3

চোখের আলোয়ে দেখেছিলেম -শেষ পর্ব

 

মাঝে মাঝে দুয়েকটা দিন আসে মন খারাপের দিন। আজ সুধার মন খারাপ লাগছে, কোন কারণ নেই। কতক্ষণ ঘর গোছালো, কলেজে যায়নি আজ। সাজতেও ইচ্ছে করছে না। দুটো বেকিং ছিলো, শেষ করে একবার ছাদের দিকে গেলো। কেউ নেই, ধ্রুব চাবি দিয়েছে, সুধা খুলে ছাদের কর্ণারে গিয়ে বসে রইলো অনেকক্ষণ।
তিনটার দিকে ধ্রুব ছাদে উঠে দেখে দরজা খোলা, সুধা এসেছে!! ধ্রুব তাড়াতাড়ি হেঁটে সুধার কাছে গেলো।
-হ্যালো প্রিন্সেস, চুপচাপ বসে আছো যে? মন খারাপ?
সুধা ঘাড় নাড়লো।
-কি হয়েছে?
-কিছু না!
-আচ্ছা বলতে হবে না, বসবো?
সুধা হ্যা সূচক ঘাড় নাড়লো।
-বাবা কিছু বলেছে?
-না।
-ক্লাশ টেস্টে কম পেয়েছো?
-না,
-তাহলে?
-বিষণ্ণ লাগছে,
-আচ্ছা, আমার মন খারাপ থাকলে আমি খাওয়া দাওয়া করি৷ তুমি কফি খাবে?
-না।
-ওকে, আইসক্রিম?
-না।
-আচার খাবে?
এটা পছন্দ হলো, সুধা ঘাড় নাড়লো।
-আচ্ছা বসো, নিয়ে আসি।
ধ্রুব নিজের রুম থেকে আচারের বয়াম এনে দিলো। সুধার জন্যই এনে রাখা, ও তো আসে না তেমন!
সুধা আচার মুখে দিলো, ধ্রুবকেও এগিয়ে দিলো। ধ্রগব নিলো একবার।
-এখন বলো কি হয়েছে?
-কিছু না।
-আচ্ছা। আচার ভালো?
সুধা ঘাড় নাড়লো।
-তোমার শরীর ঠিক আছে তো? কোন সমস্যা?
-কোন সমস্যা নেই!
-ওকে।
-আমার খুব বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে।
-কোথায় যাবে?
-জানিনা, দূরে কোথাও!
-আমার সাথে যাবে?
সুধা “হ্যা” বললো।
-ওকে, রেডি হয়ে আসো, তোমাকে নিয়ে ঘুরে আসি। গাড়ি বের করছি!
-আপনি চালাবেন?
ধ্রুব ঘাড় নাড়লো। তার কিছুক্ষণ পরে সুধাকে নিয়ে ধ্রুব বের হয়ে গেলো। বন্ধুরা এসে ধ্রুবকে পেলো না।
★★★
রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গা দেখে ধ্রুব গাড়ি থামালো। সুধা নেমে পড়লো। জায়গাটা সুন্দর, পাশে নিচু জায়গায় নতুন করে মাটি কেটে লেকের মতো করা হয়েছে, মনে হয় মাছ চাষের জন্য৷ ঢালু জায়গাটা সবুজ ঘাসের চাদর বিছানো।
সুধা পা ছড়িয়ে বসে পড়লো। ধ্রুব পেছন থেকে এসে বললো, কিছু খাবে? বাদাম বা আইসক্রিম।
-আইসক্রিম খাবো।
-ওকে, কোন ফ্লেবার পছন্দ করো? নিয়ে আসছি আমি।
-ম্যাংগো, স্ট্রবেরি, ভ্যানিলা।
-তিনটাই আনবো?
