4

বারান্দার গল্প

 

ভাতটা চুলায় বসিয়ে দিয়ে বারান্দায় এসে দাড়ায় তমা। আজ বেশি কিছু রান্নার নেই। ডাল রান্না হয়ে গিয়েছে, শুধু তেলে ফোড়ন দিতে হবে। ভাতের মধ্যে দুটো মাঝারি সাইজের আলু দিয়েছে, সবুজ আলুভর্তা খুব বেশি একটা খায় না। কাঁচামরিচ পেয়াজ কাটা আছে, খেতে বসার আগে দুজনের জন্য একটা ডিম ভেজে নিলেই হবে।
বৃষ্টি আসবে হয়তো, আকাশে মেঘ জমেছে।
বাথরুমে কয়েকটা কাপড় রাখা আছে, সুফিয়া আসবে বলে মনে হয়না আজ।
এককাজ ছয়শ করে নেয়, তাও মাসে পাঁচ সাতদিনই তার বিভিন্ন অজুহাত।
যেদিন বন্ধ দেয়, পরদিন তার মুড থাকে চড়া। যেন আজ এসেছি, এটাই বেশি!
তমা খুব নরম ধরনের বলে কিছু বলেনা কখনো। কিন্তু ইদানীং বিরক্তি লাগে। সবুজের জন্য ছাড়াতেও পারছে না। সবুজ বলে, একা সব কাজ করতে গেলে কষ্ট হবে তোমার৷ তার চাইতে থাকুক। ঢাকার ছুটা বুয়ারা এমনই হয়। তুমি তো নতুন, কয়েক মাস থাকলেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
এর আগে সবুজ থাকতো ম্যাচে। সেখানকার বুয়া নাকি আরো মারাত্মক ছিল। ম্যাচের বাজার ঝেড়ে দিয়ে নিজের সংসার চালাতো। মাঝে মাঝে পকেট থেকে দু দশ টাকা হাওয়া হয়ে যেত।আর বন্ধ তো আছেই।
সেদিক থেকে সুফিয়া বুয়া ভালো, চুরি টুরি করে না।

তমা নিচে তাকিয়ে দেখলো, একটা ছোট্ট বাচ্চা, হয়ত থ্রি ফোরে পরে, বাবার হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরছে।
স্কুল ড্রেস পড়া।
তমাদের বাসায় ঠিক পাশেই একটা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল।
ঘন্টা বাজলেই তমার বাড়ির কথা মনে পড়ে।

তমা ঢাকায় এসেছে গতমাসে। সবুজের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর খানের। কিন্তু সবুজ গুছিয়ে বাসা নিয়েছে গত মাসে মাত্র।

ছোট্ট মফস্বল শহরে তমা হাঁপিয়ে উঠেছিল। নিজের বাবার বাড়ি, তাও বিয়ের দুমাস পরে যেই আসে জিজ্ঞেস করতো, কি ব্যাপার, জামাই কবে নিয়ে যাবে??
বা এখনো নিচ্ছে না কেন!!!.

নিবে কিভাবে! সবুজ ছোট্ট একটা চাকরি করে, ফ্যাক্টরীতে স্টোরকিপার। যা বেতন পায়, সেটা দিয়ে বাসা নেয়া যাবে, কিন্তু সব কিছু তো গুছানো প্রয়োজন।
একটা বাসা নিলে কত খরচ যে আছে, মানুষ বুঝতেই চায় না।

তমার বাবার অবস্থাও খুব ভাল নয়। তবুও বাসা নেওয়ার সময় তিনি হাজার পঞ্চাশ টাকা দিয়েছেন তমাকে। একটা খাট, আর আলমারি যেন কিনে নিতে পারে তাই।
সবুজ আনতে চায়নি। তমাকে সবুজ নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। তাই তমার বাবার উপর কোন চাপ দিতে চায়নি সে।
তবুও শেষ পর্যন্ত আনতে হয়েছে।
টাকাটা এনে খুব ভাল হয়েছে।
ঢাকা এক আজব শহর, এখানে যেমন লাখটাকায় খাট কেনা যায়, তেমনি হাজার পঞ্চাশ টাকায় সংসার সাজিয়ে ফেলা যায়।
তমা একটা খাট কিনেছে উনিশ হাজার টাকায়, সাথে হার্ডবোর্ডের আলমারী একটা দশহাজার টাকা।আলমারি কিনতে গিয়ে সবুজ একটা ড্রেসিং টেবিলও কিনে ফেললো বোর্ডের।
আর তমার জন্য একটা পড়ার টেবিল।
তারপরেও দশহাজার টাকা রয়ে গেল। সবুজ সেটা খরচ না করে ব্যাংকে রেখে দিয়েছে। পরে ফ্রিজ কেনার সময় কাজে লাগবে।
আর সংসারের প্রয়োজনীয় হাড়িকড়াই, ডিব্বা বয়াম, প্লেট গ্লাস সব সবুজ কিনেছে। তবে একসাথে বেশি কেনেনি। অল্প অল্প করে প্রয়োজনীয় জিনিসটা কেনা হয়েছে। বাকিটা পরে কেনা যাবে।

