চোখের আলোয় দেখেছিলেম-পর্ব ৪

 

সাধারণত প্রথমবার অপ্রত্যাশিত শারিরীক সম্পর্কের পরে মেয়েরা দুশ্চিন্তায় পড়ে কিন্তু ধ্রুবর ক্ষেত্রে উল্টো হলো। তার কেবলি চিন্তা হতে লাগলো সুধার জন্য। বারবার সুধাকে এক নজর দেখার জন্য মন উতলা হতে লাগলো।
ওর সাথে কথা বলতে হবে তো, মেয়েটা কি করবে, কোন সমস্যা হয় যদি।
ধ্রুব ঠিক করে ফেললো সুধা কখন কোথায় যায় এটা সে ফলো করবে। মাথায় চিন্তা ঢুকে গেলো, সুধা যদি কনসিভ করে, তাহলে মেয়েটা কি করবে! এতো বাচ্চা মেয়ে, ও কি বুঝবে কি করতে হবে না হবে, তারপর যদি ওর বড় কোন ক্ষতি হয়ে যায়! ওকে যে একটু বুঝিয়ে বলবে, তার কোন উপায় নেই। এসব বিষয়ে তো হুট করে কথা বলা যায় না, একটু স্পেস দরকার। ধ্রুব চিন্তা করে আমার মতো মনে হয় একটাও গাধা আর পোড়াকপাল আর কারো নাই, কোন সম্পর্ক নাই, হুট করে ওই বিষয়টা হয়ে গেলো! আর সুধাও কেমন, একটু কান্না কাটি করলো না, বাঁধা দিলো না! কারো সাথে বিষয়টা শেয়ারও করা যাচ্ছে না। হয়ত প্রেম না থাকলেও অন্য কোন টান আছে, হয়ত মেয়েটাকে মনে মনে পছন্দ করতো! প্রচন্ড চিন্তা হচ্ছে, সুধাকে সামনে আনা যাবে না। ধ্রুবকেই সবটা সামলাতে হবে।
কেমন আজিব মেয়েরে বাবা, কোন চিন্তা ভাবনা নেই! আচ্ছা সুধা কি ওকে পছন্দ করে, পছন্দ না করলে, এতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাছে এলো কেন! ধ্রুব সুধাকে নিয়ে দুয়েকবার ভাবেনি তা নয়, কিন্তু সেটা প্রেম নয়, এমনিতে মেয়েটা একটু ডেসপারেট, দেখতে সুন্দর, সেটা চোখে পড়েছে! আচ্ছা সুধাকে নিয়ে এই কয়েকটা দিন এতো ভেবেছে, কই রথির কথা তো এতো মনে হয়না কখনো! রথির সাথে কি আসলেই ধ্রুবর কোন মনের সম্পর্ক আছে, ধ্রুব বুঝতে পারছে না একদম!
দুদিন কেটে গেলো, সুধাকে দেখেনি ধ্রুব। ওর কি ক্লাশ বন্ধ নাকি বাড়িতে বসে আছে! সুধার জন্য অস্থিরতায় অন্যমনস্ক হয়ে যায় ধ্রুব। কোনকিছুতেই মন বসে না। তৃতীয় দিন সুধা কলেজে গেলো, ধ্রুব সেদিন ঘড়ি ধরে সুধার কলেজ ছুটির সময় সামনে দাঁড়ালো। কোনদিনও এভাবে দাঁড়ায়নি কারো জন্য। সুধা বের হতেই ওকে ডাকলো ধ্রুব,
-সুধা, কিছু কথা ছিলো!
-জি বলুন?
-তুমি ঠিক আছো?
-হ্যা, একদম, কেন?
-মানে তোমার কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাতে পারো। আমি খুবই দুঃখিত, আসলে কি যে হয়ে গেলো সেদিন, তুমিও তো কোন বাঁধা দাওনি!
