেনা সুবাসে মুখ তুলে দেখলো একপ্যাচে শাড়ি পরে ইপ্তি এসে দাঁড়িয়েছে। ইপ্তি বলেছিলো, শাড়ির পরার দরকারি ব্লাউজ ট্লাউজ নেই, সে ফতুয়ার উপরে পিন করে করে শাড়িটা পরেছে, একটু ওয়েস্টার্ন লাগছে দেখতে, তাও শাফির খুব ভালো লাগলো।

শাফি হেসে বললো, বাহ, কনসেপ্টটা নতুন।

ইপ্তি বললো, কনসেপ্ট আমার তবে সারা হেল্প করেছে।

সারাকে কি বললে? শাড়ি কেন পরবে?

ইপ্তি শাফির পাশের চেয়ারে দু হাতে ভর দিয়ে দাঁড়ালো।

-বললাম, ইচ্ছে করছে পরতে।

-সারা কই?

ইপ্তি নিচু হয়ে আস্তে ফিসফিস করে বললো, সোহাইল ভাইয়া ফোন করেছে।

শাফি মনে মনে খুশি হলো, সোহাইল পারফেক্ট টাইমে ফোন করেছে, মা নিজের ঘরে আছে, বুয়া চলে গিয়েছে। ইপ্তিকে চোখ ভরে দেখে নেওয়া যায়। এই প্রথম মনে হয়, বোনকে চুপিচুপি প্রেমিকের সাথে কথা বলতে শুনে কোন বড় ভাই খুশি হয়ে গেলো, এটা ভেবে হাসিও পেলো।

হঠাৎ প্লেটে তাকিয়ে ইপ্তি বললো, আপনি মাছ পছন্দ করেন না তাই না?

না করি তো!

এখন খাচ্ছেন না যে?

এটা মাথার পরের মাছ, আমি এই পিসটা খাইনা। বিরক্ত লাগে।

তাহলে চেইঞ্জ করে দিতে বলুন।

বুয়া বাড়িতে চলে গেছে, বিকেলে আসবে আবার।

ওয়েট, আমি এনে দিচ্ছি।

শাফি না করলো না। ইপ্তিকে এখন গিন্নী গিন্নী লাগছে।

ইপ্তি কিচেনে ঢুকে মাছের কড়াই পেয়ে গেলো সহজেই। কড়াইয়ে এখনো অনেক মাছ মাছের ডিম সবই আছে। তাহলে কি শাফির বাটিতে ইচ্ছে করে এই মাছটা দেওয়া হলো!! ইপ্তি পছন্দ মতো মাছ, মাছের ডিম তুলে নিয়ে এসে দিলো।তারপর পাশে বসলো। শাফির কেমন যেন লাগছে। ওর অযত্ন হয় না কখনো, তবুও কিছু একটা মিসিং থাকে, সেটা আজ মিসিং নেই।

ইপ্তি মাছের ডিম খাবে?

উমম, খাওয়া যেতো কিন্তু হাতে লাগাবো না।

শাফি প্লেট থেকে তুলে ইপ্তির মুখে এগিয়ে দিলো। ইপ্তি ইতস্তত না করেই খেয়ে নিলো। একবারো মনে হলো না, শাফির হাতে খাওয়া বিষয়টা অশোভন হতে পারে। আশপাশে কেউ নেই বলে শাফিও দ্বিধা করলো না৷ আরো একবার ডিমটা এগিয়ে দিলো।
মেয়েটা কি ভীষণ আদুরে। ইপ্তি যে মাছ ডিম তুলে নিয়ে এসেছে সেটা দিয়েই শাফি খাওয়া শেষ করে উঠলো।

পানি খেতে খেতে ইপ্তি জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখন শপে যাবেন তো?

-হ্যা, কেনো?

আমরা আজ রাতেই চলে যাচ্ছি শুনেছেন তো?

