5

চোখের আলোয় দেখেছিলেম- পর্ব ৩

 

দুদিন কেটে গেলো, সুধাকে দেখেনি ধ্রুব। ওর কি ক্লাশ বন্ধ নাকি বাড়িতে বসে আছে! সুধার জন্য অস্থিরতায় অন্যমনস্ক হয়ে যায় ধ্রুব। কোনকিছুতেই মন বসে না। তৃতীয় দিন সুধা কলেজে গেলো, ধ্রুব সেদিন ঘড়ি ধরে সুধার কলেজ ছুটির সময় সামনে দাঁড়ালো। কোনদিনও এভাবে দাঁড়ায়নি কারো জন্য। সুধা বের হতেই ওকে ডাকলো ধ্রুব,

-সুধা, কিছু কথা ছিলো!

-জি বলুন?

-তুমি ঠিক আছো?

-হ্যা, একদম, কেন?

-মানে তোমার কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাতে পারো। আমি খুবই দুঃখিত, আসলে কি যে হয়ে গেলো সেদিন, তুমিও তো কোন বাঁধা দাওনি!

-দেখুন আমার সমস্যা আমি সমাধান করতে পারি, আপনাকে দরকার হবে না।

-তুমি বুঝতে পারছো না, তোমার কোন মেডিকেল হেল্প লাগবে?

-মেডিকেল হেল্প কেন লাগবে? কনসিভ করলে এবর্শন করিয়ে দিবেন, তাই?

ধ্রুবর মাথায় রক্ত উঠে গেলো, মেয়েটা এতো নির্লিপ্ত কেন?
আর ওকে এতো খারাপ ভাবছে কেন!অবশ্য এর চাইতে ও ভাববেই বা কি, ও তো ভালো কিছু করেনি সুধার সাথে!

-আমাকে এতো ছোটমনের মনে হয় তোমার!

-শুনুন ধ্রুব ভাইয়া, সেদিনকার বিষয়টা একটা দুর্বল মুহূর্তের ভুল, আমি মনে রাখিনি, আপনিও ভুলে যান। আমি জানি আপনি রথি আপুকে ভালোবাসেন, তাই আমি আপনাদের মাঝে আসবো না কখনো, আমার সমস্যা আমি সমাধান করতে পারি। ক্লাশ থ্রিতে পড়ার সময় আমার মা মারা গেছে, আমি শক্ত মেয়ে, এসবে আমাকে দুর্বল করতে পারবে না।

-এসব কথা বিশ্বাস করা যেতো কিন্তু তুমি তো তেমন নও, আমি তোমাকে স্পর্শ করে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার আগে কেউ ছুঁয়ে দেখেনি তোমাকে। তুমি কেন আমাকে এভয়েড করতে চাইছো, আমি তো কোন দায় এড়াতে চাইছি না! তোমার জন্য যা করা দরকার আমি সেভাবেই তোমার পাশে থাকবো!

রহস্যময় হাসিতে সুধার মুখ ভরে গেলো। সে বললো, দায় এড়াতে বা দায় নিতে হবে না আপনার। আপনি যেমন আছেন, তেমনি থাকুন না!

সুধাকে বুঝতে পারলো না ধ্রুব, শুধু একটা বিষয় বুঝতে পারলো, সুধা তোলপাড় করে দিয়েছে বুকের ভেতরে। রথি পারেনি এমন! সুধাকে নিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে করছে, বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে, আরো ইচ্ছে করছে, সেদিনকার মতো সুধার আদর পেতে। সুধা ময় পুরোটা ধ্রুবর জগত, মনে মনে দুজনের মাঝে অদৃশ্য একটা ছোট্ট মানুষকেও ধ্রুব কল্পনা করে নেয়। গানের আড্ডায় মন বসে না। বারান্দা দিয়ে সুধার ঘরে তাকায়, সুধাকে দেখা যায় না।
এতো রহস্য কেন এই মেয়েটার? মেয়েদের নাকি সব রহস্য শরীরে কিন্তু কই, সবটা পেয়েও সুধাকে পাচ্ছে না কেন ধ্রুব!

 

******

সুধাকে ফলো করা শুরু করলো ধ্রুব ।মেয়েটা কলেজে প্রতিদিন যায় না। দুটো কোচিং করে, ইংরেজির জন্য “সানশাইনে” যায় আর সায়েন্স পড়তে “কোয়ান্টাম” কোচিংএ। কোয়ান্টামে দুই আড়াই ঘন্টা থাকে। কলেজ ছুটি হয় দুইটায়। সুধা একদিন টিউশনে না গেলেই ধ্রুব চিন্তায় পড়ে যায়, কোন সমস্যা হলো না তো!
গানের জলসায় অন্যমনস্ক হয়ে যায় ধ্রুব। মাঝে মাঝে রথি বাসায় আসে কিন্তু ধ্রুব এড়িয়ে যায়। সুধা ছাড়া কাউকে ভালো লাগছে না। সুধা একটু আসেও না আর ছাদে যে পর সাথে দুটো কথা বলবে। প্রতিদিন কলেজের সামনে দাঁড়ালে কেমন হয়!

