2

বৃষ্টি নামার আগে- পর্ব ১০

 

শাফিকে কেবিনে শিফট করে দিয়েছে রাতেই। দু তিনদিন থাকতে হবে, কাছাকাছি বাসা হলে চলে যেতে পারতো, কিন্তু যেহেতু অনেক দূরে থাকে, তাই দুটো দিন হসপিটালে থাকাই ভালো মনে করলেন ডাক্তার।

ইপ্তি সারাকে আর ফোন করেনি, ওই বিল্ডিং এর নিচের রিসিপশন থেকে জেনে নিয়েছে কেবিন নম্বর ৪০৫। একদম শেষ কেবিনটা, চারতলার একদম কর্ণারে। রাতে ইপ্তি আর গেলো না। কিছু কার্ড বানালো নিজের রুমে বসে। শাফি বলেছিলো হিস্ট্রিকাল থ্রিলার ভালো লাগে, তাই এরকম দুই তিনটা বই ইপ্তি নিয়ে এসেছে। ভাগ্যিস বইগুলোতে নাম টাম লেখেনি, একদম নতুনই আছে, ওর পড়তে ভালো লাগবে, সারা তে সারাক্ষণ সময় দিতে পারবে না, লম্বা সময় একা একা থাকতে হবে শাফির।
ইপ্তি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে ছোট ছোট নোটস লিখে কার্ডটা বানিয়ে ফেললো।

খুব সকালে ডরমিটরি থেকে বের হয়ে কতগুলো শিউলি ফুল আর বেলি ফুল কাগজে মুড়িয়ে নিয়ে শাফি যেখানে আছে সেখানে রিসিপশনে রেখে আসতে গেলোকার্ড আর ফুল গুলি।

সকাল সকাল ডিউটি শিফট হচ্ছিলো, সবাই ব্যস্ত ছিলো, ইপ্তি রিসিপশনে না রেখে সরাসরি শাফির রুমেই চলে গেলো। তখনো ঘুমাচ্ছিলো। যে সিস্টারের ডিউটি শুরু হয়েছে, সে এসেছে শাফির কেবিনে।
ইপ্তির গায়ে এপ্রোন দেখে প্রথমে ডাক্তার মনে করে কিছু বললো না। ইপ্তি ফুল, কার্ড আর বই দুটো রেখে যাবা সময় জিজ্ঞেস করলো, ওনার ফাইলটা দেখি?

সিস্টার বললো, আপনি নতুন ডিউটি করছেন ম্যাম, আগে তো দেখিনি!

ইপ্তি লুকালো না, বললো, আমি এখানকার স্টুডেন্ট, এখনো ডিউটি শুরু করিনি!

সিস্টার একটু অবাক হয়ে বললো, তাহলে এখানে কেন এসেছেন, আপনার আত্মীয়? উনি তো কার ভাই শুনলাম!

ইপ্তি এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললো, আমি যে এসেছি বা এসব রেখে গেলাম, সেটা যেন উনি জানতে না পারে সিস্টার, কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে দিয়েন প্লিজ।

সিস্টার বললো, আপনি আবার আসবেন? উনি কি হয় আপনার?

ইপ্তি বললো, আমার অনেক কিছুই হতো সিস্টার, এখন কিচ্ছু হয় না। আমি একটু আসবো এই দুটো দিন, আপনি থাকলে একটু ম্যানেজ করতে হবে।

সিস্টার বুঝে নিয়ে ঘাড় নাড়লো। ইপ্তি এখানকার স্টুডেন্ট, আউটসাইডার হলে সমস্যা ছিলো।

ফাইল দেখে ইপ্তি বললো আসবো, দুপুরের পরে, লাঞ্চের পরে পেইনকিলার আছে, একটু ঘুম আসবে, তখন।

-আপনি কি তাহলে ওনার সাথে দেখা করতে চান না?