হ্যা শুনলাম।

আচ্ছা, তাহলে বাইই, ভালো থাকবেন।

ইপ্তি ছাদে এসো, আমি যাচ্ছি ছাদে। তোমাকে ছবি তুলে দিই।

শাফি নিজের ঘরে গিয়ে ক্যামেরাটা বের করে নিয়ে ছাদে গেলো। ইপ্তি আসেনি তখনো, রুমে ঢুকে দেখলো সারা ফিসফিস করে কথা বলছে। ইপ্তি ইশারায় বললো, সে ছাদে যাচ্ছে, সারা ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। বের হওয়ার সময় ইপ্তি গিফটের প্যাকেটটা সাথে নিয়ে নিলো, টিপ পরে নিবে ছাদে গিয়ে।

ছাদের ঘরে শাফি লেন্স ঠিক করছিলো, সময়ের অভাবে ছবি তোলা হয়না। কিন্তু ভীষণ ভালো লাগে ল্যান্ডস্কেপ তুলতে। এক সানসেট আর সান রাইজিং এর হাজার হাজার ছবি তোলা হয়ে গেছে। স্কিলশেয়ার চ্যানেলে ফটোগ্রাফি টিউটোরিয়াল গুলো দেখে বেশ কিছু টিপসও নোট করেছিলো, কিন্তু কি ব্যবসার এতো চাপ, জমি জমা, কাপড়ের দোকান মার্কেন, সিজনাল ব্যবসা এসবের ফাঁকে নিজের ইচ্ছেটাকে গুরুত্ব বা সময় দেওয়ার অবকাশ হয় না।

ইপ্তি পাশে গিয়ে বসে চুড়ি বের করে পরতে লাগলো। শাফি আড়চোখে তাকিয়ে বললো, সারা কোথায়, ও আসবে না?

কথা বলছে, আসবে। একটু পরে। ফোনটা ধরে টিপটাও পড়ে নিলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, সারা তখন আলতা পড়িয়ে দিতে চাইলো, পড়লাম না। অপেক্ষা করি, ও এলে আলতা পরে নিবো।

শাফি বেশ কিছু ছবি তুলে দিলো ইপ্তিকে। একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় ছাদটা ভেজা ছিলো। একুয়াটিক ব্যাকরাউন্ডে লালপেড়ে শাড়িতে ইপ্তিকে সত্যিই দেবীর মতো লাগছিলো। পনেরো বিশ মিনিট হয়ে যাওয়ার পরেও সারা এলো না। শাফির মনে হলো আলতা দেওয়া হলে জল আলতা ছাপেও ব্লার করে কিছু ভীষণ ভালো আসবে।

ইপ্তি আলতা কোথায়?

ওই যে বেডের উপর ব্যাগে রাখা আছে।

তুমি দিতে পারবে না?

কখনো দিই নি।

আচ্ছা, শাফি হেঁটে গিয়ে নিয়ে এলো আলতাটা।

ছাদে করা সিমেন্টের বেঞ্চে ইপ্তিকে বসিয়ে বললো, পা বের করো আমি দিয়ে দিচ্ছি। কোন অনুমতির অপেক্ষা না, এটা যেন শাফি বলতেই পারে, ইপ্তির সেরকমই মনে হলো। ও কথা না বলে শাড়ি হালকা তুলে বসলো। জিন্স শাড়ির নিচ থেকে বের হয়ে আসছে কিন্তু অদ্ভুত কারণে শাফির খারাপ লাগছে না।

শাফি হাঁটু ভেঙে বেঞ্চের নিচে বসে ইপ্তির পায়ে আলতা দিয়ে দিতে লাগলো। ইপ্তির অসম্ভব ভালো লাগছে, পৃথিবীতে এতো আনন্দ আগে কখনো অনুভব করেনি। এ সুন্দর সময়ও আসতে পারে, একজন প্রায় অপরিচিত মানুষের সাথে।

সারা ছাদের দরজায় এসে অবাক হয়ে দেখলো বড় ভাইয়া ইপ্তিকে আলতা দিয়ে দিচ্ছে!!

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ৫

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 7 comments