-না, একটা কোনে তিনটা ওয়ান স্কুপ করে দিতে বলেন।
-আচ্ছা।
ধ্রুব চকলেট পছন্দ করে। নিজে চকলেটই নিলো, আর সুধার পছন্দ মতো তিনটা ফ্লেবার মিলিয়ে একটা।
কোন ঠ্যাঙ্কস না দিয়েই সুধা আইসক্রিমে কামড় দিলো। ধ্রুবর আবারও একটু অসহায় লাগতে লাগলো। এমন কি হতে পারে না, সুধার আইসক্রিম সুধা ওকে সাধবে, বা খাইয়ে দিবে! কিন্তু না, তেমনটা হবে না, সুধা খেয়ালই করবে না ধ্রুবর দিকে।
ধ্রুব একবারও খেলো না আইসক্রিমটা, অন্যদিকে মুখ করে রইলো যদিও ইচ্ছে করছে সুধার আইসক্রিম খাওয়া দেখতে।
ধ্রুবকে অবাক করে দিয়ে সুধা বললো, আপনি খাচ্ছেন না কেন, ভালো হয়নি? আমারটা ট্রাই করতে পারেন। আমি একপাশে খেয়েছি! দেখি চকলেটটা কেমন?
ধ্রুব মনে মনে ভাবলো, হাউ!! কিভাবে সম্ভব!!
সুধার আইসক্রিম পাল্টে নিলো খুব স্বাভাবিক ভাবে। তারপর বললো, চকলেটটা তো মজার, আপনি খাচ্ছিলেন না কেন!!
ধ্রুব উত্তর দিলো না। সুধার আইসক্রিমটাই খাওয়ায় মন দিলো! আর মনে মনে ভাবলো, অদৃশ্য কেউ নিশ্চয়ই আছেন, যিনি মাঝে মাঝে ম্যাজিক করেন। নয়তো আজকে কি সুধার আসার কথা বা সুধার আইসক্রিম শেয়ার করে খাওয়ার কথা!
সুধা বললো -আপনার একটু সমস্যা আছে বুঝলেন, আপনি নিজের পছন্দ চেনেন না৷ আপনি না, বেশিরভাগই জানেনা আসলে কি পছন্দ করে৷ আপনি পছন্দ করেন আমার মতো মাল্টি ফ্লেভারের আইসক্রিম, নিয়ে বসে আছেন চকলেট!
ধ্রুব মনে মনে হাসলো, আসলেই তোমার মতো মাল্টি ফ্লেভারের আইসক্রিমই আমার বেশি পছন্দ!!
****
প্রায় দুঘন্টা পরে ধ্রুবরা বাড়ি ফিরলো।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো ধ্রুব, সুধা নেমে যাচ্ছিলো, ধ্রুব বললো,
-সুধা, একটু বসো,
-জি বলুন?
-তোমাকে অনেক থ্যাঙ্কস, আজকের জন্য।
সুধা একটু হেসে বললো, কেন থ্যাঙ্কস, আমারই তো মন খারাপ ছিল বলে আপনি নিয়ে গেলেন। আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ।
ধ্রুব নিচের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি তো আমার সাথে তেমন মেশো না, কথাও বলো না, আমি তো খারাপ ছেলে, খুব খারাপ, তুমি এমনটাই ভাবো!
-কি আশ্চর্য, আমি কখন বললাম আপনি খারাপ ছেলে!
-তাহলে আমার সাথে তুমি কথা বলো না বা গল্প করোনা কেন?
-আমি তো আজ আপনার সাথেই ঘুরলাম!!
-হ্যা, এজন্যই ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সাথে এভাবে মিশলে আমার ভালো লাগবে, আমি চাই তুমি আমার আশেপাশেই থাকো, পুরোটা সময়। তোমার সবটা সময় আমি চাই!
-সেটা কিভাবে সম্ভব!! সুধা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-সম্ভব, তুমি চাইলেই সম্ভব। তুমি আমার সাথে মিশবে একদম আপন মানুষের মতো, নিজের মানুষের মতো।
সুধা কথার টোন বুঝতে পেরে নেমে যাচ্ছিলো।
-সুধা, আই লাভ ইউ!!
সুধা একটু থামলো। ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে বললো, আর কখনো এটা বলবেন না।
-একশবার বলবো, সুধা আই লাভ ইউ, আমি তোমাকে একদম নিজের করে পেতে চাই।
-সেটা সম্ভব না।
-সম্ভব, তুমি চাইলেই সম্ভব।
-আমি চাই না!
