4

চোখের আলোয় দেখেছিলেম -পর্ব ১

 

ট্রাকটা একদম রাস্তার মাঝখানে রেখেছে, ধ্রুব একটু সাইড করতে বল্ তো! দোতলায় ভাড়াটে এসেছে নাকি?

-হুম, আজ ওঠার কথা, আঠাশ তারিখ তো আজকেই?

ধ্রুব রথিকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো। প্রথম প্রশ্নকারী রথি, ধ্রুবর বন্ধু একই সাথে বাগদত্তা বলা চলে। দুজনের বন্ধুত্ব দেখে রথির বাসা থেকেই কথা বলেছিলো, ধ্রুবর সাথে রথির বিয়ের বিষয়ে, কিন্তু এখনো কিছু চুড়ান্ত হয়নি। তবুও সবাই অলিখিত ভাবেই জানে, রথি আর ধ্রুবর বিয়ে হবে।
দলটায় আরো তিনজন আছে, কল্লোল, তপন, শিমু।
মোট পাঁচজনের একটা মিউজিক গ্রুপ। নিজেরাই বিভিন্ন গান কভার করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করে। দলের নাম “গানের পাখি”, এই নামেই চ্যানেলটা খোলা।
ধ্রুব গীটার বাজায়, ভোকালিস্ট কল্লোল, বাকিরা কিবোর্ড, ড্রাম বাজায়। রথিও মাঝে মাঝে গান করে।

ধ্রুব তৌকির।ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস ফ্যাকাল্টি থেকে বিবিএ শেষ করেছে, এমবিএ পড়ছে। গানটা একদম শৌখিন।

ধ্রুবদের বাড়ির ছাদে একটা ঘরে ওরা মাঝে মাঝে আড্ডা জমায়। এই গ্রুপটার এ বাড়িতে অবাধ যাতায়াত। ধ্রুবদের বাড়িটা ” এল” প্যাটার্নের। গেট থেকে সরাসরি সোজা ধ্রুবদের ডুপ্লেক্স বাড়ির দরজা। রাস্তা একটু সাইড হয়ে গিয়েছে, সরাসরি দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। পুরোপুরি মেইন বাড়ি থেকে আলাদা করে দেওয়া দোতলার ভাড়া দেওয়া।অংশটা। ধ্রুবর বাবা সিনিয়র এডভোকেট। তার চেম্বার ভাড়া দেওয়া অংশের ঠিক নিচেই। একটু পুরোনো ধরনের বাড়ি, ধ্রুবর দাদার করা, বড় বড় পাল্লা দেওয়া দরজা জানালা। মেঝেটা লাল সিমেন্টের। একটা এন্টিক ভাব আছে, ভাড়া দেওয়ার অংশটা এতো বড় যে ফাঁকা হলে ভাড়া নিয়ে কেউ আসতে চায় না৷ ভাড়া পোষাতে পারে না। আর হুটহাট কাউকে ভাড়া দিতেও চান না ধ্রুবর বাবা হায়দার সাহেব।

বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে ধ্রুব ট্রাকের সামনে এসে বললো, একটু সাইড করে রাখলে ভালো হয়।

-কিন্তু সাইড করা যাবে না, চিকন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো অন্যপাশ থেকে। যে কথা বললো, ধ্রুব তাকে দেখতে পেলো না। সে সামনে এলো একটু পরে। একটা মেয়ে, বয়স কত হবে, ষোল বা সতেরো হতে পারে। কৈশোর পেরোনো সদ্য আসা যৌবন মেয়েটির শরীরের ভাঁজে ভাঁজে। ধ্রুবর প্রথমে চোখ গেলেও সে চোখ নামিয়ে নিলো।

মেয়েটা পরে আছে আলিফ লায়লায় মতো গোল সালোয়ার, টপস, মুখ আর মাথা ওড়না দিয়ে পেঁচানো।
শুধু চোখ বের হয়ে আছে, বড় বড় চোখ। একটা “ইয়া হাবিবি” ভাব আছে! ধ্রুবর হাসি পেলো। সেই সাথে অবাকও লাগলো, এতটুকু একটা মেয়ে, ট্রাক থেকে জিনিসপত্র নামানোর তদারকি করছে।

ধ্রুব কথা বাড়ালো না। ট্রাক সাইড করা যাবেনা, কারন জিনিসপত্র কিছু পাশে নামিয়ে রাখা হয়েছে। মেয়েটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধ্রুবকে দেখলো। চুল কিছুটা লম্বা, জিন্স আর ঢোলা শার্ট পরা, শার্টের বোতামের ফাঁক থেকে বুকের পশম দেখা যাচ্ছে, শার্টের হাতা গোটানো কনুই পর্যন্ত। রথি এসে হাত ধরে টানলো ধ্রুবকে, চল্, ছাদে যাই!

মেয়েটি নিজের কাজে মন দিলো। ধ্রুব আর খেয়াল করলো না মেয়েটিকে। মনে মনে ভেবে নিলো দরকার কি এতো খেয়াল করার! এই ভাবনায়ই হয়ত আড়াল থেকে কেউ হাসলেন, এখন এড়িয়ে যাওয়া মেয়েটিই ধ্রুবের  গল্পের প্রধান চরিত্র হতে চলেছে যে!