-দেখুন আমার সমস্যা আমি সমাধান করতে পারি, আপনাকে দরকার হবে না।
-তুমি বুঝতে পারছো না, তোমার কোন মেডিকেল হেল্প লাগবে?
-মেডিকেল হেল্প কেন লাগবে? কনসিভ করলে এবর্শন করিয়ে দিবেন, তাই?
ধ্রুবর মাথায় রক্ত উঠে গেলো, মেয়েটা এতো নির্লিপ্ত কেন?
আর ওকে এতো খারাপ ভাবছে কেন!অবশ্য এর চাইতে ও ভাববেই বা কি, ও তো ভালো কিছু করেনি সুধার সাথে!
-আমাকে এতো ছোটমনের মনে হয় তোমার!
-শুনুন ধ্রুব ভাইয়া, সেদিনকার বিষয়টা একটা দুর্বল মুহূর্তের ভুল, আমি মনে রাখিনি, আপনিও ভুলে যান। আমি জানি আপনি রথি আপুকে ভালোবাসেন, তাই আমি আপনাদের মাঝে আসবো না কখনো, আমার সমস্যা আমি সমাধান করতে পারি। ক্লাশ থ্রিতে পড়ার সময় আমার মা মারা গেছে, আমি শক্ত মেয়ে, এসবে আমাকে দুর্বল করতে পারবে না।
-এসব কথা বিশ্বাস করা যেতো কিন্তু তুমি তো তেমন নও, আমি তোমাকে স্পর্শ করে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার আগে কেউ ছুঁয়ে দেখেনি তোমাকে। তুমি কেন আমাকে এভয়েড করতে চাইছো, আমি তো কোন দায় এড়াতে চাইছি না! তোমার জন্য যা করা দরকার আমি সেভাবেই তোমার পাশে থাকবো!
রহস্যময় হাসিতে সুধার মুখ ভরে গেলো। সে বললো, দায় এড়াতে বা দায় নিতে হবে না আপনার। আপনি যেমন আছেন, তেমনি থাকুন না!
সুধাকে বুঝতে পারলো না ধ্রুব, শুধু একটা বিষয় বুঝতে পারলো, সুধা তোলপাড় করে দিয়েছে বুকের ভেতরে। রথি পারেনি এমন! সুধাকে নিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে করছে, বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে, আরো ইচ্ছে করছে, সেদিনকার মতো সুধার আদর পেতে। সুধা ময় পুরোটা ধ্রুবর জগত, মনে মনে দুজনের মাঝে অদৃশ্য একটা ছোট্ট মানুষকেও ধ্রুব কল্পনা করে নেয়। গানের আড্ডায় মন বসে না। বারান্দা দিয়ে সুধার ঘরে তাকায়, সুধাকে দেখা যায় না।
এতো রহস্য কেন এই মেয়েটার? মেয়েদের নাকি সব রহস্য শরীরে কিন্তু কই, সবটা পেয়েও সুধাকে পাচ্ছে না কেন ধ্রুব!
 সুধাকে ফলো করা শুরু করলো ধ্রুব ।মেয়েটা কলেজে প্রতিদিন যায় না। দুটো কোচিং করে, ইংরেজির জন্য “সানশাইনে” যায় আর সায়েন্স পড়তে “কোয়ান্টাম” কোচিংএ। কোয়ান্টামে দুই আড়াই ঘন্টা থাকে। কলেজ ছুটি হয় দুইটায়। সুধা একদিন টিউশনে না গেলেই ধ্রুব চিন্তায় পড়ে যায়, কোন সমস্যা হলো না তো!
গানের জলসায় অন্যমনস্ক হয়ে যায় ধ্রুব। মাঝে মাঝে রথি বাসায় আসে কিন্তু ধ্রুব এড়িয়ে যায়। সুধা ছাড়া কাউকে ভালো লাগছে না। সুধা একটু আসেও না আর ছাদে যে পর সাথে দুটো কথা বলবে। প্রতিদিন কলেজের সামনে দাঁড়ালে কেমন হয়!