-না, আমি চাই না ও জানুক আমি এসেছিলাম। এখন আমি যাচ্ছি, প্লিজ সিস্টার, একটু সামলে নিন।

হাত ধরে বলে গেলো ইপ্তি। শাফির ঘুম ভাঙার পরে ও ব্রেকফাস্ট করে নিলো। তখন মাথার কাছের টেবিলে ফুল, কার্ড আর বই দুটো দেখলো।
সারাকে আসতে না করেছে, তাহলে! কার্ডটা হাতে নিতেই পরিচিত সুবাস, ইপ্তি এসেছিলো! সারাকে তো না করেছিলো, সারা কি বললো? বলার তে কথা না!
বই দুটো দেখে একটু অবাক হয়ে শাফি সিস্টারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, কোন ভিজিটর এসেছিলো?

-কই, না তো?

-তাহলে এই যে বই, ফুল, কার্ড, কে রেখে গেলো?

-এগুলো তো রিসিপশনে রেখে গেছে কেউ, সেটাই ওয়ার্ডবয় দিয়ে গেছে।

-ওহ আচ্ছা।

শাফি আর কথা বাড়ালো না। কার্ডটা খুব যত্ন করে বানিয়েছে, এগুলো সারার কাজ না। সারা বাদে আর ইপ্তি ছাড়া কে আসবে!

সারা এলো এগারোটার দিকে, কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলো না৷ ওর ক্লাশ আছে। তাই দেখা করে চলে গেলো।

ইপ্তি দুপুরের পরে এলো। ওরও ক্লাশ ছিলো কিন্তু ইচ্ছে করে মিস করলো। এখন কিছু সময় কাটানো যাবে শাফির এখানে। সিস্টার তখনো ছিলো, ইপ্তিকে দেখে হেসে বললো, জিজ্ঞেস করেছিলো, কিন্তু বলিনি।

-ওষুধ দিয়েছেন কখন?

-বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে, একটু তন্দ্রা আসবে এখন।

-গুড, ইপ্তি খুশি হয়ে কেবিনে ঢুকলো। এই সময়ে রাউন্ডে কেউ আসে না। আসবে বিকেলে। পনের বিশ মিনিট ইজিলি পার করে দেওয়া যাবে।

শাফিকে দেখে মনে হচ্ছে গভীরভাবে ঘুমুচ্ছে। ইপ্তি আস্তে কপালে হাত রাখলো, শাফি একটু কেঁপে উঠলো কিন্তু ঘুম ভাঙলো না।
ইপ্তি মাথার কাছে বসলো একটু সময়। তারপর ডান হাতে ব্যাথা পেয়েছে, হাতটা আস্তে স্পর্শ করলো, না, শাফি ঘুমাচ্ছে, টের পাচ্ছে না। ইপ্তি বিছানা থেকে উঠে অন্যপাশে গিয়ে শাফির ব্যাথা পাওয়া হাতের আঙুলগুলি আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিলো। হাতের পাতা রুক্ষ হয়ে আছে, কোন ক্রিম বা লোশন দিলে ভালো হতো।
নিজের ব্যাগ থেকে লোশনটা বের করে আস্তে আস্তে শাফির হাতের পাতায় লাগিয়ে দিলো। আঙুলের কোণা নীলচে, অনেক আঘাত ছিলো মনে হয়, কাউকে বলেনি। খুব তাড়াতাড়ি সময় পার হয়ে যাচ্ছিলো। ইপ্তি ঘড়ি দেখে নিলো, সিস্টারও জানালা দিয়ে ইশারা দিয়ে দিলো। ইপ্তি শেষ বারের মতো শাফির কপালে হাত রাখলো, মুখটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে, ঠিক হয়ে যাবে রেস্ট নিলে। ধকলটা একেবারে কম নয়।

ইপ্তি চলে যাচ্ছিলো, শাফি বা হাত দিয়ে ইপ্তির হাত ধরে ফেললো৷ ইপ্তি ভীষণ চমকে গেলো!!

 

###

-আপনি ঘুমাননি!! চোখ বন্ধ করে ছিলেন!! -ভীষণ অবাক হয়ে ইপ্তি জিজ্ঞেস করলো।

শাফি হাসতে হাসতে বলল, আমার তো ভয় করছে বুঝছো, এ কোথায় এলাম, এখানে হবু ডাক্তার, নার্স কেউ জানেনা কোন ওষুধে কতটা ঘুম হতে পারে!