-তুমি ” হ্যা “না বললে আমি আজ সারারাত বৃষ্টিতে ভিজবো।
-আপনার যা মনে হয় করুন।
-আমি ছাদে যাচ্ছি, যতক্ষন তুমি না আসবে আমি ভিজবো। আর ভিজলে আমার জ্বর হয়।
-নিজের ভালো পাগলেই বোঝে!
-আমিও বুঝতেছি, সুধা ছাড়া আমার চলবে না। সুধা আমাকে খুব ভালোবাসবে, নিজের করে আদর করবে, এটাই চাই আমি!
সুধা খুব শক্তভাবে বললো, আপনি আসলেই খারাপ ছেলে, একদিন ভুল হতে পারে কিন্তু বারবার একই জিনিস ভাবাটা ভালো কিছু না। আপনি আর কখনো আমার সাথে কথা বলবেন না।
সুধা নেমে চলে গেলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ধ্রুব ছাদে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলো। সুধা ফ্রেশ হয়ে জানালা দিয়ে দেখলো একবার, পরে জানালা বন্ধ করে দিলো।
******
ধ্রুবর জ্বর এসেছে, গতকাল রাতে ভেজার ফল।
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে সকাল থেকে। রথি এসে কাঁথা টেনে তুলে ফেললো।
-এইই, ওঠ, কি হয়েছে, জ্বর বাঁধালি কি করে!
-বৃষ্টিতে ভিজেছি গতরাতে। তাই!
-কোথায় ভিজলি?
-ছাদে। তুই মার কাছে যা, আমি একটু রেস্ট নিই।
-মাথায় হাত দিয়ে দিবো?
-না, তুই যা, আমি একটু চোখ বন্ধ করে থাকি।
রথি গেলো না। পাশে বসে রইলো। সকাল বেলায়ই ধ্রুব কাজের মেয়েটাকে সুধার কাছে পাঠিয়েছে, থার্মোমিটার আনতে। সুধাকে জানানো দরকার জ্বর এসেছে। ধ্রুব হাল ছেড়ে দেয়নি, সুধাকে ভালোবাসি বলা হয়েছে, এখন শুধু ওর ” হ্যা” বলা চাই।
ধ্রুব রুম থেকে সুধার গলা শুনতে পেয়ে বুঝলো সুধা এসেছে। মা বলছে, কি এনেছো মামণি! মানে সুধা কিছু নিয়ে এসেছে, যাই আনুক, ধ্রুবর ওই জিনিসই খেতে হবে! রথিটা বসে আছে, যাচ্ছে না। ধ্রুব রথিকে বললো, একটু স্যুপ বানাবি? খেতে ইচ্ছে করছে না কিছু। রথি উঠে স্যুপ বানাতে চলে গেলো।
সুধা ধ্রুবর ঘরে একবার উঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছিলো, ধ্রুবই ডাকলো, “এসো। ভেতরে এসো।” সুধা ইতস্তত করে দরজায়ই দাঁড়িয়ে ছিলো।
ধ্রুব উঠে বসে গায়ে কাঁথাটা জড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে নামলো। তারপর সুধার হাত ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। সুধার একটু অস্বস্তি লাগতে লাগলো। গতকাল সন্ধ্যায় ধ্রুবর সাথে এত খারাপ ব্যবহার করা উচিৎ হয়নি। একটু অপরাধবোধ হচ্ছে।
সুধা আস্তে জিজ্ঞেস করলো, জ্বর বেশি?
-না, বেশি না। চেক করে দেখো!
সুধা হাত বাড়ালো। ধ্রুব হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললো, এভাবে জ্বর বোঝা যায়না।
সুধা বললো, তাহলে কিভাবে বোঝা যায়?
-শরীরের উত্তাপ শরীর দিয়ে ফিল করতে হয়। তুমি এক কাজ করো, তোমার টপসটা খুলে আমাকে জড়িয়ে ধরো, তাহলে ফিল করতে পারবে!!