একটা ফ্রিজ কিনতে হবে জরুরী। ফ্রিজ না থাকায় বাজার করে রাখা যায় না। যেদিন সবুজ সকালে বাজারে যেতে পারে না, সেদিন ডিম ডাল খেতে হয়।

তমা ভাত দেখে আসে। আরো কিছু সময় লাগবে ভাত হতে।
তমার বারান্দায় দাড়িয়ে বাইরেটা দেখতে ভালোই লাগে।
শহুরে সকাল, বিকেল রাত।
সবটাই দেখা যায়।

শহরে সকাল হয় কখন!! এই শহরে জীবন কখনো থামে না।
প্রকৃতির নিয়মে সকাল হয়, রাত হয়, এক এক পর্যায়ে এক এক দলের মানুষ কাজে নামে। তবু সূর্য ওঠার সাথে সাথে শুরু হয় নিত্য নতুন জীবন,নিত্য নতুন গল্পের।
কত মানুষ হাঁটতে বের হয়, বের হয় বিভিন্ন বয়সের মহিলারা। হাটতে বের হয়ে ফেরার সময় বাজার নিয়ে বাসায় ফেরে। দুএকজন বয়স্ক দম্পতি একসাথে বের হন সকালে। দেখতে ভালো লাগে।

এই বারান্দা থেকে দেখা যায় তারকারইইইই বলে কাঁচা সবজি বিক্রেতা কয়েকজন ভ্যান নিয়ে যায় প্রতিদিন। মাঝে মাঝে দাড়িয়ে ভ্যানে রাখা সবজিতে পানি ছিটিয়ে দেয়।

এরপর আসে এ…শাআক, এ…শাআক বলতে বলতে শাকের ভ্যান। পালং শাক, লাল শাক, লাউ শাক, কুমড়ো শাক, কচু শাক আরো কত ধরনের শাক যে থাকে। তমা সব গুলো চিনেও না! সেদিন দেখলো বউত্তা শাক!! ছোট ছোট পাতা!

আসে দেশীই মুরগী বিক্রেতা!
ব্রয়লার মুরগির খাঁচা নিয়ে ঘোরা ভ্যানও আসে।
তেলাপিয়া, কাতলা আর হলুদ হয়ে যাওয়া চিংড়ি নিয়ে আসে মাছওয়ালা!

কাগজ কিনতে আসে ভাঙ্গারীই, পুরোনো কাপড় কিনতেও আসে ফেরিওয়ালা!

গ্যাসের চুলা সারাবেন?? বলে ডাকতে থাকা লোকটাও একদিন পর একদিন আসে!

তালা চাবি ঠিক করে যে লোকটা আর পাটা ধার করাবেন বলে চিৎকার করা লোকটাও আসে প্রতিদিন।
জীবন কত রকমের হয়।

শহুরে গল্প গুলো এমনই বৈচিত্র্যময়। গলির মাথায় যে রেস্টুরেন্ট, সেখানে কত ধরনের মানুষ নাস্তা করে সকালে!! বাসার বারান্দা থেকে দেখা যায়।
আর জীবন্ত সংবাদপত্র হচ্ছে বুয়া সমাজ। যে যে বাসায় কাজ করে, সে সব বাসার খবর জানিয়ে যায়।
এই তো সুফিয়া বুয়া এক বাসায় কাজ করে, যে বাসার মালিকের বউয়ের কিডনি নষ্ট। টাকা পয়সা আছে অনেক কিন্তু ট্রান্সপ্লান্ট করতে পারেনি!! ইন্ডিয়া গিয়ে ফেরত এসেছে!! সুফিয়া দার্শনিক ভাবে বলে, টেকায় কি অয় আপা, বাঁচতে পারবো না!