ইপ্তি কপট রাগের ভান করে বললো, জানবে না কেন, আপনার এখন মোটামুটি একটা ঘুম আসার কথা!

-হুম, ঘুম এসেছিলো, কিন্তু ঘুমের মাঝে কেউ যদি চুল নিয়ে, হাত নিয়ে খোঁচাখুচি করে, বারবার চোখের উপর নাকের উপর হাত দেয়, ঘুম কিনা চেক করতে, তাহলে ঘুৃম এমনিতেই পালাবে।

ইপ্তি লজ্জা পেয়ে গেলো, ফর্সা গালে লাল আভা, শাফির মনে হলো হাত ধরে বুকের উপর টেনে গালে আলতো করে চুমু খায়, কিন্তু শাফি কিছুই করলো না। অভদ্র ইচ্ছেরা মনেই মরে যাক!

-আমি মোটেও খোঁচাখুচি করিনি, আপনার হাতটা একটু রাফ হয়ে গিয়েছিলো, তাই একটু লোশন লাগিয়েছি, সরি৷ জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিৎ ছিলো।

শাফি আবারও হাসলো। ইপ্তি শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকায়, কি সুন্দর করে হাসে, ক্লান্ত চোখের হাসিটাও বুকে গিয়ে লাগে, কি এমন হয়েছে যে আমাকে এতো দূরে সরিয়ে দিতে হলো!! কিন্তু না, এটা কখনোই আর জিজ্ঞেস করবে না ইপ্তি।

-সরি বলার কিছু নেই ইপ্তি, তোমাকে অনেক থ্যাঙ্কস, কাল থেকে তুমি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছো, আমি এটা ডিজার্ভ
করি না।

-আপনি জানেন যে আমি কাল এসেছিলাম!!

শাফি রাতের বিষয়টা জানতো না, আন্দাজে ঢিল মেরেছে, সারা ইপ্তির ফোল্ডার ওপেন করেছে, লক করতে পারেনি। সেখান থেকে আন্দাজ করেছে, ইপ্তিকে জানাতে পারে।

-তুমি তো সকালেও এসেছিলে, এসে সিস্টারকে ম্যানেজ করে গিয়েছো! এই তুমি না ডাক্তারী বাদ দিয়ে ভোটে দাঁড়াও বুঝলে, খুব ভালো ম্যানেজ করতে পারো সব কিছু, কার্ডটাও সুন্দর বানিয়েছো!

-আপনি কি করে বুঝলেন আমিই রেখেছি!!

-যৌক্তিক কারণ হচ্ছে সারা এসব পারে না আর এখানে তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই, তুমিই জানো আমি কি বই পড়তে পছন্দ করি।
আর অযৌক্তিক কারণ হচ্ছে, তোমার স্মেল পাচ্ছিলাম, ফিল করতে পারছিলাম তুমি আশেপাশেই আছো!
আমার চোখ লেগে আসছিলো, তখনি তুমি পাশে এসে মাথায় হাত রাখলে, আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো, চোখ মেলিনি ইচ্ছে করেই, দেখলাম তোমার সিস্টার আর তুমি কি কি ষড়যন্ত্র করেছো!!

-ষড়যন্ত্র হবে কেন, আপনি তো আমার সাথে কথাই বলেন না, তাই জানাতে চাই নি- বলতে বলতে শাফির পায়ের কাছে বসলো।

শাফি বলল, তাই বলে চুপিচুপি আসতে হবে কেন, মানুষ তো শত্রুকেও দেখতে যায়!! সেখানে আমি তো….

-আপনি কি?

-কিছু না!

-সত্যিই কিছু না। আমি যাচ্ছি- ইপ্তি উঠলো।

-ক্লাশ মিস করেছো? -শাফির কথা বলতে ভালো লাগছে, ইচ্ছে করছে না ইপ্তিকে ছাড়তে। এক মুহুর্তে আগের সবকিছু ভুলে যেতে ইচ্ছে করছে।

-হ্যা, যাইনি।

-সমস্যা হবে না?