সুধার কান ঝিমঝিম করে উঠলো, সেই সাথে রাগও হলো।
ধ্রুব কি ইচ্ছে করে এমন কথা বললো, কেন বলবে এমন কথা। নাহ, এ বাসায় আর থাকা যাবে না। আজই বাবাকে বলবে বাসা চেঞ্জ করতে। মাসের শুরু কেবল, এখন বলে দিলে সামনের মাসে পাল্টে ফেলা যাবে।
সুধা কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিলো।
ধ্রুব বললো, এটলিস্ট একটা চুমু খেয়ে যাও সুধা!
সুধা এবার পিছন ফিরে বললো, ওকে, চোখ বন্ধ করে এক থেকে পঁচিশ পর্যন্ত গুণতে শুরু করুন, মাঝে কোন এক বিজোড় সংখ্যায় আমি চুমু খেয়ে চলে যাবো।
ধ্রুব বসে পড়লো আর সত্যিই চোখ বন্ধ করে এক দুই তিন গোণা শুরু করলো। সুধা পা টিপে বের হয়ে চলে গেলো।
রথি এসে দেখলো ধ্রুব চোখ বন্ধ করে গুণছে, সতেরো… আঠারো!!
-এই ই, কি গুণছিস চোখ বন্ধ করে!
ধ্রুব চোখ খুলে ফেললো, তুই এখানে?
-আমি থাকবো না তো কে থাকবে, নে স্যুপ এনেছি, খা!
-এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।
ধ্রুবর খুব রাগ হতে লাগলো, এইটুকু মেয়ে, ধ্রুবকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়, আর ধ্রুবর যত রাগ পেছনে বসে, সামনাসামনি কিছুই বলতে পারে না সুধাকে।
-আমি স্যুপটা বানিয়ে আনলাম, তুই খাবি না?
-রেখে যা, পরে খাবো!
-তোর কি হইছে ধ্রুব, আমাকে বল না, কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছিস!!
“মা মা” করে জোরে মাকে ডাকলো ধ্রুবকে।
ধ্রুবর মা এলেন ঘরে।
-কি হয়েছে আব্বু, কিছু লাগবে?
-স্যুপ খাবো না!
-তাহলে কি খাবি?
-কেক পেস্ট্রি আছে কিছু?
-ওহ, সুধা সুইসরোল দিয়ে গেছে, খাবি?
-হু, দিয়ে যাও।
ধ্রুবর মা সুইসরোল দিতে দিতে বললেন, এইটুকু মেয়ে কি সুন্দর বানায়!
ধ্রুব কথা না বলে খেতে লাগলো। রথির একটু মন খারাপ হলেও ভাবলো, থাক, শরীর খারাপ, যা ভালো লাগে খেয়ে নিক।
ধ্রুব ভাবতে লাগলো, সুধা বানিয়েছে, সুধার হাতে জাদু আছে মনে হয়, যা ধরে সেটাই অদ্ভুত সুন্দর হয়ে যায়।
রাতে ধ্রুবর জ্বর কমলো, ডিনার টেবিলে এসে শুনলো, বাবা বলছেন, সাবের সাহেবরা আগামী মাসে বাসা ছেড়ে দিবেন। বিকেলে ফোন করেছিলেন।
★★★
রাত বাজে সাড়ে দশটা। ধ্রুব সোজা চলে এলো সুধাদের বাসায়। সুধার বাবা সকাল সকাল শুয়ে পড়েন। সুধা টিভি দেখছিলো ড্রয়িংরুমে বসে। ধ্রুব কলিংবেল বাজালো না। বারান্দার জানালা দিয়ে সুধাকে ইশারায় ডাকলো।
সুধা বুঝলো, কিছু একটা হয়েছে। দরজা খুললে আবার কী না কী করে ফেলবে, কে জানে। তবু দরজা খুলে বারান্দায় গেলো সুধা।
-বাসা পাল্টে ফেলছো কি আমার জন্য?
-না না, এমন কেন মনে হলো আপনার?
-সকাল বেলায় যে….
-সকাল বেলায় কী?
-ওই যে তোমাকে বললাম,
-কি বললেন?
-আচ্ছা বাদ দাও।
-বাদ দিলাম।
-বাসা চেইঞ্জ করবে না, প্লিইজ!