 

-সাবের সাহেব, ও হচ্ছে ধ্রুব, আমার মেজ ছেলে৷ আমার তিন ছেলে, বড় ছেলে শুভ কানাডা প্রবাসী, সে ইঞ্জিনিয়ার, ধ্রুব ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, সামনে মাস্টার্স দিবে, গান টান করে তাই চুল লম্বা আর কি, ওদের গানের দল আছে, আর ছোটটা তো স্কুলে পড়ে, আর মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি। জামাই লন্ডন থাকে, মেয়েকে নিয়ে যাবে সামনের বছর। ধ্রুবকেও পড়া শেষ হলে কানাডায় পাঠিয়ে দিবো।

যিনি কথাগুলো বলছেন, তিনি সুধাদের বাড়িওয়ালা। সুধারা আজ বাড়িতে নতুন ভাড়াটে হিসেবে উঠলো , বাড়িওয়ালার সাথে আলাপ করতে সুধার বাবা সুধাকে নিয়ে এসেছেন।

সুধার মা নেই, বাবা মেয়ের সংসার। সুধা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবে সামনের বছর৷ মা না থাকায় একটু উড়নচণ্ডী ধরণের, বাবা তেমন শাসন করেন না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ইঁচড়েপাকাও কিছুটা। সুধা আঁড়চোখে দেখে নিলো ধ্রুবকে। ধ্রুবকে দেখেই বেশ ভালো লেগে গেলো। এর সাথে মাঝে মাঝে দুষ্টমি করা যাবে। কিন্তু ধ্রুব তেমন পাত্তা দিলো না মনে হয়।

-ছাদটা ধ্রুবর দখলে, আপনাদের খুব প্রয়োজন হবে কি?

-না না, তেমন দরকার নেই। – সাবের সাহেব উত্তর দিলেন।

-ইপু, সুধা আপুকে নিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে আনো তো!

ইপু বাড়ির ছোট ছেলে, সেভেনে পড়ে। সুধার সাথে আলাপ জমলো ভালো। ইপুই সুধাকে ছাদে নিয়ে এলো।

-তোমাদের ছাদটা খুব সুন্দর। এই ঘরে কে থাকে?

ছাদের খোলা ঘরটা দেখিয়ে সুধা জিজ্ঞেস করলো।

ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, ইপু, ছাদে কি কাজ? বলেছি না অকারণে আসবি না ছাদে! সুধা উঁকি দিয়ে দেখলো ধ্রুব বসে আছে, আচ্ছা, ছাদটা তাহলে এনি দখল করে রেখেছে।

সুধা ইপুকে বললো, ইপু চলো নিচে চলে যাই।

ধ্রুব মুখ তুলো সুধাকে দেখলো, কিন্তু এই পর্যন্তই। আর বিশেষ কথা হলোনা সুধার সাথে।

 

★★★

নতুন বাসা গোছাতে সারাটা দিন কেটে গেলো। সুধার রুমটা সুধার খুবই পছন্দ হয়েছে, অদ্ভুত সুন্দর রুমটা, বড় বড় জানালা। এতো ভালো লাগছে, উইন্ড চার্মের টুংটাং শব্দ অদ্ভুত একটা সিম্ফোনি তৈরি করে যাচ্ছে। মোটামুটি গোছানো শেষ করে সুধা জানালায় এসে দাঁড়ালো। সুধার জানালা থেকে ওই পাশের আরেকটা বারান্দা দেখা যায়, বারান্দায় ঝুলানো অনেক অনেক টব৷ দূর থেকে সবুজ লাগে দেখতে।

সন্ধ্যা নামবে একটু পরেই, ও বারান্দায় একজন এসে দাঁড়িয়েছে, সেই ছেলেটা, ধ্রুব । সকালে গীটার হাতে বাড়িতে ঢুকেছিলো। এখন শুধু একটা থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট পরে আছে, আর কিছু দেখা যাচ্ছে না, অনাবৃত শরীর বোঝা যাচ্ছে। সুধার মনে দুষ্টুমি পেলো, দেহতত্ত্ব আর কামসূত্র কৈশোর পেরোনো সুধার কাছে নতুন বিষয়। ধ্রুব ভীষণ সুদর্শন, সুঠাম। সুধার শরীরে একটা কাঁপন লেগে গেলো, আশ্চর্য তো, ছেলেটা একদম অপরিচিত। পুরুষেরা নিজেদের শরীর নিয়ে সচেতন থাকে না। তাদেরও শালীনতা বজায় রাখা উচিৎ। মেয়েদেরও নজর খারাপ হতে পারে নয়তো! সুধার হাসি পেলো, এই ছেলেটা নিজের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। তাতে সে উদাম গায়ে থাকলেও বিশেষ সমস্যা নয়, সুধা যে তাকে দেখছে, এটা তো বুঝতে পারছে না ছেলেটা!
সকালে একটা মেয়ে খুব গায়ে ঢলে পড়ছিলো, কি যেন ডাকলো, রথি না কি যেন, সেই মেয়ে এই ছেলের গার্লফ্রেন্ড! হতে পারে, সুধা জানালা থেকে সরে এলো। নিজের বিছানায় একটু বসে চোখ বন্ধ করলো, চোখের সামনে ধ্রুব ভেসে উঠলো, সুধা চোখ মেলে ফেললো!
ছেলেটা কি মনে দোলা দিচ্ছে? ধূরো, এটা কোন ভাবার বিষয় হলো! সুধা অন্যদিকে মন ঘুরিয়ে ফেলে। ফোনটা হাতে নেয়। কিন্তু কেন যেন ঘুরে ফিরে সেই “গানের পাখি” চ্যানেলে গিয়ে আবারও ধ্রুবকে দেখার চেষ্টা করে।

 

……………চলবে

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 4 comments