-হলে হবে!! লোশনটা রেখে যাচ্ছি, হাতে দিয়েন একটু পর পর, রাফ হয়ে গেছে!

একটু আগেই নরম দুটো হাত শাফির শক্ত রুক্ষ হাতে আলতো করে আদর ছুঁইয়ে যাচ্ছিলো, শাফির মনে হতেই মনটা খুব আনচান করে ওঠে, আরেকটু সময় পাশে থাকুক ইপ্তি, একটু খেয়াল রাখুক শাফির, আবারও একটু কাছে আসুক!! পাত্তা দিলো না শাফি, এগুলো ভাবা বিলাসিতা।
আহারে, মানুষ চেয়েও ভালোবাসা পায়না, আর শাফি ইপ্তির মন থেকে আসা এই অনুভূতি পেয়েও নিতে পারছে না।

ইপ্তি উঠে আবার বসলো।

কি ব্যাপার আবার বসলে যে?

আপনার সমস্যা আছে?

না, আমার কি সমস্যা!

ইপ্তি ব্যাগটা রেখে শাফির পায়ে হাত দিলো, শাফি সরিয়ে নিতে গেলেও ইপ্তি শক্ত করে ধরে ফেলে বললো, চুপচাপ শুয়ে থাকুন!

-তোমাদের এখানে পেশেন্টদের উপর টর্চার করাও হয় নাকি?

ইপ্তি উত্তর দিলো না। বাতাসে রুমের পর্দা উড়ছে। ইপ্তি উঠে দরজা বন্ধ করতে গেলো।

দরজা বন্ধ করো না ইপ্তি!

কেন কি সমস্যা?

দেখো বন্ধ ঘরে আমি যদি অভদ্রতা করি, তাহলে?

ইপ্তি খিলখিল করে হেসে উঠে বললো, করুন অভদ্রতা। সমস্যা নেই। শাফিও হাসলো।

শাফি ইপ্তিকে আর বাঁধা দিলো না, কিছুটা সময় একান্ত থাক নিজেদের। সব কিছু নিয়ম মেনে কেন হতে হবে।
ইপ্তি শাফির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো, আপনার কখনো আমার কথা মনে পড়ে না, তাই না?

শাফি চোখ বন্ধ করে বললো, হাতে নখটা ধরে দেখছিলে না, কেমন নীল হয়ে গেছে, প্রথমে একটা তীব্র ব্যাথা ছিলো, পরে নীল হয়ে অনুভূতি শূন্য হয়ে গেছে।

ইপ্তির খুব কষ্ট হতে লাগলো, যদি তাই হবে, তাহলে কেন দূরে সরে গেলেন, সব তো ঠিকই ছিলো!

-আমাদের মানায় না ইপ্তি, তোমার আর আমার মধ্যে অনেক ব্যবধান তুমি বুঝবে না এখন, ইমোশনাল হয়ে আছো তো!

-আপনি বুঝেছেন?

শাফি উত্তর দিলো না।

-আসলে আপনার ওই মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছিলো, আমার জন্য তখন সুবিধা করতে পারেননি, এখন তো ওকেই বিয়ে করছেন, তাই না?

-তোমার বয়ফ্রেন্ড রিদম, তার কি খবর!

-কি পাজি, ওর কথা ঠিক মনে আছে?

-বাহ, আমার বউয়ের সাথে ডেট করে বেড়াবে আর আমি মনে রাখবো না!!

-কি বললেন?

-না কিছু না!

-ওয়ার্ডটা কি ছিল? আপনার কে?

-আমার কেউ না!

ইপ্তি নিঃশ্বাস ফেললো, শাফি এমনি এমনি দূরে সরে যায়নি, হতে পারে মামাম বা বাবা ফোন করে কিছু বলেছে, ইপ্তির সামনে বলেনি, কিন্তু জানবে কিভাবে!

-আপনাকে বাবা বা মামাম কিছু বলেছে?

-না তো, কেন?

-সত্যি করে বলুন,

-সত্যিই বলছি, কেউ কিছু বলেনি!