সুধা বুঝতে পারলো, কিন্তু বললো, আসলে বাবার ইচ্ছে হয়েছে, আমার হাতে কিছু নেই!
-তোমার হাতেই সবকিছু, তোমার কথা ছাড়া আঙ্কেল কিছুই করেন না। সকালে তুমি রাগ করেছো, তাই বাসা পাল্টানোর কথা বলেছো! আমি সরি, আমার জ্বর ছিলো, মাথা ঠিক ছিলো না। কী বলতে কী বলে ফেলছি সরি।
-সরি বলার কিছু নেই, সুধা আস্তে বললো।
আমি বাসা পাল্টে ফেললেই আপনার ভালো হবে, আপনি একটা দ্বিধার মধ্যে আছেন, রথি আপুর সাথে আপনার এতোদিনের সম্পর্ক, একটু এক মুহূর্তের ভুলের জন্য আপনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন।
-আচ্ছা, আমি আর তোমার সাথে কোন যোগাযোগ করবো না, কথাও বলবো না। তুমি তোমার মতো থাকবে, আমি আমার মতো।
সুধা একটু হাসলো।
-খুশী?
-হুম, মনে রাখবেন কিন্তু!
-আচ্ছা ঠিক আছে, বাসা পাল্টাবে না কিন্তু।
-আচ্ছা। বলবো বাবাকে।
-ওকে। যাচ্ছি তাহলে।
-ওকে, গুড নাইট।
-গুড নাইট।
কয়েক সিঁড়ি নেমে ধ্রুব উঠে এলো। সুধা জিজ্ঞেস করলো, কিছু বলবেন?
ধ্রুবর মনে হলো বলে, একটা চুমু খাই তোমাকে? একটাই, এরপর আর বলবো না কখনো। পরে ভাবলো, এটা বললে, আবার যদি বাসা পাল্টে চলে যায়! এখন তবু চোখের সামনে আছে, তখন কি করবে! থাক, এই চুমুটা তোলা থাকলো, যেদিন তুমি আমার হবে, একশ চুমু খেয়ে পুষিয়ে নিবো!
-কি হলো, কি ভাবছেন?
-কিছু না। যাচ্ছি, বলে ধ্রুব চলে গেলো।
এরপরে ধ্রুব সুধাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলো। মানে সুধা দেখবে না, এভাবে সুধাকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করলো। সুধা কখন কলেজে যায়, কখন প্রাইভেট টিউশনে যায়, বাসা থেকে কখন কোথায় বের হয়, সব ধ্রুব খেয়াল করে। সুধা খেয়াল করলো, ধ্রুব আর সামনে আসছে না, কিন্তু টিউশনের আশেপাশেই সে ধ্রুবকে দেখতে পাচ্ছে। হয়ত কারো সাথে কথা বলছে, বা অন্য কোন কাজে।
সুধা মনে মনে ভাবলো, আমি মনে হয় ওনাকে নিয়ে বেশি ভাবছি তাই চোখের সামনে বারবার পড়ে যাচ্ছে।
খেয়াল না করলেই হয়। সুধাও ধ্রুবকে একদম ইগনোর করা শুরু করলো।
প্রায় মাসখানেক পরের কথা, ধ্রুব সকাল বেলায় আবিস্কার করে, গতকাল রাতে যে বেসরকারি ব্যাংকের রেজাল্ট দিয়েছে, সেখানে সে সিলেক্টেড হয়ে গেছে! খুশীতে মনে মনে দুবার “আলহামদুলিল্লাহ” বলে ফেললো । মাসখানেক চাকরি করবে, কিছু টাকা পয়সা হাতে জমলেই সুধাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলবে। সুধারও তো এইচএসসি সামনে। তারপর ওরা বাসা পাল্টে জয়দেবপুর ছেড়ে হয়ত ঢাকার দিকে চলে যাবে।ওর ইউনিভার্সিটির কোচিং ঢাকায় করার কথা। অবশ্য পড়াশোনাই তো করে না, পাশ করলে হয়!
ধ্রুব আস্তে আস্তে মায়ের কাছে গিয়ে বলে ফেলে, সুধাকে বিয়ে করতে চায় সে। ধ্রুবর মা আকাশ থেকে পড়লেন, তাহলে রথি, এতদিন মেয়েটার সাথে সম্পর্ক তোর!
