2

চোখের আলোয় দেখেছিলেম- পর্ব ৫

 

ধ্রুবর জন্মদিনে সুধা উইশও করলো না। ওর বন্ধুরা এলো, হইচই, চিৎকার, গান আড্ডা সবই হলো শুধু সুধাকে কোথাও দেখলো না ধ্রুব। রথি রান্না করে নিয়ে এসেছে ধ্রুবর জন্য, ধ্রুবর মন টানলো না। কয়েকবার দরজার দিকে তাকালো, বাইরে গিয়ে সুধার জানালা দিকে তাকালো, আজ তো বাসায়ই আছে, মদনাকে বলা আছে, বাসার বাইরে গেলেই ফোন করবে ধ্রুবকে। ধ্রুব বলেছে সারাক্ষণই সুধাকে চোখে চোখে রাখতে, মাসে ১২০০ টাকা পাবে৷ মদনা খুশি মনে কাজটা করে যাচ্ছে, সুধা বাইরে গেলেই সব আপডেট ধ্রুব পেয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেলো, এগারোটার দিকে সবাই চলে গেলো। ধ্রুব একা একা সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিলো৷ মনটা খুবই ভার হয়ে আছে, সুধা আসলেই ওকে পছন্দ করে না। সেদিনটা একটা ভুল ছিলো, মেয়েটা সেভাবেই মন সেটঅাপ করে নিয়েছে। এটলিস্ট একটা “হ্যাপি বার্থডে” বললে কি হতো, এটা তো মিনিমান সৌজন্যতা। কয়েকবার রথি জিজ্ঞেস করেছে, ধ্রুব তোর মন খারাপ, কি হইছে, বল আমাকে!! ধ্রুবর ভীষণ বিরক্ত লেগেছে কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি। আজকাল রথির কোন কিছুই ভালো লাগছে না। এত টেককেয়ারও অসহ্য লাগছে, আর সুধার এই অবহেলা, অসৌজন্যতা, এগুলির পরেও মনটা ওর কাছে পড়ে থাকছে। কেমন অদ্ভুত বিষয় এটা!!
বুয়া লাইট অফ করতে এসে বললো, ভাইজান, দোতলার সুধা আপা একটা প্যাকেট দিয়া গেছে সন্ধ্যায়, ফ্রিজে রাখতে বলেছে। আপনাকে বলতে বলছেল, ভুইলা গেছি কামের ঠেলায়!
ধ্রুব লাফ দিয়ে উঠলো, সুধা এসেছিলো, ও কোথায় ছিলো!
কখন আসছিলো, আমাকে ডাকবেন না আপনে, ধুর খালা, কি যে করেন!!
ধ্রুব পারলে দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজের দরজা খুললো, ছোট একটা প্যাকেট, উত্তেজনায় ধ্রুবর দম বন্ধ হয়ে যাবে!
প্যাকেটটা খুলতেই একটা রেড ভেলভেট কেক বের হয়ে পড়লো, উপরে একটা গিটার!!
ধ্রুবর মনটা ভালো হয়ে গেলো, শেষ কবে এরকম সারপ্রাইজ পেয়েছে মনে করতে পারলো না। হ্যা বন্ধুরা সব সময়ই ধ্রুবর জন্য আছে, রথি সারপ্রাইজ দিয়ে কিছু করবে এটাই স্বাভাবিক। জানা থাকে তাই ভালো লাগলেও সারপ্রাইজ আর হয় না। কিন্তু সুধা! একদম আলাদা, ট্যালেন্টেড একটা মেয়ে, পুঁচকে মাথায় রাজ্যের হিজিবিজি বুদ্ধি জমিয়ে রাখে! রাখবেই তো, পড়াশোনা করে বলে তো মনে হয় না, কলেজে একদিন গেলে পাঁচদিন যায় না। পাশও করবে না মনে হয়!! দরকার নেই পাশ করার৷ ফেল করে ঘরে বসে থাক!! ধ্রুবর ফেলটুস বৌ ই বেশি পছন্দ!!
সুধা, একটু দাঁড়াও — ধ্রুব ডাকলো পেছন থেকে।
একটু কেন, বেশিই দাঁড়াই। বলুন কি বলবেন?
তোমাকে থ্যাঙ্কস, কেকটা খুব ইয়াম্মী ছিল!
আচ্ছা, ধন্যবাদ। আর কিছু?
কখন গিয়েছিলে বাসায়? আমি কই ছিলাম?
সেটা তো জানি না, সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম।
আজ পরীক্ষা আছে?
হ্যা, পরীক্ষা আছে।
পরীক্ষা সামনে নিয়েও আমার জন্য কষ্ট করলে, আবারও ধন্যবাদ।
আচ্ছা, আপনাকেও আবারও ওয়েলকাম।
আমি এখন যাই?
সুধা হাঁটা শুরু করলো, পাশে ধ্রুবও।
সুধা…
বলুন…
তুমি কি আমার উপর রেগে আছো?
কেন বলুন তো?
না কখনো কথা বলো না, ছাদেও যাওনা তেমন!