শাফির হাত ধরে বললো, আমাকে ছুঁয়ে বলুন?

-তোমাকে ছুঁয়ে মিথ্যে বললে কি হবে, আমার হাত ভালো হবে না??

ইপ্তি হাত ছেড়ে দিলো, ধুর, ভাল্লাগে না।

-ইপ্তি, কপালে হাত বুলিয়ে দাও।

ইপ্তি আস্তে আস্তে শাফির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।

ইশ, ওই মানুষটা কত ভাগ্যবান, যে ইপ্তিকে বউ করে পাবে, ইপ্তি তাকে এভাবে আদর করবে সবসময়, শাফির জিদ হয়, মনটা অস্থির হয়, কক্ষনোই না, ইপ্তি শুধু আমার। শুধুই আমার।
মনে মনে নিজেকে থামায় শাফি। এসব জিদ মনের মধ্য থাক। আপাতত এটুকু ভালেবাসাই অনেক বেশি পাওয়া।

ইপ্তি উপুর হয়ে শাফির চোখে চুমু খেলো, শাফি চোখ বন্ধ করে ছিলো, চোখ খুলে ফেললো। বুকের উপর ইপ্তির তুলতুলে নরম শরীরটা, কেমন অসহ্য একটা অনুভূতি হচ্ছে, ইপ্তি বুঝবে না কখনো, মেয়েটার কোন খেয়ালও নেই, উপুর হয়ে আছে, শরীরের সুবাস জামার ফাঁক গলে শাফির নাকে গিয়ে লাগে। শাফি নিজেকে আর সামলাতে পারে না। ইপ্তিকে কাছে টেনে অবাধ্য চুমু খেতে থাকে। ইপ্তির কপাল চোখ গাল চিবুক গলায়। সবসময় শান্ত শাফিকে এভাবে বন্য হতে দেখে ইপ্তি উপভোগ করে, বাঁধা দেয় না।

চুমুর পরিধি গলা ছাড়িয়ে যাবার সময় শাফির খেয়াল হয়, এসব কি হচ্ছে, ইপ্তি তো বাঁধা দিচ্ছে না। উল্টো হাতে ব্যান্ডেজ করা বলে হাতটা সামলে রাখছে যেন ব্যাথা না লাগে। মেয়েটা একটা অঘটন না ঘটিয়ে ছাড়বে না।

শাফি ইপ্তিকে ছেড়ে দেয়। আস্তে আস্তে বলে, পরী তুমি চলে যাও, আর এসো না কখনো!

ইপ্তির চোখ ছলছল করে ওঠে। এক ছুটে বের হয়ে যায় শাফির ঘর থেকে। আর আসবে না, সত্যিই আসবে না!!

 

###

আফরোজা আহমেদ সকাল থেকে ইপ্তির পাসপোর্ট খুঁজে পাচ্ছেন না। থাই এম্বেসীতে জমা দিবেন, তিনদিনের একটা সারপ্রাইজ ট্রিপের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু দেখা গেলো ইপ্তির পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না।
তাই ইপ্তিকে ফোন করে ফেললেন। ইপ্তি গিয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসে, তিন চার দিন থাকতে হবে।

ফোন বেজে গেলো কতক্ষণ, ইপ্তি রিসিভ করলো না। কিছুক্ষণ পরে ইপ্তি ফোন ব্যাক করলো।

-কি করছো? ফোন ধরোনি কেন?

-মামাম ওয়াশরুমে ছিলাম, বলো!

-তোমার পাসপোর্ট কই?

-আমার আলমারিতে।

-চাবি কই?

-আমার ব্যাগে! ওহ শিট মামাম ব্যাগতো নিয়ে এসেছি।

-আচ্ছা ঠিক আছে, সমস্যা নেই। তুমি কবে ফিরবে?