ধ্রুব কোন উত্তর না দিয়ে বলে, সুধাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব না। খুব তাড়াতাড়ি সুধাকে বিয়ে করে ফেলতে চায় সে! রথির বিষয়টা ও ম্যানেজ করেছে, রথিকে বলেছে, রথির সাথে সম্পর্ক বন্ধুত্বই ভালো, এর বেশি ঠিক ভাবতে পারছে না ধ্রুব।
ধ্রুবর মা বুঝলেন, কিন্তু এতো বাচ্চা মেয়ে, ওর বাবা তো বিয়েও দিতে চাইবে না। তবু তিনি প্রস্তাব দিয়ে পাঠালেন।
সুধার বাবা ফিরিয়ে দিলেন না, সুধাকে জিজ্ঞেস করলেন।
আর সুধা? সরাসরি না করে দিলো একবারে। ভাবার কোন দরকার নেই, ধ্রুব মূলত ওই সেইদিনের অপরাধবোধ থেকে ওকে বিয়ে করতে চাইছে, হয়ত অন্য কোন মেয়েকে ফিজিক্যালি ফোর্স করেনি কখনো, এখন সুধার দায় দায়িত্ব নিয়ে পাপ কাটাতে চাইছে, এমনটা কখনোই হবে না! একটা ইমোশনাল ভুলের জন্য সুধা ধ্রুবর গলায় ঝুলে পড়বে না কখনোই।
★★
ছাদের ঘরে ধ্রুব দাঁড়িয়ে আছে, বসতে পারছে না। খুব বেশি টেনশন হচ্ছে। সুধাকে ডেকে পাঠিয়েছে। সুধা কি আসবে, সেটাও বুঝতে পারছে না। আজ একটা এসপার ওসপার করবেই ধ্রুব। সুধা খুব বেশি ভাব নিয়ে আছে, কেন এমন করবে, ওর জন্যই এতো কিছু। ধ্রুব নিজেকে পুরো পাল্টে ফেলেছে, এটা ভেবেই ধ্রুবর মনে হলো, সুধা তো ওকে বলেনি, নিজেকে পাল্টে ফেলুন। তবে একটা বিষয় ভালো হয়েছে, আজ যখন জীবনটা একটা রুটিনে চলে এসেছে, মাস শেষে নিজের স্যালারীর টাকা নিজের হাতে আসছে, অদ্ভুত একটা প্রশান্তি। টাকার সমস্যা ধ্রুবর কখনো হয়নি, যা দরকার হয় ভাইয়া নয়তো আপু ধ্রুব আর ইপুকে কিনে দিয়েছে। বাবাও অনেক টাকা দিয়েছেন, কিন্তু মাস শেষের এই পয়ত্রিশ হাজার টাকার গায়ে যেন অসম্ভব শক্তি। এই আনন্দটাই ধ্রুব আগে পায়নি। হয়ত পেতোই না, কিন্তু সুধাকে চাই, নিজের করে চাই। সুধা বাউন্ডুলে জীবনটা পছন্দ করে না। সুধা দায়িত্ববান ছেলে পছন্দ করে। যার হাত ধরে সুধা চোখ বন্ধ করে হাঁটবে। সুধার হাতটা ধরার জন্য এতো আয়োজন আর এখন সুধা বলছে, সে বিয়ে করবে না ধ্রুবকে। কেন এমন হবে! সুধাকে আজকে বলতেই হবে।
সুধা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো, ধ্রুব এক হাতে সুধাকে কাছে টেনে নিয়ে অন্য হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। তারপর সুধাকে দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে ওর মুখটা দুহাতে তুলে নিয়ে বললো, কেন বিয়ে করবে না আমায়? কি করেছি আমি? সমস্যা কি?
সুধা বললো, আমাকে ছাড়ুন প্লিজ!
-ছেড়ে দিবো বলে তোমাকে আমি ধরিনি সুধা, তোমাকে বলতে হবে কেন আমাকে বিয়ে করবে না, আমার সমস্যাটা কোথায়?