সিঁড়িতে দেখা হলেও সুধা মাথা নিচু করে চলে যায়। সেদিন হঠাৎ দেখেছিলো মাথায় টাওয়েল বেঁধে জানালায় দাঁড়িয়েছে সুধা। ইশ কি সুন্দর লাগছিলো!
ধ্রুব রাতে একা একা সুধাকে কল্পনা করে। অনাবৃত রহস্যময় সুধাকে, কোন একদিন সে অনেক ফেনা তুলে শাওয়ার নিবে সুধার সাথে। সুধা সেদিনের মতো আদর করবে তাকে!! কিন্তু রথি? রথির সাথে তো সম্পর্ক আছে ধ্রুবর! ধ্রুব বুঝতে পারে, এটা আসলে ভালোবাসা নয়, ভালোবাসা অন্য কিছু, ভালোবাসা হলো নেশা, যে নেশা সুধা ধরিয়ে দিয়েছে তাকে।

সেদিন বাসায় একটা প্রোগ্রাম ছিলো, অনেক গেস্ট আসবে, সুধাদের নিমন্ত্রণ ছিলো কিন্তু সুধা আসবে না জানিয়ে দিলো একবারেই। তার এতো লোকজন ভালো লাগে না। বাবা রাতে এসে দেখা করে আসবে। ধ্রুবর মা একটা ট্রে তে করে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন সুধাকে। একা একা থাকে মেয়েটা, মা নেই। তার মায়া লাগে।

রথি সহ অন্য সবাইকে ধ্রুব ছাদে পাঠিয়ে দেয়। তারপর নিজেই ট্রে নিয়ে চলে যায় সুধাদের বাসায়। এই সুযোগে দু’মিনিট কথা বলে আসবে ওর সাথে।

ধ্রুব কলিংবেল বাজালো না৷ কড়া নাড়লো। বাড়িটা পুরোনো ধরনের বলে দুই পাল্লার দরজা জানালা, পেস্ট কালার করা৷ সুধা মাত্রই ভাত নিয়ে টিভির সামনে বসেছিলো। ইউটিউবে উত্তম সূচিত্রার “হারানো সুর” চলছে।

দরজা খুলে সুধা দেখলো ধ্রুবর হাতে একটা ট্রে। সুধাকে ধ্রুব একটু হেসে বললো, মা পাঠিয়ে দিলেন, তুমি তো আসলে না।

সুধা অল্প হেসে বললো, এতো লোকজন আমার ভালো লাগে না। আসুন ভেতরে আসুন।

ধ্রুব প্রথমবার সুধাদের বাসায় ঢুকলো। এর আগে কখনো আসার প্রয়োজন হয়নি। আজ বুয়াই নিয়ে আসছিলো খাবারটা। বুয়াকে কিচেনে পাঠিয়ে ধ্রুব ইচ্ছে করে এসেছে। বাসায় অনেক গেস্ট। ধ্রুবর বন্ধুরা সবাই ছাদে। শুধু ধ্রুবই একটু অদ্ভুত আচরণ করে সুধার বাসায় খাবার নিয়ে চলে এসেছে, কেউ টের পায়নি।

ধ্রুব ঢুকতে ঢুকতে বললো, সুধা, প্লেট বাটি দিয়ে দাও।

-এখনি দিতে হবে? একটু পরে দিয়ে আসি?

টি টেবিলের উপর প্লেটে ভাত আর লাল রঙের একটা ভর্তা দেখে ধ্রুব বললো, খেতে বসেছিলে।

-হ্যা।

-সমস্যা নেই, আমি বসছি, তুমি খাওয়া শেষ করে দাও।

-আমার খেতে অনেক সময় লাগে।

-অসুবিধা নেই।

-আমি আসলে কারো সামনে বসে খাই না।
আপনি একটু বসুন, আমি এনে দিচ্ছি।

-আচ্ছা, এটা কি ভর্তা?

-রসুন ভর্তা

-শুধু রসুন ভর্তা খাচ্ছো?

-হ্যা, ডালও আছে, মাসের শেষ তো, বাবা বাজার করতে পারেনি।

ধ্রুব অবাক হলো৷ এতো বড় বাসায় এত ভাড়া দিয়ে থাকছে, অথচ বাজার করা হচ্ছে না!

-অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমি ছোট বাসায় থাকতে পারি না, একা একা থেকেছি তো ছোটবেলা থেকে, বাসা গুছিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে ভালো লাগে আমার। তাই বাসা ভাড়াটা আমরা একটু বেশি বাজেট করি, অন্যদিক থেকে ম্যানেজ করে ফেলি।

ধ্রুব আরো অবাক হলো। সেদিনটার পর থেকে সুধাকে আরো জানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সুধা ধরা দিচ্ছে না। বার বার বিভিন্ন অজুহাতে পিছলে যাচ্ছে।
সুধা প্লেট বাটি এনে দিলো৷
ইনডিরেক্টলি বলা, এখন আপনি ভাগেন।
ধ্রুবর আর একটু থাকার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু সেটা আর হলো না!

 

**********

মদনা, এদিকে আয়। একটা কাজ করে দিবি, দুইশ টাকা পাবি—মদনাকে ডাকলো ধ্রুব।
মদনা এলাকার ভ্যাগাবন্ড টাইপের ছেলে, সবার ফাই ফরমায়েশ খাটে। ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে কি করতে হবে। কাল সুধার রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া দেখে মনটা কেমন যেন লাগছে, কোনদিনই এমন ভাবতেও পারেনি ধ্রুব। খাওয়া নিয়ে এখনো নখরা করে, মাছ থাকলে মাংস চায়, মাংস থাকলে ডিম। আর এতটুকু মেয়ে, বাজার নেই বলে রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে নিচ্ছে!
ধ্রুব অনেক ভেবে একটা উপায় বের করেছে, জিজুর পাঠানো পাউন্ড ভাঙিয়ে রাখা ছিলো, সেখান থেকে হাজার পাঁচেক টাকার মাছ কিনে ধ্রুব মদনাকে দিয়ে পাঠাবে। মদনা বলবে, মাছের দাম খুবই সস্তা পেয়ে সে কিনে ফেলছে, এখন হাজার দুই হলে সে বেচতে পারে।
তাহলে এতো মাছ নিশ্চয়ই সুধার বাবা কিনে ফেলবে।
তার কাছে নিশ্চয়ই দুহাজার টাকা আছে।

মদনাকে দুইশ টাকা আগে দিয়ে দিলো ধ্রুব। বাজারে নিয়ে ভেটকি, রুই, তপস্বী, ট্যাংরা সহ পাঁচ রকমের মাছ কিনে ফেললো।
বিকেলে অপেক্ষা করতে লাগলে, সুধার বাবা কখন ফেরেন অফিস থেকে।

সাবের সাহেব ফিরলেন ছয়টার একটু পরে। বেশ বড় একটা গাড়ি তাকে নামিয়ে দিলো, মদনা গিয়ে সামনে দাঁড়ালো, ও স্যার, খুব বিপদে পড়ছি, একজন মাছ কিনতে দিয়া ফুটছে, এহন এতো মাছ কি করমু, হাজার দুই হইলে বেচতে পারি!!

সাবের সাহেব ইতস্তত করতে লাগলেন দেখে ধ্রুব এগিয়ে এলো। কিরে মদনা, কি হইছে!! এতো মাছ কি করবি!

মদনা আবার পুরো কাহিনী খুলে বললো!

সাবের সাহেবকে ধ্রুব বললো, আঙ্কেল আপনি নিয়ে নিতে পারেন। মদনা ভালো ছেলে!!

সাবের সাহেব বললেন, হ্যা বাবা সেটা তো বুঝতে পারছি,।কিন্তু এতো মাছ কিনে আমি কি করবো, সুধা মাছ খায় না। যেদিন মাছ রান্না হয়, সেদিন সে ভর্তা ডাল করে খায়! ও খায় না বলে আমিও খুব কম কিনি। এই তো পরশুই টুকটাক কিনলাম মাছ মাংস। এখন তো ফ্রিজও ফাঁকা নেই!!

ধ্রুব পুরো বোকা বনে গেলো, ঠিকই তো, এতো বড় গাড়িতে করে যে অফিসে আসা যাওয়া করে, তার মাসের শেষ বলে বাজার করার টাকা থাকবে না!! এটা কি হয় নাকি!!
সুধা ওকে পুরোপুরি বুদ্ধু বানিয়েছে!!
অবশ্য ও তো পিচ্চি একদম , ওর মাথায় এসব শয়তানী বুদ্ধি ঘুরবে এটাই স্বাভাবিক!!

সাবের সাহেব চলে গেলেন, মদনা জিজ্ঞেস করলো, ভাই মাছ গুলান কি করবো!!

-যা ভিতরে দিয়া আয় আম্মার কাছে, ভাগ!!

ধ্রুব মুখ বেজার করে দাঁড়িয়ে রইলো কতক্ষণ!

শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 5 comments