ছাদ তো তালা দেওয়া থাকে।
ওহ, শিট! আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আচ্ছা আমি খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।
ধন্যবাদ।
তোমার প্রিপারেশন কেমন?
একদম ভালো না, ফেল করবো!
আহারে আমার ফেলটু বউ – মনে মনে ধ্রুব আওরায়।
মুখে বলে, ফেল করা ভালো, সবাইকে কেন পাশ করতে হবে!
একদম ঠিক, আইসক্রিম খাবেন?
মানে?
মানে বলছিলাম আইসক্রিম খাবেন আপনি? আমি খাওয়াবো।
আচ্ছা খাওয়াও।
চলুন তাহলে!
তোমার পরীক্ষা?
দিবো না আজকে!
কলেজ ফাঁকি দিবে?
হু!!
ওকে, চলো কোথায় যাবে!!
ধ্রুবর খুব খুশি লাগছে, সুধা নিজে ওকে নিয়ে যাইতে চাইছে।
রিক্সা নিয়ে নি? অনেক দূরে যাবো!
কোথায়?
এই তো এই রাস্তার শেষে একটা বস্তি, তার পেছনে একটা বিল, সেখানে!!
ধ্রুব হতভম্ব হয়ে গেলো৷ ওখানে তুমি গিয়েছো আগে? ওই জায়গাটা খুব খারাপ!!
না যাইনি, আজ যাবো আপনার সাথে।
আচ্ছা অন্য কোথাও যাই, টিএসসি যাবে?
নাহ, থাক।
আচ্ছা ঠিকাছে, চলো যাই কোথায় যাবে?
নাহ, যাওয়ার ইচ্ছে নষ্ট হয়ে গেছে, আর যাবো না।কলেজে যাই বরং!
আজব তো, কি এমন বললাম যে ইচ্ছে নষ্ট হলো!!
জানি না, যাচ্ছি আমি!!
সুধা দ্রুত হেঁটে চলে গেলো, ধ্রুব দাঁড়িয়ে রইলো বোকার মতো।
******
সুধার জন্য ধ্রুব একটা চাবি বানিয়ে ফেলল। সকালে রিহার্সাল থেকে ফেরার সময় সুধাকে দেখেছে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে, ধ্রুবর একদম ভালো লাগেনি। সাথে ছিল রথি, রথি আবার একটু জিজ্ঞেসও করল, সুধার বয়ফ্রেন্ড নাকি?
ধ্রুব বলেছে, সে জানেনা।
সুধার সাথে কথা বলতে হবে।
সুধা, একটু দাঁড়াও- সুধা কলেজ থেকে ফিরেছে, ধ্রুব বাসার গেটে দাঁড়িয়ে ছিলো।
সুধা মেকি হাসি দিয়ে বললো, জ্বী বলুন ভাইয়া?
ধ্রুব পকেট থেকে দুটো চাবি বের করে দিলো। এটা রাখো। চাবির রিংটা একটা হার্টের অর্ধেক। সম্ভবত জোড়া রিং হবে, এর সাথে আরো একটা রিং আছে।
-এটা কিসের চাবি? – সুধা জিজ্ঞেস করলো।
-এটা ছাদের দরজার আর আমার রুমের চাবি!
-আপনাকে ধন্যবাদ, আপনার রুমের চাবি দিয়ে আমি কি করবো?
-মানে ছাদের চাবি যখন বানিয়েছি, তখন ঘরেরটাও করলাম। তাই আর কি!!
-আচ্ছা, কিন্তু ঘরটা মনে হয় আপনার ভীষণ ব্যক্তিগত। আমি যতদূর শুনেছি, আপনি বাসায় না থাকলে কেউ ঢুকলে আপনি খুব রেগে যান!
-হ্যা, ঠিক শুনেছো!
-তাহলে বাইরের একজনকে চাবি কেন দিচ্ছেন, আশ্চর্য!!
ধ্রুব মনে মনে বললো, তুমি এতো অল্পতে আশ্চর্য হও কেন সুধা, আমি তো আমার জীবনটাই তোমাকে দিয়ে বসে আছি, শুধু তাই না, আমার পুঁচকেটাও তো তোমার পেটের মধ্যে বসে আছে। খোদা মালুৃম কি করেছো তাকে!
ধ্রুব প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলো, তোমার শরীর ভালো আছে?
শরীর ভালো থাকবে না কেন, একদম ঠিকঠাক!!
ধ্রুবর খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে সুধার আরো ব্যক্তিগত বিষয়ে, কোন সমস্যা হয়েছে কিনা, বা যদি সত্যিই পুঁচকে চলে আসে, তাহলে কি করবে, কিন্তু সুধার ভাবভঙ্গির কাছে ধ্রুব হেরে যায়, জিজ্ঞেস করার সুযোগই দেয় না মেয়েটা। কেন সেদিন কাছে এসেছিলো তাহলে!
ধ্রুবর সবকিছু উল্টে পাল্টে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ধ্রুব বললো, আচ্ছা তুমি যাও।
ঠিক তখনি রথি ঢুকলো। ঢুকেই ধ্রুবর গলা জড়িয়ে জড়িয়ে বললো, যাসনি কেন প্রাকটিসে? ধ্রুব খুব অস্বস্তিতে পড়লো সুধার সামনে। সুধার দিকে আঁড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখলো চোখ দিয়ে হাসছে। ধ্রুব ছাড়িয়ে দিলো রথিকে। রথি খুব অবাক হলো, সবাই জানে ধ্রুর সাথে রথির বিয়ে হবে, তাই এসবে কেউ মাইন্ড করে না।
সুধার দিকে তাকিয়ে রথি মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলো, সুধা কেমন আছো?
জ্বী আপু, ভালো, আপনি ভালো আছেন?
হ্যা ভালো আছি আপু। – রথি উত্তর দিলো, তারপর বললো, গতকাল যে ছেলেটা ছিলো তোমার সাথে, কে সে? বিশেষ কেউ?
হ্যা বিশেষ কেউ , বন্ধু।
শুধু বন্ধু, নাকি বিএফ!
সুধা হাসলো একটু, বললো, আমার এমন ব্রলোক্স ছেলে পছন্দ না, এদের কোন টার্গেট নেই জীবনে, চাকরি করার চিন্তা নেই, ঘুরে ফিরে বেড়ায়, গান টান গায়, মানে সজীবও গান গায়, আপনাদের মিন করছি না কিন্তু। এরপর বাবা ধরে বড়ভাইয়ের কাছে বিদেশে পাঠিয়ে দিবে। ওখানে গিয়ে ম্যাকডোলান্ডস এ ওয়েটারের কাজ করবে।
এটা কোন কথা বলেন!
-তাহলে? বিদেশে গেলে তো মোটামুটি লাইফ সাজানো হয়ে যায়, আগে থেকে যদি রিলেটিভ থাকে!!
কষ্টটা কম হয় তুলনামূলক! তোমার পছন্দ না?
-না আপু, আমার একদম পছন্দ না, ছেলেদের এমন রিলাক্স দেখতে ভালো লাগে না আমার। পড়াশোনা শেষ করেছে, চাকরির চেষ্টা করবে, চাকরি না হলে ব্যবসা। ওর চাইতে ওই চায়ের দোকানদারও ভালো, নিজে চা বানিয়ে বউ বাচ্চা খাওয়াচ্ছে।
যাই হোক আমি যাচ্ছি আপু–সুধা চাবিটা নিয়ে চলে গেলো।
ধ্রুব একটু ধাক্কা খেলো, কথাগুলো সুধা কাকে বললো, ওকে বলেনি তো!! তবুও ধ্রুবর একটু ভালো লাগলো, যাক চাবিটা তাও নিয়েছে।
-রথি, রাস্তার মাঝখানে মানুষের সামনে গায়ে পড়াটা আমার পছন্দ না, তোকে কতদিন বলেছি!
-সরি সরি বাবু, এমন হবে না আর, সত্যি বলছি!
-তুই আগেও বলেছিস, কিন্তু মনে রাখিস না।
-কি করবো বল, তোকে দেখলেই আমার চকলেট চকলেট লাগে!! মনে হয় জড়িয়ে ধরি!!
-কথার কি শ্রী, যা ভাগ!!
-ধ্রুব, তুই অনেক পাল্টে গেছিস। আগে এভাবে কথা বলতি না।
ধ্রুব সচেতন হয়ে গেলো, রথি একটা সমস্যা, সুধা রথির বিষয়ে জানে, এজন্যই হয়ত ধ্রুবর কাছে আসে না। কাছে আসে না ঠিক আছে কিন্তু সেটা তো মনের কাছে আসে না। সেদিন এতো বেশি কাছে আসলো, নিজেকে উজাড় করে ভালোবাসলো ধ্রুবকে, পরে বললো এটা একটা সময়ের ভুল৷ মেয়েটা এতো অদ্ভুত কেন, অন্য মেয়েদের মতো নেকুপুষু হলেই ভালো হতো, ধ্রুব চট করে বিয়ে করে নিতো সুধাকে, তারপর প্রতিদিন সুধা ওকে আদর করতো। উফফ, শুধু এসব কথাই মাথায় ঘোরে, আগে তো এমন হতো না৷ সুধা কি যে করেছে ধ্রুবকে, পুঁচকে মেয়ে, এতো ভালোবাসা কোথায় শিখলো কে জানে!
ধ্রুব অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
-এই ধ্রুব, গতকাল যে চাবিটা বানালি, দিলি না তো আমাকে!!
-তোর চাবি লাগবে কেন? আর তুই যখন আসিস, আমি তো থাকিই!!
-তবু চাবিটা আমাকে দে, এটার মধ্যে একটা কর্তৃত্ব আছে, তুই বুঝবি না।
-না, আমার ঘরে আমি না থাকলে কেউ যাক আমার পছন্দ না।
-সবাই আর আমি এক?
-হ্যা, এক্ষেত্রে এক।
ধ্রুব কঠিনভাবে বললো, রথি সামলে নিলো নিজেকে। ধ্রুব আসলেই ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্যকারো হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। থাক, না দিতে চায় না দিক, কয়েকটা দিন পরেই গো পুরোটাই রথির হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 2 comments