-আপনার সমস্যা থাকবে কেন, আপনি তো খুব ভালো, ভালো মানুষ! দায়িত্ববান ছেলে!
-তাহলে কেন না করছো, কি সমস্যা?
-আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন তার কারণ আপনি একটা ভুল করেছিলেন। সেই ভুলটা মাথা থেকে সরাতে পারছেন না, মনের মধ্যে সারাক্ষণ মনে হয়, এই মেয়েটার আমি ক্ষতি করেছি, আমার ওকে বিয়ে করতে হবে, কিন্তু ভুলটা তো আপনি একা করেননি, আমিও সায় দিয়েছিলাম। তাহলে আমি কেন আপনার দায় হয়ে থাকবো। আপনার কোন দোষ নেই, আপনি বিষয়টা ভুলে যান, এক মুহুর্তের ভুলের জন্য সারাজীবনের জন্য আমি কারো বোঝা হয়ে থাকবো না!
-তোমার মনে হয় আমি তোমাকে বোঝা ভাবছি, অপরাধবোধ থেকে তোমাকে বিয়ে করতে চাইছি?
সুধা কোন কথা বললো না। ধ্রুব বললো, শোনো, আমি মোটেই তেমন কিছু ভাবছি না। আমার কোন অপরাধবোধও নেই, বরং এমন ভুল আমি বারবার করতে চাই, তোমার সাথেই, অন্য কাউকে আমি সেভাবে স্পর্শ করতেই চাইনা৷ আমি ভালোবাসি তোমাকে, কেন বুঝতে পারছো না বোকা মেয়ে, সত্যি ভালোবাসি তোমাকে। বলো, কি করলে বুঝবে তোমাকে ভালোবাসি!!
ধ্রুব স্বীকারোক্তিতে হঠাৎ সুধার মনটা নরম হয়ে গেলো, এতোদিন যে কাঠিন্য ধরে রেখেছিলো, কোথায় যেন হারিয়ে গেলো৷ সুধা লজ্জা পেতে শুরু করলো, ওর ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠলো!
ধ্রুবর চোখ এড়ালো না বিষয়টা। ধ্রুব সুধার মুখটা উপরে তুলে ফিসফিস করে বললো, আমার মনের রাজ্যে বর্গীর মতো হামলা চালিয়েছো তুমি, সব ভেঙেচুড়ে দিয়েছো, আর এখন বলছো চলে যাবে, কক্ষনো না। তুমি শুধু আমার, পুরোটাই আমার। কোথাও যেতে দিবো না তোমাকে!
সুধা হঠাৎ ধ্রুবর ঘাড় দুহাতে জড়িয়ে বললো, কোথাও যাবোনা, সেদিন পুরোপুরি আমার ছিলেন না তো আপনি, আধেক আপনাকে আমি চাইনি, পুরোটাই চেয়েছি।
ধ্রুব নিচু হয়ে সুধার ঠোঁটে চুমু খেলো। সুধা অদ্ভুত আবেশে
চোখ বন্ধ করে ফেললো, নিজে সক্রিয় হলো না, ধ্রুবর হাতে নিজেকে ছেড়ে দিলো পুরোপুরি।
সন্ধ্যা নামছে, আজ বৃষ্টি নেই, কন্যাসুন্দরী আলো জানালার ফাঁক দিয়ে সুধার গালে লুটোপুটি খাচ্ছে । ধ্রুবর আজ হিংসে হচ্ছে না আলোগুলিকে। এই আলোর আগেই ধ্রুব সুধাকে স্পর্শ করতে পেরেছে, পুরোপুরি।
শানজানা আলম
 

লেখালেখির অভ্যাস বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলে অবিরাম। প্রফেসর বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের বড় সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। শানজানা আলমের লেখার সবচেয়ে ভালোদিক হচ্ছে তার গল্প বলার সহজ সাবলীল ভঙ্গি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সময় কাটে লেখালেখি নিয়ে। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ "চন্দ্রাহত" "নিশীথ রাতের বাদল ধারা" ‘রূপকথা নয়’ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

Click Here to Leave a Comment Below 3 comments