সিঁড়িতে দেখা হলেও সুধা মাথা নিচু করে চলে যায়। সেদিন হঠাৎ দেখেছিলো মাথায় টাওয়েল বেঁধে জানালায় দাঁড়িয়েছে সুধা। ইশ কি সুন্দর লাগছিলো!
ধ্রুব রাতে একা একা সুধাকে কল্পনা করে। অনাবৃত রহস্যময় সুধাকে, কোন একদিন সে অনেক ফেনা তুলে শাওয়ার নিবে সুধার সাথে। সুধা সেদিনের মতো আদর করবে তাকে!! কিন্তু রথি? রথির সাথে তো সম্পর্ক আছে ধ্রুবর! ধ্রুব বুঝতে পারে, এটা আসলে ভালোবাসা নয়, ভালোবাসা অন্য কিছু, ভালোবাসা হলো নেশা, যে নেশা সুধা ধরিয়ে দিয়েছে তাকে।
 সেদিন বাসায় একটা প্রোগ্রাম ছিলো, অনেক গেস্ট আসবে, সুধাদের নিমন্ত্রণ ছিলো কিন্তু সুধা আসবে না জানিয়ে দিলো একবারেই। তার এতো লোকজন ভালো লাগে না। বাবা রাতে এসে দেখা করে আসবে। ধ্রুবর মা একটা ট্রে তে করে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন সুধাকে। একা একা থাকে মেয়েটা, মা নেই। তার মায়া লাগে।
রথি সহ অন্য সবাইকে ধ্রুব ছাদে পাঠিয়ে দেয়। তারপর নিজেই ট্রে নিয়ে চলে যায় সুধাদের বাসায়। এই সুযোগে দু’মিনিট কথা বলে আসবে ওর সাথে।
ধ্রুব কলিংবেল বাজালো না৷ কড়া নাড়লো। বাড়িটা পুরোনো ধরনের বলে দুই পাল্লার দরজা জানালা, পেস্ট কালার করা৷ সুধা মাত্রই ভাত নিয়ে টিভির সামনে বসেছিলো। ইউটিউবে উত্তম সূচিত্রার “হারানো সুর” চলছে।
দরজা খুলে সুধা দেখলো ধ্রুবর হাতে একটা ট্রে। সুধাকে ধ্রুব একটু হেসে বললো, মা পাঠিয়ে দিলেন, তুমি তো আসলে না।
সুধা অল্প হেসে বললো, এতো লোকজন আমার ভালো লাগে না। আসুন ভেতরে আসুন।
ধ্রুব প্রথমবার সুধাদের বাসায় ঢুকলো। এর আগে কখনো আসার প্রয়োজন হয়নি। আজ বুয়াই নিয়ে আসছিলো খাবারটা। বুয়াকে কিচেনে পাঠিয়ে ধ্রুব ইচ্ছে করে এসেছে। বাসায় অনেক গেস্ট। ধ্রুবর বন্ধুরা সবাই ছাদে। শুধু ধ্রুবই একটু অদ্ভুত আচরণ করে সুধার বাসায় খাবার নিয়ে চলে এসেছে, কেউ টের পায়নি।
ধ্রুব ঢুকতে ঢুকতে বললো, সুধা, প্লেট বাটি দিয়ে দাও।
-এখনি দিতে হবে? একটু পরে দিয়ে আসি?
টি টেবিলের উপর প্লেটে ভাত আর লাল রঙের একটা ভর্তা দেখে ধ্রুব বললো, খেতে বসেছিলে।
-হ্যা।
-সমস্যা নেই, আমি বসছি, তুমি খাওয়া শেষ করে দাও।
-আমার খেতে অনেক সময় লাগে।
-অসুবিধা নেই।
-আমি আসলে কারো সামনে বসে খাই না।
আপনি একটু বসুন, আমি এনে দিচ্ছি।
-আচ্ছা, এটা কি ভর্তা?