বাসার সামনের বাড়িটা ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তমা যখন এ বাসায় আসে,তখন থেকে ও জানলা দিয়ে দেখতো বাড়িটা। ঢাকাশহরে এমন দোতলা বাড়িগুলি বেশির ভাগই ডেভেলপারদের দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে।বাড়ির সামনে একটা শিউলি গাছ আর আর কাঠ বাদাম গাছ ছিল। লাল ইটের বাড়িটি এক সময়ের আভিজাত্য বহন করলেও এখন কিছুটা জরাজীর্ণ।এখনকার মালিকের অবস্থা ও বাড়িটার মতই, কোন এককালে তার দাদা ব্যবসা করে বাড়িটি কিনেছিলেন। ব্যবসা পরে যায় তার বাবার আমলেই। কিন্তু এখনকার মালিক যিনি, তাকে ছেলে না বলে লোক বলাই ভাল, তেত্রিশ বা চৌত্রিশ বছর বয়স হবে,সে কিছুই করে না।সারাদিন বাসায় বারান্দায় বসে থাকে, সিগারেট খায় , মাঝে মাঝে বাইক নিয়ে বের । তমার বাসার কেয়ারটেকার বলেছে, এই বাড়ি করে ছিলেন এক সচিব।। সচিব সাহেবের কাছ থেকে সেই ব্যবসায়ী কিনে নেয়, তার ব্যবসা লস হলেও বাড়ি ভাড়া দিয়ে উত্তর পুরুষ চলে যাবে।

বাড়ি ভাঙতে এসে প্রথমেই শিউলি গাছটা ন্যাড়া করে কেটে দেয়া হয়েছে।। কি পরিমান ফুল যে ফুটতো। সারা দিন টুপ টুপ করে পড়ছে। খুব সকালে রাস্তাটা সাদা হয়ে যেত ফুলে ফুলে। তমার মন ভাল হয়ে যেত। এই ভাল লাগা এরা বুঝবে না! এখানে এখন আটতলা এপার্টমেন্ট উঠবে। কিছু দিন হয়ত মন খারাপ লাগবে, তার পর আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

রাতে একসাথে খেতে বসা ছাড়া তমার সাথে গল্প করারও সময় হয় না সবুজের । বিছানায় শুয়ে পরলে সাথে সাথে গভীর ঘুমে আছন্ন হয়ে যায় সারাদিনের ক্লান্তিতে।

তমার সারাটা দিন একা একা কাটে। সকালে একবার বুয়া এসে কাজ করে যায়। বাকি সময়টা একাই থাকে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে অনেকটা সময় কাটে ওর। আজকাল গল্পের বইও একঘেয়ে লাগে!

তবে একা থাকতে তমার খুব একটা খারাপ লাগে না।
জানলা দিয়ে শহরের অন্যবাড়িগুলোর গল্প মনে মনে সাজানো যায়। তমা ভাবে লিখতে পারলে বেশ হতো, অনেক গুলো গল্প হয়ে যেত।

বাসার লাগোয়া মসজিদ । মসজিদ চারতলা কিন্তু ওর জানলার পাশে ইমাম সাহেবের কোয়ার্টার এর ছাদ। ছাদে ওঠা যায় না, পুরো ছাদ জুড়ে মেটে আলুর গাছ বেড়ে উঠেছে। আর আসে শালিক, চড়ুই। তমা মাঝে মাঝে চড়ুইদের সাথে কথা বলে। একটা চড়ুই এর পা ভাঙা, মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, এই তোর কষ্ট হয় না?

চড়ুই যেন উত্তর দেয়, না গো, অভ্যাস হয়ে গেছে এখন!!
জানলা দিয়ে একটা গোলাপি বাড়ি দেখা যায়, মনে হয় মালিক অনেক পয়সাওয়ালা লোক, ছাদটা চমৎকার করে সাজিয়েছে। করমচা গাছের ঝাড় এতদূর থেকেও বোঝা যায়। কাঠগোলাপ গাছটাও দেখা যায়। মাচা করে লাউ বা কুমড়ো কিছু একটা লাগানো। ও বাসার শুধু বুয়াকে দেখা যায়, ছাদে গিয়ে দাড়াতে। তমা ভাবে, যদি আমার বাসা হতো, আমি একটা দোলনা লাগাতাম। সন্ধ্যা নামার আগে বসতাম রোজ, এক মগ চা নিয়ে।
শহুরে জীবনটা তমা খুব চাইতো, গ্রামে এখন ভালো লাগেনা, সবই নগরায়নের ছোঁয়ায় ডিজিটাল হয়ে গিয়েছে। সেই শান্ত নিশ্চুপ পরিবেশ এখন নেই আর।

তার চেয়ে শহরই ভাল! ঢাকা শহরের একটা টান আছে! যতোই শহর ছেড়ে মানুষ পালাতে চায় বা বেড়াতে গিয়ে জীবন খোজে, কয়েকদিন পরই ঢাকায় ফেরার জন্য মন ছটফট করে ওঠে।

তমার ভাত হয়ে গিয়েছে।
ভাতটা মাড় ঝড়িয়ে রেখে দেয় তমা।

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 4 comments