-কাল বিকেলে বা পরশু।

-ওকে, টেক কেয়ার বেবি। রাখছি।

মামাম নিশ্চয়ই কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছে, ইপ্তি ভাবলো। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে, বিষন্ন লাগছে, শাফি বোধ-হয় সত্যিই চায়না ইপ্তি কাছে যাক।
তবে সারক্ষণ তো আর ইপ্তি যাচ্ছে না। কাল চলে আসার পরে আর যায়নি। আজ সকালে একবার দূর থেকে দেখে চলে এসেছে, দুপুরে একবার যাবে।
আজ কি ছেড়ে দিবে শাফিকে, দিতে পারে, সারাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ছেড়ে দিলে শাফি বাড়িতে চলে যাবে। ইপ্তি সারার রুমে গেলো, সারা পড়তে বসেছিলো।

-সারা আসবো?

-হ্যা, ইপ্তি এসো।

-ভাইয়াকে আজ রিলিজ করে দিবে?

-হ্যা,

-বাড়ি চলে যাবেন?

-হ্যা,

-বাসে?

-না, গাড়ি করেছি, ওকে দুপুরের পরে আমি তুলে দিবো।
আমি তো যেতে পারবো না। ভাইভা আছে।

-তোমার মেজভাই আসতো?

-আরে মেজভাই একটু অন্যরকম, অলস আর কি!

-হুম, বুঝেছি।

-ইপ্তি, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

-হ্যা বলো!!

-ভাইয়ার সাথে আমাদের বাড়ি থেকে ফেরার পরেও তোমার যোগাযোগ ছিলো, তাই না?

ইপ্তি ঘাড় নাড়লো।

-আমি ভাবতাম আমার বুদ্ধি, অথচ আমার কাছাকাছি দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে ভালোবাসে, নিজেরা জড়িয়ে যাচ্ছে, আমি সেটা বুঝতেই পারিনি!

ইপ্তি বললো, তোমাকে আমি কিছু বলিনি কারণ উনি না করেছিলেন, বলেছিলেন সময় মতো তিনি জানাবেন।

-তারপর?

-তারপরের গল্পটা আমি জানি না সারা, কি যে হলো, হুট করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন, খুব খারাপ আচরণ করতে লাগলেন! এমনকি কাল আমি ওনার কেবিনে গিয়েছিলাম, তখনও আমাকে চলে যেতে বললেন।

-পুরো গল্পটা আমাকে বলবে ইপ্তি?

-আর কোন গল্প নেই সারা, গল্পটা আলাদা হয়ে গেছে।

-এটা তোমার মনে হয়?

-উনি চায় না আমি ওনার আসেপাশে যাই!
কিন্তু সারা আমার না খুব যেতে ইচ্ছে করে, আমি নিজেকে আটকাতে পারছি না। মনে হচ্ছে ওনার কাছাকাছি থাকতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ফিলিংটা আমার একার। ওনার কষ্ট হয় না আমার জন্য।

আমি আসছি, সারা। তুমি পড়ো।

ইপ্তি চলে যেতে উঠতেই সারা বললো, ইপ্তি তোমার নম্বরটা ভাইয়া “পরী” লিখে সেভ করে রেখেছে, ওর ফোনের গ্যালারী ভরা তোমার ছবি, তোমাদের ছবি। আর কিচ্ছু নেই।

ইপ্তির চোখ ছলছল করে উঠলো। ও দ্রুত হেঁটে চলে গেলো।

 

###

আফরোজা আহমেদ চলে এসেছেন ইপ্তির ক্যাম্পাসে। ইপ্তির এখন ক্লাসে থাকার কথা। দুপুর দুইটার মতো বাজে।
কলেজ বিল্ডিং এর সামনে নামতেই তিনি দেখলেন, ওটা কে? ইপ্তি না? কোথায় যাচ্ছে? ওয়ার্ড আছে আজকে?
কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে কোথাও। আফরোজা আহমেদ ডাকলেন, মামণিইই,

ইপ্তি শুনলো না। খুব দ্রুত হেঁটে চলে গেলো।

আফরোজা আহমেদ ইপ্তির পিছু হেঁটে গেলেন৷ এতো দ্রুত, রোদের মধ্যে কোথায় যাচ্ছে ইপ্তি!!

বৃষ্টি নামার আগে- শেষ পর্ব

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 2 comments