-রসুন ভর্তা
-শুধু রসুন ভর্তা খাচ্ছো?
-হ্যা, ডালও আছে, মাসের শেষ তো, বাবা বাজার করতে পারেনি।
ধ্রুব অবাক হলো৷ এতো বড় বাসায় এত ভাড়া দিয়ে থাকছে, অথচ বাজার করা হচ্ছে না!
-অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমি ছোট বাসায় থাকতে পারি না, একা একা থেকেছি তো ছোটবেলা থেকে, বাসা গুছিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে ভালো লাগে আমার। তাই বাসা ভাড়াটা আমরা একটু বেশি বাজেট করি, অন্যদিক থেকে ম্যানেজ করে ফেলি।
ধ্রুব আরো অবাক হলো। সেদিনটার পর থেকে সুধাকে আরো জানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সুধা ধরা দিচ্ছে না। বার বার বিভিন্ন অজুহাতে পিছলে যাচ্ছে।
সুধা প্লেট বাটি এনে দিলো৷
ইনডিরেক্টলি বলা, এখন আপনি ভাগেন।
ধ্রুবর আর একটু থাকার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু সেটা আর হলো না!
মদনা, এদিকে আয়। একটা কাজ করে দিবি, দুইশ টাকা পাবি—মদনাকে ডাকলো ধ্রুব।
মদনা এলাকার ভ্যাগাবন্ড টাইপের ছেলে, সবার ফাই ফরমায়েশ খাটে। ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে কি করতে হবে। কাল সুধার রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া দেখে মনটা কেমন যেন লাগছে, কোনদিনই এমন ভাবতেও পারেনি ধ্রুব। খাওয়া নিয়ে এখনো নখরা করে, মাছ থাকলে মাংস চায়, মাংস থাকলে ডিম। আর এতটুকু মেয়ে, বাজার নেই বলে রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে নিচ্ছে!
ধ্রুব অনেক ভেবে একটা উপায় বের করেছে, জিজুর পাঠানো পাউন্ড ভাঙিয়ে রাখা ছিলো, সেখান থেকে হাজার পাঁচেক টাকার মাছ কিনে ধ্রুব মদনাকে দিয়ে পাঠাবে। মদনা বলবে, মাছের দাম খুবই সস্তা পেয়ে সে কিনে ফেলছে, এখন হাজার দুই হলে সে বেচতে পারে।
তাহলে এতো মাছ নিশ্চয়ই সুধার বাবা কিনে ফেলবে।
তার কাছে নিশ্চয়ই দুহাজার টাকা আছে।
মদনাকে দুইশ টাকা আগে দিয়ে দিলো ধ্রুব। বাজারে নিয়ে ভেটকি, রুই, তপস্বী, ট্যাংরা সহ পাঁচ রকমের মাছ কিনে ফেললো।
বিকেলে অপেক্ষা করতে লাগলে, সুধার বাবা কখন ফেরেন অফিস থেকে।
সাবের সাহেব ফিরলেন ছয়টার একটু পরে। বেশ বড় একটা গাড়ি তাকে নামিয়ে দিলো, মদনা গিয়ে সামনে দাঁড়ালো, ও স্যার, খুব বিপদে পড়ছি, একজন মাছ কিনতে দিয়া ফুটছে, এহন এতো মাছ কি করমু, হাজার দুই হইলে বেচতে পারি!!
সাবের সাহেব ইতস্তত করতে লাগলেন দেখে ধ্রুব এগিয়ে এলো। কিরে মদনা, কি হইছে!! এতো মাছ কি করবি!
মদনা আবার পুরো কাহিনী খুলে বললো!
সাবের সাহেবকে ধ্রুব বললো, আঙ্কেল আপনি নিয়ে নিতে পারেন। মদনা ভালো ছেলে!!
সাবের সাহেব বললেন, হ্যা বাবা সেটা তো বুঝতে পারছি,।কিন্তু এতো মাছ কিনে আমি কি করবো, সুধা মাছ খায় না। যেদিন মাছ রান্না হয়, সেদিন সে ভর্তা ডাল করে খায়! ও খায় না বলে আমিও খুব কম কিনি। এই তো পরশুই টুকটাক কিনলাম মাছ মাংস। এখন তো ফ্রিজও ফাঁকা নেই!!
ধ্রুব পুরো বোকা বনে গেলো, ঠিকই তো, এতো বড় গাড়িতে করে যে অফিসে আসা যাওয়া করে, তার মাসের শেষ বলে বাজার করার টাকা থাকবে না!! এটা কি হয় নাকি!!
সুধা ওকে পুরোপুরি বুদ্ধু বানিয়েছে!!
অবশ্য ও তো পিচ্চি একদম , ওর মাথায় এসব শয়তানী বুদ্ধি ঘুরবে এটাই স্বাভাবিক!!
সাবের সাহেব চলে গেলেন, মদনা জিজ্ঞেস করলো, ভাই মাছ গুলান কি করবো!!
-যা ভিতরে দিয়া আয় আম্মার কাছে, ভাগ!!
ধ্রুব মুখ বেজার করে দাঁড়িয়ে রইলো কতক্ষণ!
সুধা একটা কাজ খুব যত্ন করে শিখে ফেলেছিলো। বেকিং আর কেক ডেকোরেশন সে মাঝে মাঝেই করতো। মাঝে বেশ কিছুদিন বন্ধ করেছিলো। পরে বাবাকে একটা সারপ্রাইজ ট্যুর দেওয়ার জন্য আবার পেজটা চালু করলো হুট করেই । সেদিন দুটো কেক আর সুইস রোলের অর্ডার ছিলো, সুধা গিয়েছিলো পার্সেলটা ডেলিভারি ম্যানকে দিতে। গেটের বাইরে দেখলো ধ্রুব, রথি, কল্লোল, তপন সহ সবাই মিলে সিগারেট খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে।
সুধা কথা বা বলে ডেলিভারিম্যানের জন্য অপেক্ষা করছিলো তখন রথি ডাকলো।
-এই মেয়ে এদিকে এসো?
সুধা এগিয়ে গেলো।
-তুমি সুধা না? ধ্রুবর বাসায় আলাপ হয়েছিলো?
-জি আমি সুধা।
-এটা কি?
-কেক আর সুইস রোল।
-তুমি বানাও?
-হ্যা!
-দেখি একটু?
সুধা বাইরে থেকে দেখতে দিলো!
-বাহ সুন্দর করেছো তো, দুদিন পরে তো ধ্রুবর বার্থডে, সারপ্রাইজ কেকটা তুমি করে দাও!
সুধা ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে বললো, না না, আমি এতো প্রফেশনাল না! অন্য কোথাও অর্ডার করে দিন আপু!
আর ক্লাশ থাকলে আমি পারবোও না। আর সারপ্রাইজ আর থাকলো কই, আপনি তে বলেই দিলেন!
রথি হেসে বললো, আচ্ছা, শুধু অফডে তে অর্ডার নাও তুমি? আসলে আমি তো ধ্রুবকে কেক দিবোই।
তাই এটা এমনিতে আর সারপ্রাইজ থাকে না এখন।
সুধা বুঝেতে পেরে মাথা নাড়লো।
-এটা কেন করো? তোমার টাকার তো খুব দরকার নেই!!
-এটা শৌখিন কাজ, একজনকে গিফট দেওয়ার জন্য এখন করতেছি!
-আচ্ছা আচ্ছা। যাই হোক ভালো থেকো।
সুধার ডেলিভারিম্যান এলো৷ সুধা পার্সেল দিয়ে ঢুকে গেলো ভিতরে।
********
কয়েকদিন পরে ধ্রুব ডাইনিংএ বসে চা খাচ্ছিলো, সুধা দরজা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে উঁকিঝুকি দিচ্ছে। হাতে কিছু একটা আছে বোধহয়, ধ্রুব ডাকলো, সুধা, এসো।
সুধা এগিয়ে গিয়ে টেবিলে প্লেটটা রাখলো৷ ধ্রুবর মা এলেন কিচেন থেকে, সুধামণি, কেমন আছো মামণি?
জ্বি আন্টি ভালো, আপনি ভালো আছেন?
হ্যা, ভালো, মা কি এনেছো? পেস্ট্রি? বাহ সুইসরোলটা খুবই সুন্দর হয়েছে, তুমি বানিয়েছো?- প্লেটের ঢাকনা তুলতে তুলতে বললেন।
জ্বি আন্টি ।
নে, ধ্রুব, খা একটু!
ধ্রুব ভ্রু নাচিয়ে তুলে নিয়ে একটা কামড় দিলো, খুব সফট, একদম প্রফেশনাল বেকারদের মতো৷ রথিকে যে বললো, সে ভালো পারে না, এটা একদম মিথ্যে কথা। মেয়েটা কারণে অকারণে মিথ্যে বলে!!
হঠাৎ ধ্রবর মনে হলো, সেদিনকার জন্য যদি সুধা কনসিভ করে, তার ওকে না বলে, তাহলে! ধ্রুবর কেমন যেন লাগলো, ওর বাচ্চা, ও জানতেই পারবে না!! কি করবে এই আধপাগল মেয়ে, কে জানে! আচ্ছা কোনভাবে সুধা রথিকে নিয়ে হিংসুটে না তো, রথিকে সহ্য করতে পারে না, বা ওর জন্যই ধ্রুবকে এভয়েড করে না তো! সেরকম তো মনে হয় না, এতো মিষ্টি করে সবার সাথে কথা বলে সুধা!! ধ্রুব মহা ঝামেলায় আছে, মনটার মধ্যে এই পুঁচকে মেয়ে বসে আছে, রথিকে নিয়ে কখনো এমন কাঁপা কাপি হয়নি বুকের ভেতর।
-মা, পঁচিশ তারিখে সুধাকে কেক বানিয়ে দিতে বলো তো!!
জোরেই বললো ধ্রুব।
-ওহ, তাই তো, সুধা পঁচিশ তারিখে ধ্রুবর জন্মদিন, তুমি কেকটা বানিয়ে দিও।
-আন্টি আমি তো রোজ বেক করি না। আর ২৬ তারিখে আমার ক্লাশটেস্ট আছে, আমি রিস্ক নিবো না, এমনিতেই ফেল করি ফিজিক্সে।
-ওহ আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে মামণি। সমস্যা নেই।
ধ্রুব জিজ্ঞেস করলো, বেকিং এর টাকা কি করো, বাজার খরচ দাও নাকি আঙ্কেলকে?
খোঁচাটা বুঝলো সুধা। তারপর হেসে বললো, না, বিশেষ একজনের জন্য টাকা জমাচ্ছি, তাকে সারপ্রাইজ দিবো তার জন্মদিনে। অল্প কিছু টাকা শর্ট আছে, ওইটার জন্যই অর্ডার গুলো নিয়েছি।
-আচ্ছা, কে সে? বাঁকা ভাবে জিজ্ঞেস করলো ধ্রুব।
এটা কে আবার, যার জন্য সুধা টাকা জমাচ্ছে, কে সেই, কোন ছেলে, ওর বয়ফ্রেন্ড আছে? এটা তো মাথায় আসেনি! বয়ফ্রেন্ড থাকলে ধ্রুবকে এভাবে আদর করতে পারতো না তো! কে তাহলে!
-সেটা এখন বলা যাবে না। পরে জানবেন। আপনাদের তো জানাতেই হবে।
আচ্ছা। পরেই বলো তাহলে।
সুধা কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলো।
শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments